পান

সত্যব্রত বড়ুয়া

শুক্রবার , ১ জুন, ২০১৮ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ
43

ছেলেবেলায় আমি যারা পান খান তাদের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। এখনও সে অভ্যেস রয়েছে। মাঝে মাঝে আমার পানখোরদের নিয়ে গবেষণা করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি গবেষক নই, তবে গবেষণা ছাড়াই বলতে পারি যারা পানখোর তারা মস্তিষ্কবান, হৃদয়বান এবং সংস্কৃতিমনা হয়ে থাকেন। বলতে দ্বিধা নেই আমি পান অনুরাগী। মা বলতেন যাদের মুখে সারাদিন পানের খিলি থাকে তারা পূর্বে ছাগল ছিল। ছাগল নাকি পান খেতে ভালোবাসে। জন্মান্তরে যাদের বিশ্বাস রয়েছে তারা ছাগল হওয়ার কথা মেনে নিলেও আমি মানিনা। তবে এটা লক্ষ্য করেছি পানখোরদের মধ্যে অনেকেই ছাগলামি করে থাকেন। ছাগলামি কথাটি কি তা আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারবোনা। এ ধরনের কথা উপলদ্ধি করতে হয়। মহাত্মা গান্ধী ছাগলের দুধ খেতে খুব পছন্দ করতেন। এ জন্যেই তিনি যেখানে ভ্রমণে যেতেন সেখানে সাথে করে ছাগল নিয়ে যেতেন। মহাত্মা গান্ধীর পান খাওয়ার কথা আমি শুনিনি। শুনেছি কবি নজরুল ইসলামের কথা। তিনি অনবরত পান চিবোতেন। তাঁকে পান খাইয়ে অনেকে গান লিখিয়ে নিয়েছেন। ছাত্রজীবনে আমি কবি সুফিয়া কামালকে একটি অনুষ্ঠানে পানের ডিব্বা হতে একটির পর একটি পানের খিলি নিয়ে মুখে গুঁয়ে দিতে দেখেছি। পান খাওয়ার এ অভ্যেস তাঁর সারা জীবন ছিল কিনা সে খবর আর আমি রাখিনি। পান খাওয়ার অভ্যেস আমার মা’রও ছিল। তিনি জর্দা মিশিয়ে পান খেতেন। পান খেতে না পারলে মা পাগলামি করতেন। তাঁকে পান খাওয়ার অভ্যেস ছেড়ে দিতে আমরা বলেছি। তিনি আমাদের কথা পাত্তাই দিতেন না। অদ্ভুত ব্যাপার হলো জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎ করে পান খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমার এক কবি বন্ধু রয়েছে যার শান্তি নিকেতনি ঝোলায় সব সময় ডিব্বা ভর্তি পান থাকে। তিনি পান খাওয়া ছাড়া কবিতা লিখতে পারেন না। সংসারে পান খাওয়া নিয়ে স্বামী স্ত্রীদের মধ্যে আমি বিবাদ হতেও দেখেছি। স্বামী পান খান স্ত্রী খান না এমন পরিবার যেমন রয়েছে তেমনি স্বামীস্ত্রী দু’জনেই পান খান তেমন পরিবারও রয়েছে। সে কালের স্ত্রীরা ভাত খাওয়ার পর পানের বাটা নিয়ে স্বামীদের সামনে বসতেন। বাটায় ভর্তি থাকতো পানের খিলি। সুন্দর করে পানের খিলি তৈরী করার আর্ট তাদের জানা ছিল। এই খিলি স্বামীর মুখে গুঁেজ দিয়ে স্ত্রীরা তাদের ইচ্ছে ও দাবির কথা জানাতো। পানের রসে সিক্ত হয়ে স্বামীরা স্ত্রীদের সব ইচ্ছে ও দাবি পূরণ করে দিতেন। অনেক ঘুষখোর রয়েছে যারা পান খেতে ভালোবাসে। এদের পান খাওয়াতে পারলে এরা কম টাকা ঘুষ নিয়ে কাজ করে দেয়। এই শহরে এমন কিছু পানের দোকান রয়েছে যে সব দোকান হতে পান খাওয়ার জন্যে মানুষ দূর হতে ছুটে আসে। পানখোররা তাদের নির্দিষ্ট পানের দোকান ছাড়া অন্য দোকান হতে পান খেতে চায়না। ঘর হতে এ দোকান দূরে থাকলেও তারা রিকশা করে এসে এই নির্দিষ্ট পানের দোকান হতে পানের খিলি কিনে নিয়ে যায়। পানখোররা পানের জন্যেই সচল রয়েছেন। পান ছাড়া জীবনটা তাদের কাছে অর্থহীন। সেকালে অনেক খানদানি পরিবার তাদের খানদানি বজায় রাখবার জন্যে পান খাওয়ার রেওয়াজ চালু করেছিল। এই রেওয়াজ এখনও একেবারে হারিয়ে যায়নি। পানের কদর সব কালেই ছিল। পান ছাড়া তো বিয়ের আসর ভাবাই যায় না। ইচ্ছে করলে পানকে নিয়ে আমরা বিতর্ক প্রতিযোগিতা করতে পারি। একপক্ষ থাকবে খাব’র পক্ষে। অন্য পক্ষ খাবনা’র পক্ষে। পান খাবখাবনা বিতর্ক নিশ্চয়ই জমে উঠবে। চাকরী জীবনে আমার এক দন্তহীন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সাথে সখ্যতা হয়েছিল। তাঁর বাসায় বেড়াতে গেলে দেখতা? তিনি হামান দিস্তায় পান ছেঁচেন। দাঁত ছিলনা বলে ছেঁচাপান তিনি খেতেন। এই ছেঁচা পান তিনি পরম তৃপ্তির সাথে খেতেন। আমাকেও খেতে দিতেন। ছেঁচা পানের স্বাদই আলাদা। ছেঁচা পান খাওয়ার জন্যেই এই দন্তহীন বৃদ্ধ সুহৃদটির সাথে আমার আড্ডা দিতে ভালো লাগতো। তিনি চিরকুমার ছিলেন। নিজ হাতে রান্নাবান্না করতেন। এই ভদ্রলোকের কথা এখনও আমার মনে রয়েছে। তাঁকে আমি ভুলিনি। পানের সুনামদুর্নাম দুটোই রয়েছে। কবিরাজরা পানের রসের সুনাম করেন। তাঁরা বলে থাকেন পানের রস হজমীকারক এবং পেটের গ্যাস কমিয়ে দেয়। আমার ধারণা আমাদের এ দেশে পেট রোগীরাই সংখ্যা গরিষ্ঠ। পান তাই হারিয়ে যাবেনা। বেকার বসে না থেকে পানের দোকান খুলুন। ভালো চলবে। পানের রস খান। অশান্ত পেট শান্ত হবে। জীবনটা রসময় হয়ে উঠবে।

x