পাহাড়তলীতে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু

বাজারে চাঁদাবাজি নাকি অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের?

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
610

নগরীর ডবলমুরিং থানার পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজারে গণপিটুনিতে মো. মহিউদ্দিন সোহেল (৩৯) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সোহেল দীর্ঘদিন ধরে বাজারে চাঁদাবাজি করে আসছিল বলে দাবি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। তবে তার আত্মীয়-স্বজনদের দাবি, চাঁদাবাজি নয়; বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলের বলি হয়েছে সে। স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, মূলত চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও স্থানীয় জনতা তার উপর চড়াও হয়। নিহত সোহেল দক্ষিণ খুলশী এলাকার আবদুল বারিকের ছেলে। এছাড়া গণপিটুনিতে সোহেলের সহযোগী রাসেলও আহত হয়। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাদের দু’জনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠায়। এসময় কর্তব্যরত চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে সোহেলকে মৃত ঘোষণা করেন। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মহিউদ্দিন সোহেল নিজেকে কখনো মন্ত্রীর কখনো আওয়ামী লীগ নেতার অনুসারী বলে পরিচয় দিত। এছাড়া প্রভাব খাটিয়ে বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করত। সে বাজারের পাশে রেলওয়ের দুটি স্টাফ কোয়ার্টার দখল করে ‘এম-এন আইপি ফাউন্ডেশন’ নামে একটি অফিস পরিচালনা করে আসছিল। এই অফিসে সে বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে চাঁদা দাবি করত। চাঁদা না দিলে সে অফিসে তাদের নির্যাতন করা হত বলেও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন।
পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজারের ব্যবসায়ী মো. আরিফ খান দৈনিক আজাদীকে বলেন, গত ৬ মাস ধরে সোহেলের অত্যচারে অতিষ্ঠ ছিল বাজারের ব্যবসায়ীরা। গত শনিবার সে একজন ব্যবসায়ীকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তা না হলে তাকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। এসময় ওই ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে তার সাথে দফারফা করে। একইভাবে পরদিন আরেক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করে। এ ঘটনায় সোমবার (গতকাল) বাজারের ব্যবসায়ী জাতীয় পার্টির নেতা ওসমান খান চাঁদা দাবির বিষয়ে সোহেলের কাছে জানতে চান। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে ওসমান খানের ওপর হামলা করে সোহেল ও তার অনুসারীরা। এতে ওসমান খানের মাথা ফেটে যায়। বর্তমানে ওসমান খান চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ঘটনার পর ব্যবসায়ীরা একাট্টা হয়ে সোহেলের কার্যালয় ঘেরাও করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় সে পালিয়ে যেতে চাইলে বাজারের ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও জনতা মিলে সোহেলকে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল তালুকদার নবী দৈনিক আজাদীকে বলেন, মহিউদ্দিন সোহেল দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসায়ীদের নানাভাবে হয়রানি করে আসছিল। এ নিয়ে বাজারের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ছিল। এছাড়া তার অত্যাচারে কলোনির লোকজনও অতিষ্ঠ ছিল। সোমবারের (গতকাল) ঘটনা তারই প্রতিফলন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক ও ১২নং সরাইপাড়া ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাবের আহমদ সওদাগর দৈনিক আজাদীকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মহিউদ্দিন সোহেল রেলওয়ের জায়গায় অফিস বানিয়ে সেটি মাদকের আখড়ায় পরিণত করেছিল। সেখানে সে মাদক বেচাকেনা ও সেবন করত। এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করত। আমাদের এক ব্যবসায়ী ওসমান খানের সাথে তার এক সপ্তাহ ধরে সমস্যা চলছিল। সে তাঁর কাছেও চাঁদা দাবি করেছে বলে আমি শুনেছি। এই ঘটনার সূত্র ধরে সোমবার ওসমান খান তার অফিসে গেলে তার লোকজন ওসমানের মাথায় ফাটিয়ে দেয়। তখন ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী-শ্রমিকরা তাকে ধরে গণপিটুনি দেয়।
এদিকে নিহত মহিউদ্দিন সোহেলের ভগ্নিপতি বলেন, সোহেল অত্যন্ত একজন ভালো ছেলে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলের বলি হয়েছে সে। তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো ব্যবসায়ী চাঁদা দাবির অভিযোগ করেননি। তিনি আরো বলেন, সোহেল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সাবেক সহ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্বাহী সংসদের সাবেক উপশিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক এবং সরকারি কমার্স কলেজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিল। এছাড়া সে একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমূল কমিটিরও একজন সক্রিয় সদস্য ছিল। সে পাহাড়তলী বাজারকে সিসি ক্যামেরার আওতাধীন করা, মাদকমুক্ত এলাকা গড়া, রাতের বেলায় পুরো পাম্প হাউস কলোনিতে রাস্তাসমূহ আলোকিত রাখার উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি ফ্রি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ফ্রি হেলথ ক্যাম্প, গ্রন্থাগার ও মিলনায়তন করার উদ্যোগ নিয়েছিল বলে দাবি করেন নিহত সোহেলের ভগ্নিপতি।
তিনি আরো জানান, ঘটনার আগের দিনও এলাকাবাসীদের একটি উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিল সোহেল।
এদিকে স্থানীয় একটি সূত্র দাবি করেছে, সম্প্রতি চট্টগ্রামের শীর্ষ এক নেতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসে মহিউদ্দিন সোহেল। এতে দলীয় কোন্দল শুরু হয় নিজেদের মধ্যে। পরে অন্য এক নেতার পক্ষে কাজ করায় তাদের বিরোধ আরও চরমে পৌঁছে।
এ বিষয়ে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (ডবলমুরিং) আশিকুর রহমান বলেন, চাঁদা দাবির ঘটনায় সোহেল নামে এক যুবককে গণপিটুনি দেয়ার খবর পেয়ে পুলিশ সাথে সাথে ঘটনাস্থল যায়। সেখান থেকে সোহেলকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। এসময় হাসপাতালের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া নিহত সোহেলের সহযোগী রাসেল এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

x