পাঠ্যপুস্তকে দেশপ্রেম শিক্ষা

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ১ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৭:৩১ পূর্বাহ্ণ
39

ড. জন বাটলার ওয়াটসনের একটি উক্তি দিয়ে প্রতিটি শিশুর দেশ প্রেম শিক্ষা বিষয়ে লিখাটা শুরু করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের কোন সহজাত প্রবৃত্তি নাই।’ সেই একই কারণে বলা চলে যে, শিশুর অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষ কোন বৈশিষ্ট্য ও নেই। জন্মগতভাবে প্রতিটি শিশুর মধ্যে সমান প্রতিভা থাকে এবং প্রতিটি শিশু এক রকম ভাবে জন্মগ্রহণ করে থাকে। অভিন্ন এই মেজাজ ও চিন্তা শক্তি ধীরে ধীরে বিভিন্নভাবে বেড়ে উঠার কারণ প্রসারিত হয়। শিশুর বেড়ে উঠার কারণ যাই হোক তা যে পরিবেশ, শিক্ষা এই দুয়ের বন্ধনে আবদ্ধ এটি আর অস্বীকার করার কোন সুযোগ আমি দেখছি না। প্রকৃতি সকল শিশুর মধ্যে মানসিকভাবে একই রকমভাবে সৃষ্টি করলেও এই দুটি কারণে মানুষ নানাভাবে নানামতের চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠে। আমাদের পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার পরিবেশ, পারিবারিক প্রভাব ইত্যাদি এই অভিন্ন চিন্তার ক্ষেত্রে দায়ী।
শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত কিছু আকাঙ্ক্ষা থাকে এর অধিকাংশ ব্যক্তিগত আর বাকীগুলো সমষ্টিগত আকাঙ্ক্ষা বটে। তবে লোভ, অতি উচ্চবিত্ত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তা অধিকাংশ মানুষকে প্রভাবিত করে। ধরা যাক একজন ব্যবসায়ীর কথা তিনি তার অপর ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু সংরক্ষণমূলক রাজস্বের ক্ষেত্রে তিনি অবশ্যই আবার একজোট। এর কারণ কী ? কারণ একটাই তা হল ব্যক্তিগতভাবে সে বিত্তশালী হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ব্যক্তিগত চাহিদার সাথে সমন্বয় করতে গিয়ে মানুষ দেশের চাহিদার কথা ভুলে যায়। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে এবং পারিবারিক চাহিদা নির্ধারণে যদি শিশুকে সেভাবে দেশপ্রেমে জাগ্রত করা হয় তাহলে শিশু তার সমগ্র চিন্তা ও চিন্তার জগৎকে দেশের স্বার্থে জাগ্রত করতে পারবে। এখানেই আমাদের চিন্তাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে, আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।
আমরা যদি আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা, পরিবার, কিংবা সমাজের দিকে তাকাই দেখতে পাব গোটা পশ্চিমা জগতের শাসক ও মানুষ গুলো বালক-বালিকাদের শেখায় তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ হলো রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা-অন্তত যে রাষ্ট্রের তারা নাগরিক। আর রাষ্ট্রীয় সরকারের অনুগত থাকা একান্ত কর্তব্য যে রাষ্ট্রে সে বড় হবে। কিন্তু পরিতাপের সাথে বলতে হয় আমাদের দেশে কিছু হলেই রাষ্ট্রীয় বিআরটিসি বাস ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে জ্বালাও পোড়াও শুরু হয়। এই শিক্ষা সে তরুণটি কোথায় পেল ? রাষ্ট্র বা সমাজ বা পরিবার এখানেই ব্যর্থ। আমাদের শিক্ষা বলেন আর পরিবার বলেন এই বিষয়টি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে লক্ষ্য না করাতে সামাজিক জীবনে এই ভয়াবহ অধ্যায় সৃষ্টি হতে লাগল। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো কারো সাথে যুদ্ধ বাজলে তারা তরুণ ও রাষ্ট্রের মানুষদের বুঝাবার চেষ্টা করেন যে, এটি ছিল আত্মরক্ষামূলক আর বৈদেশিক রাষ্ট্রের হলে বলেন আক্রমণাত্মক। এই ধারণায় তাদের উজ্জীবিত করে রাখে। যার ফলে সে দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে প্রাথমিক অবস্থা থেকে দেশ প্রেম জাগ্রত হয়, তারা প্রচলিত অর্থে সেইভাবে বেড়ে উঠেন।
এই সব রাষ্ট্র শুধু তাদের চাহিদা বা কল্যাণ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয় না,
অপরদিকে অপরাপর রাষ্ট্র সম্পর্কেও নাগরিকদের দেয় বিরূপ ধারণা। দেশ দখলকেও তারা নাগরিকদের কাছে তুলে ধরে সভ্যতা বিকাশের প্রশ্নে এই কাজটি আমাদের করতে হয়েছে। নাগরিকরাও তা মেনে নেন অকপটে। যারা আন্তর্জাতিক বিশ্ব সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন তারা ভাল করে জানেন এই সব বিষয়ে তাদের মূলত. দৃষ্টিভঙ্গিটা কী? কিছুদিন আগে ঢাকায় একটি সেমিনার হয় যার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘ব্যবসায় নৈতিকতা।’ এক ব্যবসায়ী তার বক্তব্যে বলেন, পুরো ব্যবসায়ী সমাজে ১০জন সৎ ব্যবসায়ী খুঁজে বের করা যাবে না। এটি শুধু ব্যবসা কেন আমাদের সকল সেক্টরে সমান সমস্যা। ডাকাতির জন্য, হত্যাকাণ্ডের জন্য এমনকি দেশের সমগ্র সমস্যার জন্য দায়ী আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা। যেখানে দেশ প্রেমে আগ্রহী হওয়ার কোন বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার গন্ধ ও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই পশ্চিমা বিশ্বের আদলে একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে মূল বিষয় থাকবে আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম। তাহলে ব্যবসায়ী কেন সকল ক্ষেত্রে সৎ মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে।
একজন মানুষের ১০টি বাড়ি আছে, ১০টি গাড়ি আছে আর ১০টি প্রতিষ্ঠানের তিনি প্রধান। আমি অত্যন্ত সাদামাটা ভাবে যদি আপনাকে প্রশ্ন করি ১০টি বাড়ি থাকলেও ১০টি কক্ষে কী একজন মানুষ একত্রে ঘুমাতে পারবেন? আপনি বলবেন না। তাহলে তার কেন চিন্তায় এইটুকু আসবে না যে, সেই যা করছে তা ভুল-যেখানে আরো ১০জন সাধারণের অংশীদারিত্ব রয়েছে। শিক্ষাকে এমন ভাবে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে যেখানে শিশুকাল থেকে একজন মানুষ তার রাষ্ট্রীয় আনুগত্য নিয়ে বড় হবে। তাহলে খুঁজতে হবে ভাল মানুষের। এমনিতেই পথে ঘাটে যারা থাকবে তারা সবাই ভাল হবে। সপ্তাহ খানেক আগে একটি চ্যানেলের সংবাদের প্রতিবেদনে দেখলাম এক চাকরীজীবী অত্যন্ত দাপটের সাথে সাক্ষাতকারে বলছে যে, ‘‘আমি দুর্নীতি করি, ঘুষ খাই এবং অপরকেও তাতে উদ্বুদ্ধ করি। একই কারণে আমি জেলও খেটেছি আবার টাকা দিয়ে বেরও হয়েছি। আমার ধারণা জেল হবে কিন্তু আমাকে তো ফাঁসিতে ঝুলাবে না।’ এই যে ধারনা কোথায় সে পেল? আমি অবাক হয়ে দেখে রইলাম আর ভাবলাম কোন দেশে আছি।
শিক্ষাব্যবস্থা নানাদেশে, নানা সময়ে একের পর এক পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন করা হয়েছে। ধারাবাহিক নতুন আবিস্কার ও নতুন পদ্ধতি চালু হচ্ছে। আমরা কখনও আবিস্কার ও নতুনের সাথে খুব কাছে থেকে পরিচিত হয়েছি আবার কখনও আবিস্কারের খুব দুরে সরে গেছি। আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির সার্বিক পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কালে কালে আমরা শিক্ষাব্যবস্থা বা পদ্ধতি আবিস্কারের কথা চিন্তা করলেও বস্তুতঃ আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা হতে অনেক দুরে সরে আছি। অথচ বহিঃ বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা আজ অনেক উন্নত। এক জরিপে দেখা গেছে যে জাতি সার্বিকভাবে উন্নতি লাভ করেছে, সে জাতির উন্নতির মূলে রয়েছে আধুনিক ও সময়োপযোগি শিক্ষাব্যবস্থা ও পদ্ধতি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় চলছে এক অশনি সংকেত। সামগ্রিকভাবে জাতীয় শিক্ষার এই দুঃসহ অবস্থা চিন্তাশীল মানুষকে বাধ্য করছে শিক্ষার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিশেষণ করতে, আর তার প্রতিকারের পথ বের করতে। আজকাল দেশপ্রেম সম্পর্কে যে শিক্ষা দেয়া হয় তা প্রায়ই বুদ্ধিগত দিক থেকে বিপদগামী, কিন্তু নৈতিক বিচারে নির্দোষ। দেশ প্রেমের শিক্ষা যিনি দেন তিনিও আজ ভুল শিক্ষার প্রতি আনুগত্যশীল এক দাযিত্ববান মানুষ। শিক্ষকদের স্বভাবই এই যে, তারা জানে যতটুকু ঠিক ততটুকু শিখাতে পারেন। ইতিহাসের শিক্ষক ইতিহাস পড়াবেন, তাকে দিয়ে অর্থনীতির ক্লাস বিপর্যয় ডেকে আনবে। সেই একই অর্থে মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার সুদূরপ্রসারী দিক থাকবে এখানে কল্যাণ অকল্যাণ থেকেও মানবমুক্তি অত্যন্ত বেশি সংবেদনশীল হবে এটাই স্বাভাবিক।
শিক্ষার গতি আনতে হবে সময়ের প্রয়োজনকে স্বীকার করে। অতীতের ভালোকে ধরে রেখে নতুন ও আধুনিক চিন্তার সমন্বয়ে তৈরী করতে হবে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা। আজকের প্রয়োজন, বিশ্বের প্রয়োজন, উন্নতির প্রয়োজনে ভবিষ্যতের ভাবনাকে প্রাধান্য দিতে হবে। একটি যুগোপযোগি শিক্ষাব্যবস্থা সুস্থ, সমৃদ্ধ ও আধুনিক প্রগতিশীল জাতি উপহার দিতে সক্ষম। শিক্ষার এ সমস্যা পরিত্রানের কি কোন ব্যবস্থা নেই ? এমন ভাবনা উদ্বেল করেছে সারা জাতিকে। এই অরাজক অবস্থা থেকে মুক্তি সকলের কাম্য। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ আজ অনুধাবন করতে পেরেছে মুক্ত চিন্তাসম্পন্ন সুনাগরিকের আজ বড় অভাব যার মধ্যে দেশপ্রেম থাকবে। আর মুক্ত চিন্তার নাগরিক তৈরীর সর্বাজ্ঞে প্রয়োজন একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা।
শিক্ষাকে দেশ কাল ও সমাজের সকল স্তরের উপযোগি করে গড়ে তুলতে হবে-এ কথা এখন আর কথার মালা নয়, বাস্তবতা। আমাদের দেশ বছরের পর বছর ক্রমাগত মাতালের মতো ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। আমি মাঝে মাঝে চোখের সামনে যেন নরক দেখতে পাই। আমার মতো যারা নেশাগ্রস্ত নন, তারা তো দেশের এই বিপর্যয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়ই। আমাদের সন্তানরা আজ যেখানে সভ্যতাকে ছুঁয়ে যাওয়ার কথা সেখানে তারা কোথায় যাচ্ছে ? তাই শিশুকালকে জীবনের মৌলিক সময় হিসাবে চিহ্নিত করে এখানে সকল চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে জাতি মুক্তি পাবে। আগামী প্রজন্ম সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে বেড়ে উঠুক একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে এই শুধু প্রত্যাশা থাকল।

x