পাসের হারে এগিয়েছে গ্রাম

মোরশেদ তালুকদার

মঙ্গলবার , ৭ মে, ২০১৯ at ৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ
58

অতীতের ‘দুর্নাম’ এবার ঘুচিয়েছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার বিগত দুই বছরের (২০১৭ ও ২০১৮) ফলাফলে ধারাবাহিকভাবে পাসের হার কমেছিল জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পাসের হারের নিম্নমুখী এ প্রবণতার জন্য বোর্ডের গড় ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল গ্রামের স্কুলগুলো। এতে কিছুটা ‘দুর্নাম’র ভাগিদার হয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক পর্যন্ত। তবে এবার বিগত বছরের তুলনায় পাসের হার বেড়েছে গ্রামে। গতকাল প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, গতবারের তুলনায় গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার বেড়েছে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এর বিপরীতে গতবারের তুলনায় এবার মহানগরীতে পাসের হার কমেছে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ।
শুধু পাসের হার নয়। গতবারের চেয়ে এবার জিপিএ-৫ বেশি পেয়েছে মফস্বলের শিক্ষার্থীরা। বরং শহরের স্কুলগুলোতে গতবারের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ কমেছে। একইভাবে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় এগিয়ে আছে মফস্বল। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. মাহবুব হাসান দৈনিক আজাদীকে বলেন, এবার এসএসসির ফলাফলের ক্ষেত্রে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা এগিয়ে এসেছে। বিগত বছরে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল পিছিয়ে গেলে আমরা দুর্বল ফলাফল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মনিটরিং করেছিলাম। প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে দুর্বল ফলাফলের কারণগুলো চিহ্নিত করি। পরে সেগুলো দূরীকরণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করি। এছাড়া এবার শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল গতবারের চেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. মাহবুব হাসান।
উল্লেখ্য, এসএসসি পরীক্ষার গত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধির পরিসংখ্যান, শতভাগ পাস ও সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থান লাভ করার ক্যাটাগরিতে ২০১১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের উন্নতির গ্রাফ ছিল প্রায় অভিন্ন। তবে গ্রামের শিক্ষার্থীদের এ উন্নতিতে বিপর্যয় আসে ২০১৫ সালে। ওই বছর তিন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে যায় গ্রাম। পরবর্তী বছর (২০১৬) তা কাটিয়ে উঠলেও গত দুই বছর (২০১৭ ও ২০১৮) আবারো খারাপ হয় গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল।
পাসের হারের পরিসংখ্যান : চট্টগ্রাম মহানগরে এবার (২০১৯) গতবারের (২০১৮) তুলনায় পাসের হার শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। এবার চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার হচ্ছে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। যা গতবার ছিল ৮৫ দশমিক ২২ শতাংশ। অবশ্য গতবার পূর্বের বছরের (২০১৭) তুলনায় ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ পাসের হার কমেছিল নগরে। ২০১৭ সালে নগরে পাসের হার ছিল ৯২ দশমিক ০১ শতাংশ।
মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলায় এবার পাসের হার ৭৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। যা গতবার ছিল ৭৭ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় এবার জেলায় পাসের হার বেড়েছে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। গতবার পূর্বের বছরের (২০১৭) তুলনায় জেলায় পাসের হার কমেছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৭ সালে জেলায় পাসের হার ছিল ৮৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
এর আগে ২০১৬ সালে মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলার পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। যা ২০১৫ সালে ছিল ৮২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে গ্রামের শিক্ষার্থীদের পাসের হার বেড়েছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। পক্ষান্তরে ২০১৬ সালে শুধু মহানগরে পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। যা ২০১৫ সালে ছিল ৮৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে শহরে পাসের হার বেড়েছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। ফলে ২০১৬ সালে শহর ও গ্রামের মধ্যে পাশের হার বৃদ্ধির তুলনামূলক পরিসংখ্যান করলে দেখা যায়, শহরের চেয়ে গ্রামে ২ দশমিক ২৮ শতাংশ পাসের হার বেড়েছিল।
এর আগে ২০১৪ সালের তুলনায় জেলায় পাসের হার ২০১৫ সালে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ কম ছিল। যা শহরে হচ্ছে মাত্র ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ২০১৪ সালে শহরে পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। গ্রামে ছিল ৯১ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হার বৃদ্ধির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে পিছিয়ে ছিল গ্রাম।
২০১৩ সালের জেলায় পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ। যা ২০১২ সালে ছিল ৭৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে শুধু গ্রামে পাশের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অপরদিকে চট্টগ্রাম মহানগরে ২০১৩ সালে পাসের হার ছিল ৯৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। যা ২০১২ সালে ছিল যা ২০১২ সালে ছিল ৮৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৩ সালে শুধু শহরে ২০১২ এর তুলনায় পাসের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এ হিসেবে ২০১৩ সালের পাসের হার বৃদ্ধিতে শহরের চেয়ে গ্রাম ২ দশমিক ২২ শতাংশে এগিয়ে ছিল।
একইভাবে ২০১১ সালের চেয়ে ২০১২ সালেও পাসের হার বৃদ্ধির হার পরিসংখ্যানে এগিয়ে ছিল গ্রাম। ২০১১ সালের চেয়ে ২০১২ সালে গ্রামে পাসের হার বৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। অথচ ২০১১ সালের চেয়ে ২০১২ সালে শহরে পাসের হার ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে নগরে পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং গ্রামে এ হার ছিল ৭৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
জিপিএ-৫ এর হার : তুলনামূলক চিত্রে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকেও নগরকে ছাড়িয়ে গেল মফস্বল। নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ৪৯৮ জন শিক্ষার্থী এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন। যা গতবারের (২০১৮) তুলনায় ৮৮৩ জন কম। গতবার নগরীর স্কুলগুলোতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৫ হাজার ৩৮১ জন। পক্ষান্তরে গতবারের তুলনায় এবার জেলার স্কুলগুলোতে ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবার জেলার স্কুলগুলোতে ২ হাজার ৫৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গতবার ১ হাজার ৩৭৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এদিকে কঙবাজার জেলায় ৫৯০ জন, রাঙামাটি জেলায় ১১৩ জন, খাগড়াছড়ি জেলায় ৬৯ জন এবং বান্দরবান জেলার ৭০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এগিয়েছে কঙবাজারসহ তিন পার্বত্য জেলাও : চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন পাঁচটি জেলার (চট্টগ্রাম, কঙবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, গতবারের চেয়ে এবার সাফল্য পেয়েছে কঙবাজারসহ তিন পার্বত্য জেলা। এর মধ্যে বান্দরবান জেলায় এবার পাসের হার হচ্ছে ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। গতবার ছিল ৫৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ বান্দরবানে গতবারের তুলনায় পাসের হার বেড়েছে ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। খাগড়াছড়ি জেলায় পাসের হার ৬৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গতবার ছিল ৫০ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় খাগড়াছড়িতে পাসের হার বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। রাঙামাটি জেলায় এবার পাস করেছে ৬৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গতবার ছিল ৬২ দশমিক ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় এবার পাসের হার বেড়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : চট্টগ্রাম বোর্ডে এবার শতভাগ পাস করেছে ৩০টি স্কুলের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে মফস্বল এলাকায় অবস্থিত স্কুল আছে ১৮টি। অবশিষ্ট ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নগরে অবস্থিত। মফস্বলে অবস্থিত শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজও রয়েছে।

x