পার্টনারশীপ কৃষি বিপ্লবের স্বপ্নের অভিযাত্রী নাঙ্গলমোড়ার পাঁচ উদ্যোক্তা

কেশব কুমার বড়ুয়া, হাটহাজারী

সোমবার , ২৮ মে, ২০১৮ at ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ
91

কৃষি একটি উন্নত পেশা। ধর্মীয় ভাবে কৃষিকে সৎ পেশা হিসাবে আখ্যায়িত করা আছে। এক সময় দেশের মানুষ কৃষিকাজকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসাবে মনে করত। তখন অবশ্য গ্রামের লোকজনের তেমন আর্থিক সংগতি ছিল না। গ্রামের মানুষজন এতবেশী শিক্ষিতও ছিল না। ক্রমে দেশের মানুষ শিক্ষার গুরুত্ব উপলদ্ধি করে শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। আস্তে আস্তে মানুষের আর্থিক সংগতিও বাড়তে থাকে।

স্বাধীনতার পূর্বে দেশের লোকসংখ্যা কমছিল। লেখাপড়া না জানা ও আর্র্থিক অসংগতির কারণে পূর্ব পুরুষের ধারাবাহিকতায় বংশ পরস্পরায় কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল দেশের মানুষ। অন্য পেশা না থাকায় প্রকৃতি নির্ভরতার উপর ভর করে গ্রামের গৃহস্থ পরিবার গুলো কৃষি কাজ করত। সে সময় গৃহস্থ পরিবারের গুরুত্ব ছিল সমাজে সর্বাধিক। তাই চাকুরির প্রতি মানুষের এতবেশি আগ্রহও ছিল না। কৃষি কাজ ছাড়া কেউ কেউ ব্যবসা বাণিজ্য করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করত । অনেকে ব্যবসা পাতি ও দোকানপাঠ করারক্ষীাঁকে ফাঁকে পরিবারের খাদ্যের চাহিদা পূরণের জন্য মৌসুমের সময় কৃষি কাজ করত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা সরকারি করণের পর শিক্ষার গুরুত্ব উপলদ্ধি করে মানুষ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। দেশ তথা গ্রামের মানুষ শিক্ষিত হওয়ার পর প্রকৃতির বৈরী আচরণের কারণে কৃষি কাজে বার বার ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে মানুষ চাকরির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। পরবর্তীতে মধ্য প্রাচ্যসহ উন্নত দেশে অর্র্থ উপাজনের পথ প্রসস্থ হওয়ায় গ্রামের লোকজন যারা কৃষি সহ গৃহস্থী কাজে জড়িত তারা ক্রমে কৃষি বিমুখ হতে থাকে। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিক সংকট, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি, সার কীটনাশকের সহজ লভ্যতা না থাকায় প্রাকৃতিক নির্ভরতার কারণে গ্রামের অনেক পরিবার কৃষি কাজ ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয়। কৃষি পরিবার গুলো বিকল্প পেশা হিসাবে ব্যবসা, মধ্যপ্রাচ্য গমণ, চাকরির দিকে ধাবিতে হতে থাকে। এতে করে হাটহাজারীতে বিপুল সংখ্যক জমি অনাবাদী পড়ে থাকে। সারাদেশের অবস্থা বিবেচনা করে সরকার যান্ত্রিক ও প্রযুক্তি কৃষির উপর জোর দেওয়া শুরু করে। যাতে করে শ্রমিক সংকট, প্রকৃতি নির্ভরতা কমিয়ে মানুষ কৃষির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। সে সাথে উন্নত বীজের মাধ্যমে অধিক ফলনের ব্যবস্থা ও করে কৃষি বিজ্ঞানীরা গবেষনার মাধ্যমে।

ইতিমধ্যে দেশের কি শহর কি গ্রাম প্রত্যেক এলাকার মানুষ নিজেদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে প্রতিযোগী হয়ে উঠে। ভবিষ্যত প্রজন্ম তথা সন্তানদের মানসম্মত ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত করে ভাল চাকরি প্রত্যশায় প্রত্যেক অভিভাবক ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের সন্তানদের ভর্তি করাচ্ছে। কিন্তু ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহন করার পরও সন্তান যখন উপযুক্ত চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়,তখন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে হতাশা চলে আসে। এমনি সময়ে হাটহাজারী উপজেলার নাঙ্গলমোড়া এলাকার কিছু বিশ্ববিদ্যলয় পাঠ চুকানো শিক্ষার্থী নিজেদের প্রত্যাশা অনুসারে চাকরি না পেয়ে এক প্রকার হতাশ হয়ে পড়ে। এসব শিক্ষিত সন্তানেরা এক সময় দেখল যে এলাকার বেশ কিছু জমি অনাবাদী হয়ে পড়ে আছে। যেসব জমিতে তাদের পূর্ব পুরুষেরা চাষাবাদ করে পরিবারের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করত। তারা চিন্তা করল এসব অনাবাদী জমি কিভাবে আবাদ করা যায়। কিন্তু তাদের কারো চাষাবাদের বিষয়ে তেমন অভিজ্ঞতা নেই। খোঁজ করতে করতে তারা পেয়ে গেলে এলাকার একজন অভিজ্ঞ কৃষক তাদের মুরুব্বী সমতুল্য ব্যক্তি। তিনি হলেন মৃত নুর খায়ের পুত্র আইয়ুব খাঁন। তারা চার বন্ধু যথাক্রমে এম এ পাশ করা মৃত আবদুস সামাদ এর পুত্র রমজান আলী, বিবিএ এম বিএ পাশ করা মৃত হাজী আমিনুর রহমানের পুত্র মো. আবু জাহেদ রাসেল, এমবিএ পাশ করা মৃত নুর মোহাম্মদ এর পুত্র মো. মুকতাবিদুল্লাহ মিজান এবং প্রবাসী মৃত মো. ইউনুছের পুত্র মো. মাসুদ। তারা চার বন্ধু মিলে আইয়ুব খাঁনের সাথে এব্যাপারে পরামর্শ করলে তিনি সানন্দে রাজি হয়ে যায়। যে কথা সে কাজ। পাঁচ জন মিলে গত ইরি/বোরো মৌসুমে তারা ৩৫ কানি অনবাদী পড়ে থাকা জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনে। সেজন্য তারা জমির মালিকের সাথে কথা বলে। সে অনুসারে ৩৫ কানি জমিতে পাঁচ জন মিলে উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের চাষবাদ করে। সে সাথে এক কানি জমিতে খৈ ভুট্টার চাষ এবং এক কানি জমিতে ফেলনের চাষ করে। ভুট্টা ও ফেলনের আবাদ ভাল হয়েছে বলে আলাপ কালে তারা জানান। তবে অকাল বর্র্ষেণের কারণে জমি থেকে ধান কাটতে তারা প্রতিকুল অবস্থায় পড়েছে বলে উল্লেখ করেন। আবাদকৃত প্রতি কানি জমিতে ১’শ থেকে ১’শ ২০ আড়ি ধান উৎপাদন হয়েছে বলে তারা জানান। প্রথম বারের মত পার্টনারশীপ কৃষি কাজে তাদের ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে এবার তাদের এত বেশি লাভ না হলেও ভবিষ্যতে তারা লাভবান হবে বলে এমন প্রত্যাশা করেন। অবশ্যই যান্ত্রিক ও প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি করতে পারলে তাদের খরচের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ হবে বলে মনে করেন। হালদা নদীর পানি দিয়ে তারা ধানের আবাদ করেন। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাদেরকে কিছুটা সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতে তারা কৃষি বিভাগের আরো বেশি সহযোগীতা প্রত্যশা করেন।

প্রতিবেদকের সাথে আলাপ কালে রাসেল ও মিজান জানান, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্র্ণ ও অনাবাদী গুমানমর্দ্দন বিলের জমিকে আবাদের আওতায় এনে সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে কৃষি কাজে নেমেছেন। তাদের দেখ দেখায় আরো শিক্ষিত লোকজন কৃষি কাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। কৃষিকে তারা শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে লাভ জনক কৃষিকে রুপান্তরের জন্য তাদের এ উদ্যেগ বলে জানান। এবার তাদের আবাদকৃত জমিতে প্রায় ৪ হাজার আড়ি ধান উৎপাদন হবে বলে তারা অনুমান করছে। তাদের এ উদ্যমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগীতা প্রয়োজন।

x