পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যক্তিস্বার্থে অপরিকল্পিত বিভাগ খোলা বন্ধ করা হোক

রবিবার , ৭ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
104

ভালো কোন গবেষণা নেই, চাকরির বাজারেও নেই তেমন চাহিদা। এরপরও অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক নতুন বিভাগ চালু করছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগ থেকে দুই, তিন, এমন কি চারটি বিভাগও খোলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু শিক্ষকের দ্রুত চেয়ারম্যান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য পদ সৃষ্টির মতো বিষয়গুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে এসব বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
খবরে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগ যাত্রা ২০১২ সালে। এর দুই বছর পর ২০১৪ সালে খোলা হয় কমিউনিকেশন ডিসঅডার্স বিভাগ। এর এক বছরের মাথায় খোলা হয়েছে প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স স্টাডিজ বিভাগ। এ তিনটি বিভাগ খোলা হয়েছে মূলত সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে। বিভাগগুলোর চেয়ারম্যান ও শিক্ষক নিয়োগও হয়েছে সেখান থেকে। এর আগে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কোর্স হিসেবে পড়ানো হলেও চার বছরের মধ্যেই কোর্সগুলোকে চারটি বিভাগে রূপ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ উল্লিখিত পত্রিকাকে বলেন, গ্রন্থাগার নেই, শ্রেণিকক্ষ নেই, গবেষণাগার নেই। অথচ দেদারসে বিভাগ খোলা হয়েছে। এসব বিভাগের সিলেবাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে একটি বিভাগই যথেষ্ট। যেসব বিষয়ে পাঠদানের জন্য একটি কোর্সই যথেষ্ট, সে বিষয়েও বিভাগ খোলা হয়েছে। চাকরির বাজারে চাহিদা নেই এমন বিভাগও খোলা হয়েছে। যেমন প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স স্টাডিজ, বিশ্বব্যাপীই এ খাতের প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে কমছে। কাউকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার জন্য কিংবা কয়েকজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ব্যক্তিস্বার্থে এগুলো করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সাত বছরে নতুন সাতটি বিভাগ চালু হয়েছে। নতুন চালু হওয়া বিভাগগুলো হলো, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান, সঙ্গীত, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, ক্রিমিনোলজি ও বাংলাদেশ স্টাডিজ। এ বিভাগগুলোর প্রতিটিতেই আছে অবকাঠামো সংকট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, নতুন বিভাগগুলোর মধ্যে কিছু বিভাগের প্রয়োজন রয়েছে। তবে কিছু বিভাগ খোলা হয়েছে প্রয়োজন ছাড়াই। কিছু পদ সৃষ্টি করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার জন্যই এসব বিভাগ খোলা হয়েছে। ১৯১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে প্রকৌশল অনুষদের অধীনে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগ নামে একটি বিভাগ চালু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বিভাগটি চালুর প্রতিবাদে তখন বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও ক্লাস বর্জনও করেছিলেন ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (এপিইই) বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি ছিল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইইই বিভাগে যে কারিকুলাম পড়ানো হয়, তাদেরও সেই কারিকুলামেই পড়ানো হয়। তাদের সিলেবাসের ১০ শতাংশ ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানের আর বাকি ৯০ শতাংশই ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত শিক্ষাবর্ষে দুটি বিভাগকে একত্রীকরণ করতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নতুন করে খোলা আইন ও ভূমি প্রশাসন, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান, জীব ও চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ খোলা হয়। কোথাও বিভাগ চালুর ক্ষেত্রে ভতুর্কির ব্যবস্থাও আছে। যেমন উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকার ভতুর্কি দিয়ে থাকে। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে দেশের অভ্যন্তরে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় চালুর অনুমতি দিয়েছে।
থাইল্যান্ডে এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই শিক্ষার্থীদের পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন অনেক বিভাগ খুলছে ঠিকই কিন্তু সেখানে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর মান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। তদুপরি বিভাগগুলো বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় এ শিক্ষা দেশে বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। চাকরির ক্ষেত্রে যে ধরনের কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা যোগান দিতে পারছে না। তথ্যমতে, দেশে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চালু করা অপরিকল্পিত বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থী। উল্লিখিত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে শিক্ষা নয় মূলত শিক্ষকদের স্বার্থেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অপ্রয়োজনীয় বিভাগগুলো খোলা হচ্ছে। গুরুত্ব পাচ্ছে না গ্রন্থাগার ও গবেষণাগারের বিষয়গুলো। বিষয়টি আসলে ব্যক্তিস্বার্থে শিক্ষার ব্যবহার।
উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজারের চাহিদা ও মেধা বিবেচনায় নিয়ে বিভাগ ও বিষয় নির্ধারণ করে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কেন যে বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে সেটা বোধগম্য নয়। দেশে বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশলে গ্র্যাজুয়েট দরকার হলেও কেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা পূরণ করতে পারছে না, তা উত্তর খুঁজে দেখা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ নিয়ে বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে তার বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী বিভাগ চালুর বিকল্প নেই। যেমন প্লাস্টিক শিল্প খাত সম্প্রসারিত হলেও এর জন্য কোন বিভাগ চালু হয় নি। সেলফোন গ্রাহকের সংখ্যা বাড়লেও মোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর তেমন উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। তৈরি পোশাক খাতের উচ্চ পদে বিদেশি কর্মী বসাতে হচ্ছে। এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতি নির্ধারকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পের সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামের সমন্বয়ে নজর দিতে হবে। চীন কিংবা মরক্কোর সরকার যেমন বেকারত্ব কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদানের ধরনে পরিবর্তন ও পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার করছে, উচ্চ শিক্ষিতদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য ছোট ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রণোদনা চালু করেছে, শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশও তাদের এ উদাহরণ অনুসরণ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে খাতওয়ারি কর্মসংস্থানের চাহিদা ও জোগানের তথ্য প্রতি মাসেই হালনাগাদ করা হয়। এতে কোন খাতে কী পরিমাণ দক্ষ জনবলের দরকার হবে, সে সম্পর্কে আগাম তথ্য থাকে তাদের কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারে। বাংলাদেশে এ ধরনের কোন তথ্য ভাণ্ডার নেই। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কয়েক বছর পর পর বিভাগ পুনর্মূল্যায়ন করে। কিন্তু বাংলাদেশে চাকরি উপযোগী বিষয়ে পড়ানোর দক্ষ অধ্যাপক ও প্রভাষকের কথা আমলে নেয়া হয় না। পরিস্থিতি পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তত্ত্বগত শিক্ষার সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের বেসরকারি খাতের কর্মপরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা দরকার। জাতীয় চাহিদার বিষয় বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনা নিতে হবে সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এভাবেই উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতগুলোয় নিয়োগ পাওয়ার মতো বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর অভাব মিটানো সম্ভব হবে। ব্যক্তি উদ্দেশ্য পূরণে যারা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই।

x