পাচারকারী সিন্ডিকেট আবার সক্রিয়

সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা নারী শিশুসহ ৯২ রোহিঙ্গা উদ্ধার

উখিয়া, মহেশখালী ও বাঁশখালী প্রতিনিধি

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:০২ পূর্বাহ্ণ
48

চট্টগ্রামের বাঁশখালী এবং কক্সবাজারের উখিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফে সমুদ্র উপকূলে অভিযান চালিয়ে ৯২ রোহিঙ্গা নারী-শিশু ও পুরুষকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া সবাই বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। তারা স্বেচ্ছায় দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিল। গত শনিবার থেকে গতকাল সোমবার ভোররাত পর্যন্ত এ অভিযান চলে। এসময় মহেশখালীর হোয়ানকের পানির ছড়া থেকে কবির আহমদ নামে এক দালালকেও আটক করা হয়।
গতকাল সোমবার ভোররাতে উখিয়ার ইনানী ঝাউবন থেকে মালয়েশিয়াগামী ২৩ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে ইনানী ফাঁড়ির পুলিশ। এদের মধ্যে ১৭ জন কিশোরী, ২ জন যুবক ও ৪টি শিশু রয়েছে। এর আগে রোববার রাত ১০টার দিকে টেকনাফের সমুদ্র উপকূলীয় বাহারছড়া ইউনিয়নের বড় ডেইল এলাকা থেকে ৮ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে বাহারছড়া ফাঁড়ির পুলিশ। এদের মধ্যে ৬ জন নারী ও ২ জন পুরুষ রয়েছে। উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের ছৈয়দ আমিনের মেয়ে তাসমিনা আক্তার (১৬) ও ইয়াসমিন আক্তার (১৫) জানায়, তাদের দুই ভাই মালয়েশিয়া প্রবাসী। তারা সেখানে রোহিঙ্গা ছেলেদের সাথে বিয়ে ঠিক করে দালালদের মাধ্যমে সমুদ্র পথে তাদের নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সমুদ্রে বোটে ওঠার আগেই তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তাদের সাথে এসময় ১০ বছরের ভাতিজা মো. রশিদও ছিল।
পুলিশের হাতে ধরা পড়া বালুখালী ক্যাম্পের ফাতেমা বেগম (২৫) জানান, তিনিও দালালের মাধ্যমে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাওয়ায় জন্য ইনানী উপকূলে বোটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এসময় তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তিনি জানান, তার স্বামী কালা মিয়া বিগত ৫ বছর ধরে মালয়েশিয়া প্রবাসী। স্বামীর নির্দেশেই তিনি মালয়েশিয়া যেতে বের হয়েছিলেন। ফাতেমার সাথে তার মেয়ে আকলিম (৬) ও ছেলে মো. আয়াজও (৫) ছিল।
এছাড়া কুতুপালং ক্যাম্পের মৃত রশিদ আহামদের দুই মেয়ে সেতারা বেগম (১৭) ও রোকেয়া বেগম (১৫) জানায়, তারা সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাওয়ায় জন্য বের হয়েছিল। এর আগে তারা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট
রাখাইন থেকে মা ও ভাইদের সাথে পালিয়ে এসে কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল। তারা জানায়, মালয়েশিয়ায় তাদের ভাইয়েরা তাদের দুই বোনের জন্য বিয়ে ঠিক করেছিল। তাই ভাইদের নির্দেশেই তারা সেখানে যাচ্ছিল।
স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি কঙবাজার, উখিয়া, টেকনাফ ও মহেশখালীতে মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
উখিয়া থানার ওসি মো. আবুল খায়ের জানান, উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা মানবপাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এসব চক্রের সদস্যদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্ব-স্ব ক্যাম্পে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে মহেশখালীতে ২৪ ঘণ্টায় মালয়েশিয়াগামী ৪১ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে উদ্ধার করেছে থানা পুলিশ। গত ১২ মে দিবাগত রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত পুলিশ বড়মহেশখালীর ফকিরা কাটা, হোয়ানকের পানির ছড়া ও হরিয়ার ছড়া এবং কালারমার ছড়ার আঁধার ঘোনা ও নোনাছড়ি গ্রামে এসব অভিযান চালায়।
মহেশখালী থানার ওসি প্রভাষ চন্দ্র ধর জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হোয়ানক পুলিশ ক্যাম্পের আইসি এএসআই সফিকুল ইসলাম ও কালারমার ছড়া পুলিশ ক্যাম্পের আইসি এসআই লিটন চন্দ্র সিংহের নেতৃত্বে পুলিশের একাধিক টিম রোববার দিবাগত রাত দেড়টায় হোয়ানকের পানির ছড়া গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদের পুত্র কবির আহমদের বাড়িতে অভিযান চালায়। এসময় দুই শিশুসহ ১২ রোহিঙ্গা নারী পুরুষকে উদ্ধার এবং কবির আহমদকে আটক করা হয়। একই দিন পৃথক অভিযানে কালারমার ছড়ার নোনাছড়ি ও আঁধার ঘোনা এলাকায় বিল থেকে ১৫ জনকে এবং গতকাল সকালে হরিয়ার ছড়া গ্রামের ছৈয়দ মিয়া মাঝির বাড়ির পাশে বিল থেকে দুই শিশুসহ ১৪ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে উদ্ধার করা হয়। এদের আইনি প্রক্রিয়া শেষে ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এছাড়া আটককৃত দালাল কবির আহমদ সহ জড়িত অন্যান্যদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করা হচ্ছে বলে জানান ওসি প্রভাষ চন্দ্র ধর।
এদিকে বাঁশখালীর ছনুয়া থেকে গত রোববার রাতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মালেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিতে চাওয়া ২০ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা বর্তমানে বাঁশখালী থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।
জানা যায়, ছনুয়ার চিহ্নিত কিছু মানবপাচারকারী বিয়ে ও কম খরচে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে বাঁশখালীতে জড়ো করে। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি টের পেয়ে তাদের উদ্ধার করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা হলেন, নজির হোসেনের মেয়ে শাহীন আকতার (১৭), মৃত আমীর হোসেনের মেয়ে রহিমা বেগম (১৭), কাদির হোসেনের মেয়ে রুজিনা আক্তার (১৮), রশিদ আহমদের মেয়ে আকিদা আক্তার (২১), মৃত রকিব আলীর মেয়ে পারভীন আক্তার (১৬), আলী আকবরের মেয়ে হোসনে আরা বেগম (১৭), আবদুর রহমানের মেয়ে তসমিন আক্তার (১৬), ছাবের আহমদের মেয়ে জমিলা বেগম (১৩), আবুল হোসেনের মেয়ে আছমা বেগম (১৩), জামাল হোসেনের মেয়ে আবিদা বেগম (১৬), রশিদ আহমদের মেয়ে আবিদা (১৫), মো. আইয়ুবের স্ত্রী বিবি ফাতিমা (১৬), নুর আহমদের কন্যা জমিলা বেগম (২২), আনোয়ারের পুত্র নুর কামাল (১৫), শফিউল্লাহর স্ত্রী ছেনোয়ারা বেগম (৩০), আবদুল খালেকের মেয়ে মিনারা বেগম (২০), জেবর মুল্লুকের মেয়ে নুর বেগম (২২), মৃত আব্বাসের ছেলে ইব্রাহিম (১৬), আমীর হোসেনের ছেলে জমির হোসেন (২৫), মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে আরিফুল্লাহ (১৩) প্রমুখ।
বাঁশখালী থানার ওসি কামাল হোসেন জানান, উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দালালদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা দায়ের ও তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

x