পালকি

দীপক বড়ুয়া

বুধবার , ৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৩:৪৪ পূর্বাহ্ণ
74

– দাদু- দাদু ওটা কী?ছোট্ট ঘর?
– ওটা ঘর নয়,পালকি। আমি হেসে উত্তর দিই।
প্রত্যুষা ও হাসে।
হেসেহেসে বলে,
– পালকি সেটা আবার কি? আমারতো মনে হয়,ছোট ঘর একটি।
দেখোনা,চাল আছে,দরােজা আছে।
ঢোল,বাঁশি বাজছে।
সঙ্গেসঙ্গে বউ আসছে।সাথে বন্ধু,আত্মীয়স্বজনেরা।আমি প্রত্যুষা তিনতলার বারিন্দায়। প্রত্যুষার আবারও প্রশ্ন,
– দাদু,লাল টুকটুক শাড়ি পরা মেয়েটা কে?
– বউ!
– বউ কি?
কি উত্তর দিই, ভাবি! বউ বললে বুঝবে! সাহসের সুরে বলি,
– ঐ মেয়েটির বিয়ে হবে।শ্বশুড়বাড়ি যাচ্ছে সে।
– ঠিক বলেছে দাদু। কিন্তুু বিয়ের আগে লাল শাড়ি পরতে হয় বুঝি!
– হ্যাঁ দাদু,বিয়ের আগে লাল শাড়ি পরে শ্বশুড় বাড়ি যায় নতুন বউ।
বউ কাঁদে।মা কাঁদে।স্বজনেরাও কাঁদে।
দাদুর আবার ও প্রশ্ন,
– দাদু, বউ কাঁদছে কেন?
– মায়ের জন্য।
– কেন? মায়ের জন্য কাঁদবে কেন?
– মাকে ছেড়ে যাচ্ছে,কাঁদবেনা দাদু।
– দাদু আমিও মাকে ছাড়া ইশকুলে যাই।কই আমিতো কাঁদিনা।
আমি লজ্বায় পরি।
ভাবি,এবার প্রত্যুষাকে কি উত্তর দিই!
একটুপর বউ পালকিতে বসে।বেহেরা পালকি কাঁধে নেয়। আবারও সবার কান্না।
– দাদু,দাদু, ঘরটিতে বউকে নিয়ে মানুষেরা কাঁধে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে? প্রত্যুষা আবার ও বলে।
– এটা ঘর নয়,বলেছি না পালকি!আমি বলি।
– ঠিক আছে পালকি, তবে যাচ্ছে কোথায়?
– শ্বশুড়বাড়ি।
– শ্বশুড়বাড়িটা কি?
– যেমন তোমার বাড়ি কোনটা!
– এটা।
– তুমি বড়ো হবে, তোমাকে যখন বিয়ে দেবো,তুমি যে ঘরে যাবে,সেটা
হচ্ছে তোমার শ্বশড়বাড়ি।
প্রত্যুষা চুপ থাকে।
কিছুই বলেনা।
কিছু বুঝে সে!
কি যেন ভাবে প্রত্যুষা।
তখন মা ডাকে।
– প্রত্যুষা, আয় ইশকুলে যাবি।ড্রেস পরিয়ে দিই।
প্রত্যুষা মায়ের ডাকে চলে যায়।
বড়ো শ্বাস ছাড়লাম। মনে মনে বলি, বাব্বা,বাঁচা গেলো। আজকালকার ছেলেমেয়েদের সাথে কি কথা বলি! প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
পত্রিকায় চোখ রাখি।
ভোরের চা- নাস্তার পরে এটা প্রতিদিনের কাজ।
পত্রিকা না পড়লে কেমন জানি মনে হয়!
যদিওবা আগেরদিন রাত বারোটার পর প্রত্যেক পত্রিকার শিরোনাম
সব চ্যানেলে বলে দেয়।
– বাবা- বাবা, বউমার গলা।
– কি বউমা?
– বাবা,প্রত্যুষাকে ইশকুলে নিয়ে যেতে হবে। বাজারে যেতে হবে।রান্না করতে হবে।
– ঠিক আছে, যাচ্ছি। দাদুকে পাঠিয়ে দাও।
দাদুর হাত ধরে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামি।
ভয়ে মনটা ধুকধুক করে।
কি জানি! পথে প্রত্যুষা কি আবার প্রশ্ন করে।
রাস্তায় পরিচিত রিকশাচালক ইসুফের সাথে দেখা।
দেখেই বলে,
– মামা,দাদুকে ইশকুলে নিয়ে যাচ্ছেন?
– হ্যাঁরে,ইশকুলে যাচ্ছি।
– তুমি যাবে?
– যাবার জন্যইতো বসে আছি, উঠুন।
আমি, দাদু রিকশায় উঠি।
দাদুকে বলি,
– দাদু রিকশায় বসলে কথা বলতে নেই।
– কেন?
-রিকশা চালকের অসুবিধা হয়।
– ঠিক আছে।
রিকশা চলে।
পাশে নানারঙের কার যায়। ট্যাকসি যায়।
কার দেখে প্রত্যুষা বলে,
– দাদু ঐ ছোট্ট মেয়েটি কারে করে কোথায় যাচ্ছে?
– তোমাকে বলেছিলাম না, কথা বলবে না। তবু কেন কথা বলছো!
– বারে! কারে করে ঐ মেয়েটা কোথায় যাচ্ছে?এইতো বললাম,তা’তে
রাগ করছো দাদু! ছিঃছিঃ!
– ইশকুলে যাচ্ছে ভাই,ঠিক আছে? আমি উত্তর দিই।
– ওমা তাইতো! সেতো আমাদের ইশকুলে পড়ে। কি মজা ওদের।কারে ইশকুলে যায়। আমরা যাইনা কেন?
কি উত্তর দিই, ভাবি। কি বললে প্রত্যুষা খুশি হবে!
এতো বলার পরও প্রশ্ন! যাক, একটা কিছুতো বলতে হবে।
বলি,
– ওরা বড়ো লোক,অনেক টাকা ওদের। তাই ওদের গাড়ি আছে।গাড়িতে ইশকুলে যায়।
– আমাদের নেই কেন? কঠিন প্রশ্ন! তবু সহজভাবে বলি,
– আমিতো বেশি লেখাপড়া করিনি।তাই টাকা নেই। গাড়িও নেই।
তাই বলছি শোনো। দাদু একটা কথা আছে,লেখাপড়া করে যেই,গাড়িঘোড়া চড়ে সেই। তুমি ও বেশি করে পড়ো।সুন্দর গাড়ি চড়ে সব জায়গায় যেতে পারবে। ইশকুলে, বেড়াতে!
– সত্যিই দাদু,কি সুন্দর বলেছে! লেখাপড়া করে যেই,গাড়িঘোড়া চড়ে সেই! এবার থেকে আমি প্রতিদিন সকালসন্ধ্যা পড়বো। অনেক বড়ো হবো। গাড়ি কিনবো।দাদু, তুমি আমার গাড়িতে চড়বে?
– চড়বো দাদু।
– কি মজা হবে তখন, না,দাদু!
– হ্যাঁরে দাদু! দারুণ মজা হবে।
ততক্ষণে রিকশা ইশকুলের গেইটে দাঁড়ায়।
প্রত্যুষা রিকশা থেকে নামে।
ইশকুলের দিকে পা রেখে বলে,
– দাদুভাই, টা- টা!
আমি বলি,
– টা- টা!
কেন জানি মনে হয়!
আহারে!
প্রত্যুষা কি সুন্দর করে বললো-
লেখাপড়া করে যেই
গাড়িঘোড়া চড়ে সেই!

x