পাখির অভয়ারণ্য আর লেকের অপার সৌন্দর্যে মোহিত শিক্ষার্থীরা

প্রদীপ দাশ

শনিবার , ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
301

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ। এর মাটি, তরুলতা, বনবনানী ও নদী নালা এদেশকে বৈচিত্র্যময় ও অতুলনীয় গৌরব দান করেছে। আর এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর অজানাকে জানা এবং অদেখাকে দেখার আকাঙক্ষা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই মানুষ দেশ ভ্রমণের নেশায় বিভোর হয়ে পড়ে। ভ্রমণ সম্পর্কে মহা মনীষী শেখ সাদী বলেছেন, ‘ভাবুক আর ভ্রমণকারী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দরবেশ।’ গৃহকোণে বন্দি না থেকে কুম্ভকর্ণের মতো জীবনযাপন করার মধ্যে সার্থকতা নেই। বদ্ধ ঘরের রুদ্ধ কপাট খোলে বিশাল এ বসুন্ধরার আনাচেকানাচের রূপবৈচিত্র ও সৃষ্টির রহস্য ভেদ করার জন্য যুগে যুগে ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকরা ছুটে গিয়েছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এরূপ ভ্রমণের অভ্যাসটা করে নিতে হয় শিক্ষা জীবন থেকে। আর শিক্ষা জীবনে এরকম ভ্রমণের অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় শিক্ষা সফর। তাই শিক্ষা সফরের সুযোগটা মিস করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা, শিক্ষা সফরকে জ্ঞানরাজ্যের প্রবেশধার বলা হয়। সেদিক বিবেচনায় রেখে কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজের সংস্কৃতির রুপকার অধ্যক্ষ যিনি এবার থানা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধানের গৌরব অর্জন করেছেন, তিনি প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও বার্ষিক শিক্ষা সফরের সুযোগ করে দিয়েছেন। এই শিক্ষা সফরকে বাস্তবে রূপদান এবং সার্থক করার মানসে যিনি এক সপ্তাহ আগে থেকে অক্লান্ত যোগাযোগ করে গেছেন, যাঁর অবদানকে সর্বাগ্রে স্বীকার করতে হয় তিনি হলেন, অত্র প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চের সম্পাদক সৈয়দ উমর ফারুক। বলতে গেলে তাঁর নেতৃত্বে অত্র প্রতিষ্ঠান আজ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।

দিনটি ছিল ২৫ জানুয়ারি ২০১৮, সকাল ছয়টা। প্রতিদিনের ন্যায় ঘুম ভাঙল। মনে পড়ল বার্ষিক শিক্ষা সফরের কথা। দেরি না করে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম এবং সাতটার মধ্যে ক্যাম্পাসে পৌঁছে গেলাম। ইতিমধ্যে সাতটি বাস ও একটি মাইক্রো সারিবদ্ধভাবে যাত্রার উদ্দেশ্যে অপেক্ষমাণ। সবগুলো বাসে মাইক ও ব্যানার ঝুলানো হয়েছে। স্কুল এবং কলেজের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরের আনন্দ উপভোগ করার জন্য সকালসকাল ক্যাম্পাসে চলে এসেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নির্দিষ্ট বাসে উঠে সঠিক নির্দেশনা জানিয়ে দিলেন। ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে গাইড দিয়ে যাচ্ছেন উপাধ্যক্ষ সানজিদা মোখতার তানজিন। যখন সকাল ৮টা তখন সবকয়টি বাস পরম করুণাময়ের নামে এক সাথে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। সব কয়টি বাসে শিক্ষার্থীরা গানে গানে রাজপথ মাতিয়ে রাখল। ৬নং বাসে ৯ম ও ১০ম শ্রেণির শিক্ষাথীদের সহকারী শিক্ষক গোলাম রব্বানী এবং ৭নং বাসের ৮ম শ্রেণির শিক্ষাথীদের গণিত বিষয়ের শিক্ষক শওকত হোসাইনের তত্ত্বাবধানে স্বাধীন মুক্ত বিহঙ্গের মতো গানের পর গান গাইতে থাকল। ২নং বাসে গণিত বিষয়ের প্রভাষক আকতার হোসেন ও ৪নং বাসের প্রভাষক মহিউদ্দিন রিপনের নাচের কথা না বললে মনে হবে, যেন অঙ্গহানি হয়েছে।

বেলা এগারটার পূর্বেই পৌঁছে গেলাম রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত অপূর্ব সুন্দর শেখ রাসেল এভিয়ারী এন্ড ইকো পার্কে, যেটি পশুপাখি অভয়ারন্য নামে খ্যাত। শিক্ষকশিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবাই মূল গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেই সকলের চোখ জুড়িয়ে গেল। সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কবির স্যার ভেবে না পায় কার সাথে ছবি তুলবে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এই পার্কটিতে কৃত্রিম হৃদ দেখে সবাই মুগ্ধ। লেকের পাড় ধরে চলতে গিয়ে চোখ পড়ল বিভিন্ন রকমের পশুপাখি ও কচ্ছপের সমাহার। পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠতে দেখতে পেলাম রাশি রাশি ময়ূর মেলা। একাধিক জায়গায় ময়ূর পেখম খুলে নৃত্য দেখার অভিজ্ঞতা আমার অতীতকে হার মানিয়েছে। কতটুকু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম তিথির পাখি। শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে নতুনভাবে আবিস্কার করল এবং প্রকৃতির সাথে মিশে গেল।

আমাদের মধ্যে প্রকৃতিকে সবচেয়ে কাছ থেকে উপভোগ করেছেন ইংরেজী বিষয়ের প্রবীণ শিক্ষক মোবারক আহমদ। তিনি অনুভব করছেন Marco Polo তার ভ্রমণ কাহিনীর সেই পংক্তি;

Traveling is universal

Travelling is education

travelling is inspiring

অনেক ঘোরাফেরার পর ক্লান্তি দূর করার জন্য সবাই বার্ড’স চত্ত্বরে বসেছে, এমন সময় মুনমুন ম্যাডাম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘোষণা করলেন। শুরু হলো নাচ আর গান। গানে গানে জমজমাট হয়ে উঠল বার্ড’স চত্ত্বর, ইতিমধ্যে কুতুবী স্যারের ঘোষণাণ্ড

হেলায় সুবর্ণ সুযোগ হারাবেন না,

চলে গেলে আর পাবেন না,

যদি লাইগ্যা যায়. . .

শিক্ষকশিক্ষার্থীরা আনন্দের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিলেন। বাংলা বিভাগের প্রভাষক শাহেদা পারভীনের রোমান্টিক গানে শিক্ষার্থীরা যেন প্রাণ ফিরে পেল অন্যদিকে ওসমান স্যার এই গান শুনে বেহুশ, তিনি বার বার বলতে লাগলেন, বাঁচাও . . . আমাকে বাঁচাও. . .। কলেজ ছাত্রীরা একের পর এক নৃত্য পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে আরো প্রানবন্ত করে তুলল। নাচে গানে মাতিয়ে রাখল ইসরাতুনন্নেছা, ইমন, ফারজানা, আইরিন ও অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাজ্জাদের কণ্ঠে, ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা এখন আর নেইগানে গা ভাসিয়ে উপাধ্যক্ষ সানজিদা মোখতার লটারির পুরস্কারের খালি বাক্সকে ঢোল মনে করে পানির বোতল দিয়ে ব্যান্ডের মতো করে বাজাতে দেখে শিক্ষিকা মুশফেকা কামালসহ সকল ম্যাডাম একাত্মতা ঘোষণা করে আনন্দে আপ্লুত হয়ে স্বপ্নরাজ্যে হারিয়ে গেলেন। ইতোমধ্যে ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক আইনুন নাহার ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনীর কথা জানিয়ে দিলেন; Travelling makes one know the mystery of lordis creation. Travelling gets us self confident

বেলা যখন ২টা তখন লটারির ড্রএর পালা। কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজের সভাপতি সৈয়দ উমর ফারুক মহোদয় চোখ বন্ধ করে একের পর এক কুপন উঠাতে লাগলেন এবং বিজয়ীদের কুপন নম্বর ঘোষণা করতে লাগলেন। শিক্ষার্থীদের সাথে সাথে রসায়ন বিভাগের প্রভাষক অনুপম দাশ ও গণিত বিষয়ের শিক্ষক সবুজ বড়ুয়া ভাগ্য পরীক্ষা করার জন্য পরিবারের সদস্যদের ডাক নাম ও কাল্পনিক নামে নেওয়া লটারির কুপন অধীর আগ্রহে টিকেট হাতে নিয়ে বার বার নম্বর মিলিয়ে দেখতে লাগলেন, কে পাবেন প্রথম পুরস্কার, কে হবেন ডিনার সেট বিজয়ী। অনেক উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে শেষ হলো লটারির ড্র। ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেল খাবারের পর্ব। না বললেই হয় না, খাবারের আয়োজন, তিনি হলেন চন্দ্রঘোনা বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াছ কাঞ্চন। তিনি নিজে পুকুর থেকে সদ্য মাছ তুলে খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চের সম্পাদক সৈয়দ উমর ফারুককে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেন। এরপর সবাই রওনা দিলাম কাপ্তাই নেভাল ভ্রমণের উদ্দেশ্যে।

ঘড়িতে তখন চারটা, গিরি বেষ্টিত কাপ্তাই শহীদ মোয়াজ্জেম নৌঘাঁটিতে পদার্পণ করে উৎফুল্ল হৃদয়ে বিমুগ্ধ নয়নে মৌমাছির মধু আহরণের ন্যায় সৌন্দর্যের অবগাহনে গা ভাসিয়ে দিয়ে যেন নিজেকেই ভুলে গেলাম। এমন সময় লুৎফুল কবির স্যারের সুমধুর আহবানে, স্পিড বোটে করে নদী পথে ভ্রমণের জন্য সবাই প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। ১১ টি স্পিড বোট ভাড়া করা হয়েছে। এমন সুযোগ যেন মিস না হয় সবাই সিঁড়ি বেয়ে সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনার জন্য পুলকিত মনে দ্রুত সবাই বোটে উঠে পড়ল। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীরা গান ধরল, মাঝি নাও ছাইড়া দে, ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে . . . মনে হচ্ছিল আমরা যেন যুদ্ধ জয়ে চলেছি। তখন শেষ বিকেল। সূর্য অস্ত যায় যায় মুহূর্ত। স্পিড বোটের ছাদে আমাদের গৌরবের সাক্ষী শিক্ষার্থীর ভাটিয়ালী, জারী ও আধুনিক গানের মাধ্যমে নৃত্যের ঝংকারে মেতে উঠল। এক দিকে নৌ পথে ভ্রমণের আনন্দ অন্যদিকে অপরূপ সূর্যাস্ত দৃশ্যের বাস্তব অভিজ্ঞতা আমার অতীতকে হার মানায়।

এবার ফেরার পালা। স্পিড বোট থেকে নেমে কিছু শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেখে সহকারী শিক্ষক গোলাম রব্বানী নিজেকে প্রকাশ করে বললেন, সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীকে সাজিয়েছেন সুন্দরভাবে। শিক্ষা সফরে না আসলে সেটা অনুভব করতে পারতাম না। একজন শিক্ষার্থী বলল, এই শিক্ষা সফরে এসে এখন মনে হচ্ছে এই দেশে জন্ম আমার সার্থক হয়েছে। ইচ্ছে হচ্ছে চিরদিন এ দেশের মাটিতে বেঁচে থাকি। শিক্ষার্থীদের অভিমত শুনে আমারও মনে হলো।

বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি

দেশে দেশে কতনা নগর রাজধানী

মানুষের কীর্তি কত নদীগিরি সিন্ধু মরু

কতনা আজানা জীব, কতনা অপরিচিত তরু. . .

রয়ে গেল অগোচরে।’

অনেক আনন্দ উল্লাসে শিক্ষা সফর এবারের মত যবনিকা টানার পালা। কাপ্তাই হতে ফেরার পথে মাইক্রো যখন চন্দ্রঘোনা অতিক্রম করে দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চের রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধিকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি মরিয়ম নগর আসার সাথে সাথে সিনিয়র শিক্ষক সৈয়দ মুহাম্মদ মুছা হঠাৎ স্বপ্ন দেখলেন সহধর্মিনীর পছন্দের সদ্য কেনা শো জোড়ার মধ্যে একটি নাই। তাই দেরি না করে গাড়িতে অনেক খোঁজার পর তিনি বুঝতে পারলেন স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হল। এখন বাসায় গিয়ে কী জবাব দিবেন, তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জুতা আবিস্কার করার জন্য গাড়ি উল্টা দিকে ঘোরানো হলো। ঠিক যেই যায়গায় বীর চট্টগ্রাম মঞ্চের রাঙ্গুনিয়ার প্রতিনিধি নামলেন সেখানেই জুতা আবিস্কার করে যেন বিশ্ব জয় করলেন। গাড়িতে শুরু হলো, হাসির ফাটাফাটি অফার।

শিক্ষা সফর শেষ হলো। কিন্তু সকলের অন্তরে অম্লান থাকবে শিক্ষা সফরের আনন্দময় স্মৃতি। এ শিক্ষা সফরের গুরুত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনবদ্য আবিস্কার। তারা স্বচক্ষে প্রকৃতিকে এত কাছ থেকে দেখে যা শিখেছে বাস্তব জীবনে তা কাজে লাগিয়ে একদিন সমুদ্রের তলদেশ থেকে হিমালয়ের মতো সর্বোচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণে নিজেদের প্রস্তুতি নিতে পারবে এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক : সহকারী শিক্ষক

কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ

x