পাখিজীবনের কবি শহীদ কাদরী

মিলটন রহমান

শুক্রবার , ৪ অক্টোবর, ২০১৯ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
32

মাটি ছেড়ে পাখিজীবন গ্রহণের পর কবি শহীদ কাদরী কবিতা রচনা করেন নি, তা ঠিক নয়। কবিতা সব সময় কাগজে লিখতে হয় না। কবিতা তো প্রথমে রচিত হয় পাঁজর ও মগজের কোষে। তাকে কেবল সর্বজনের এবং স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্যই লিখিত হয়। সেন বংশের রাজত্বকালে কোন কাব্য-সাহিত্যের লিখিত রূপ ছিলো না। সেই রাজত্ব লিখিত রূপ কিংবা চর্চার অনুকূলে ছিলো না। তারপরও তো সৃষ্টি বধির হয়ে যায় নি। কাব্য-স্লোক রচিত হয়েছে। যার প্রচলন ছিলো মুখে মুখে। সেই সব কোষজাত রচনা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরে। শহীদ কাদরীর পাখিজীবনও সেই রকম একটি অঘোষিত অপশাসনের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। এরমধ্যেও কিন্তু তাঁর কাব্যচিন্তা মরে যায় নি। তাঁর সেই কাব্যচিন্তা দেহবিলুপ্তির আগ পর্যন্ত জারী ছিলো। তিনি দেশত্যাগের আগে যে কাব্যসৃষ্টি করেছিলেন, তার বিনির্মাণে কেটেছে বাকি জীবন। তিনি স্বদেশের মাটিতে রচিত কবিতার শরীরে-মেজাজে মুক্তোর মত আলো দিয়েছেন। নিজের সৃষ্টিকে লালন করেছেন। কালজয়ী সাহিত্যের এটাই নিয়ম বলে মানি। ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ১৮৪৩ থেকে ২৩ এপ্রিল ১৮৫০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ব্রিটেনের রাজকবি ছিলেন। দীর্ঘ এই সাত বছরে তিনি একটি লাইনও লিখেন নি। তাই বলে তাঁর কাব্যশক্তি কিংবা পরিচিতির এতটুকু অঙ্গহানি ঘটেনি। বরং সেই সময় নিয়ে ওয়ার্ডসওয়ার্থ তৃপ্ত ছিলেন। একইভাবে শহীদ কাদরীর মধ্যেও নিরেট কোন হতাশা ছিলো বলে মনে করি না। তিনি বিভিন্ন সময় নিজের রচিত কবিতাগুলো উপস্থাপন করেছেন। কবিতা রচনার প্রেক্ষাপট, পরিবেশ-প্রতিবেশের কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজের কবিতায় ধার দিয়েছেন। যে আত্মা কেবল মাতৃভূমির দিকে নিশানা তাক করে রাখে, সে আত্মা কবির। যে আত্মা মগজের কোষে কোষে কাব্যের টংকার তোলে, তিনিইতো কবি। তাই আমি মনে করি শহীদ কাদরী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাব্য রচনা করেছেন। একজন কবি মৃত্যুর পরেও কবিতা রচনা করেন। সব্যসাচি লেখক সৈয়দ শামসুল হকও চলে গেলেন। এই চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্টিশীল মানুষের নতুন করে আগমন ঘটে। কারণ তাদের কাজ বিনির্মিত হবে নতুন কোন কবি‘র হাতে। এভাবে কবির আর মৃত্যু হয় না। শহীদ কাদরী কিংবা সৈয়দ শামসুল হক দেহ ত্যাগ করেছেন, কাব্যভূবন ত্যাগ করেন নি। বাংলা সাহিত্যর সমান বয়েসী হবে তাঁরা। কবিতার শরীরে যথাযথ স্থানে কলকব্জা স্থাপনের কারিগর কবি শহীদ কাদরী। তাঁর কাব্যপাঠোত্তর এই উপলব্ধি অন্য-অনেক পাঠকের মত আমারও হয়েছে। শব্দ প্রক্ষেপন, বাক্য গঠন, প্রাসঙ্গিক বিষয়ের সাথে কাব্য মেজাজের মেলবন্ধন, বিষয়-প্রকরণ-উৎপ্রেক্ষার সঠিক সংস্থাপনসহ বিবিধ রৌপশর্তসমূহ মেনেছেন কবি। তাই কবি মৃত্যুর পর নতুন করে জেগে উঠেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর অনেককে দেখেছি তীর্যক সমালোচনায় বলেছেন, ‘শহীদ কাদরী মৃত্যুর পরেই যেনো কবি হয়েছেন‘। আমার চিন্তাসূত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। মৃত্যুর পরে যে কবি কাব্যসৃষ্টি করে চলে, মৃত্যুর পরে যে কবি পূণর্বার পঠিত হয় তিনিই তো মহাকালের কবি। তিনি প্রস্থান নয় বরং মহাশক্তিরূপে আবারো কাব্যবিশ্বে অভিভুত হলেন। কবি শহীদ কাদরী সেই শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থে। উত্তরাধিকার(১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা(১৯৭৪), স্বদেশ ছেড়ে নির্বাসনে যাওয়ার বছর প্রকাশিত হয় কোথাও কোন ক্রন্দন নেই(১৯৭৮), এবং দীর্ঘ বিরতির পর নির্বাসন থেকে প্রকাশিত, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও(২০০৯)। সব মিলিয়ে কবির রচিত কবিতার সংখ্যা মাত্র ১২৬ টি।
বিবিধ বিশেষন-অভিধা কিংবা প্রভাব-আকর্ষণ-বিকর্ষণে নির্ণয় না করে শহীদ কাদরী-কে মোটাদাগে রোম্যান্টিক বলে চিহ্ন কেটে দিতে চাই আমি। কেবল কাব্যপ্রকাশের মধ্যে নয় ব্যক্তি চরিত্রেও দৃশ্যমান তাঁর রোম্যান্টিক অবয়ব;কারণ সময় নিঙড়ে তিনি যে রস আহরণ এবং পান করেছেন তা মিশ্রস্বাদের। তাতে না পাওয়ার বা ত্যাগের উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছে বারবার। যে কোন প্রাপ্তিকে ত্যাগ কিংবা অস্বিকার করার শক্তি যার প্রবল তাকে রোম্যান্টিক বলতেই হবে। আধুনিক এবং রোম্যান্টিক মানুষের এই যে ব্যক্তিচরিত্র, তা যখন কোন একটি শিল্পকাঠামোয় প্রকাশিত হয় তা কালোত্তীর্ণ হতে বাধ্য। কবি শহীদ কাদরী তাঁর পরিবার থেকেই এর প্রকাশ ঘটিয়েছেন। পিতার অনিচ্ছা সত্বেও বাংলা চর্চা এবং বাংলা ভাষায় কবি হয়ে ওঠা। এভাবে গোড়াতেই আমরা দেখি শহীদ কাদরীর ত্যাগের প্রবল ইচ্ছা। যেখানে পুঁজিবাদী-ভোগবাদী সমাজে মানুষ লোভাতুর সেখানে কবি কাব্যচর্চার প্রাগোক্ত সময় থেকেই নির্মোহ এবং নির্লোভ।
‘সভয়ে দরোজা খুলি- এইভাবে দেখা পাই তার- মাঝরাতে;
জানি না কোথায় যায়, কি করে, কেমন করে দিনরাত কাটে
চাকরিতে মন নেই, সর্বদাই রক্তনেত্র, শোকের পতাকা
মনে হয় ইচ্ছে করে উড়িয়েছে একরাশ চুলের বদলে !
না, না, তার কথা আর নয়, সেই
বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো- শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।’
(অগ্রজের উত্তর, উত্তরাধীকার)
একেবারে পরিষ্কার রোম্যান্টিক উচ্চারণ। রোম্যান্টিকতার মূল অবস্থান হচ্ছে বিশ্বাস। প্রতিটি লাইনে প্রচন্ড উদাসীনতার মাঝে সুপ্ত হয়ে বসে আছে বিশ্বাস, ধ্যান ও মগ্নতার সুর। প্রথম কাব্যগ্রন্থে এভাবেই পাঠক আবিষ্কার করে শহীদ কাদরীকে। একেবারে পূর্ণাঙ্গ কাব্যবিভাময় ঝকঝকে তীক্ষ্ম তরবারী হাতে তিনি জানিয়ে দেন নিজের অবস্থানের কথা।
কবি যখন কৈশোরের স্মৃতিতর্পণ করেন এভাবে-
‘দেয়ালে ছায়ার নাচ
সোনালি মাছের। ফিরে দাঁড়ালাম সেই
গাঢ়, লাল মেঝেয়, ভয়-পাওয়া রাত্রিগুলোয়
যেখানে অসতর্ক স্পর্শে গড়িয়ে পড়লো কাঁচের
সচ্ছল আধার, আর সহোদরার কান্নাকে চিরে
শূন্যে, কয়েকটা বর্ণের ঝলক
নিঃশব্দে ফিকে হল; আমি ফিরে দাঁড়ালাম সেই
মুহূর্তটির ওপর, সেই ঠান্ডা করুণ মরা মেঝেয় (স্মৃতি: কৈশোরকি,উত্তরাধিকার)
এখানে শহীদ কাদরী রোম্যান্টিক এবং প্রতীকি। এই দুই ধারার কবিদের মধ্যে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ থাকলেও দ‘ুটোর সমন্বয় তাঁর প্রকাশের মধ্যে পরিদৃশ্যমান। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই শহীদ কাদরী পোক্ত। কবিতার ডানা থেকে ত্রিশের মেদ ঝেড়ে ফেলার উদ্যোগও দৃশ্যমান। তাঁর হাতে নাগরিক জীবনও পায় নতুন চেহারা।
‘ল্যান্টর্ণের ম্লান রাত্রে সৈনিকের সিগারেট, রুট, উপহার
এবং সঙ্গম-পিষ্ট সপ্তদর্শ অসতর্ক চিৎকার কন্যার।(উত্তরাধিকার, উত্তরাধিকার)
অসুন্দরকে সুন্দর এবং অপ্রয়োজনীয়কে প্রয়োজনীয় করে তোলাই আধুনিক কবিতার শক্তি বলে মানি। ডারউইন নাকি বাঘের চেয়ে কেঁচো বেশি পছন্দ করতেন। কারণ কেঁচোকেই বাঘের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় মনে করতেন তিনি। এই যে ধীমানচিন্তার ক্রমপ্রসারণ তা প্রসারিত হয়েছে শহীদ কাদরীর চিন্তায়ও। ‘সুন্দর‘ প্রাচীন বা মধ্যযুগে যেভাবে উপস্থাপন করা যেতো, তা কিন্তু আধুনিক যুগে এসে অনেকটাই জটিল হয়ে ওঠে। কারণ দর্শন বিচারে সত্য-অসত্য, বাস্তব-অবাস্তব, প্রত্যক্ষ ও কল্পনা এসবের একটি সীমারেখা তৈরি হয়ে যায়। এর কাঠামো নির্মাণে তর্ক-বিতর্কেরও অন্ত নেই। এইসব বিচারের মাপকাঠি উতরেই শহীদ কাদরী পৌঁছেছেন অভিষ্ঠ্য লক্ষ্যে। তাই তিনি ‘আলোকিত গণিকাবৃন্দ‘তে উচ্চারণ করেন-
‘শহরের ভেতরে কোথাও হে রুগ্ন গোলাপদল
শীতল, কালো, ময়লা সৌরভের প্রিয়তমা,
অস্পৃশ্য বাগানের ভাঙাচোরা অনিদ্র চোখের অপ্সরা,
দিকভ্রান্তের ঝলক তোমরা, নিশীথসূর্য আমার!
যখন রুদ্ধ হয় সব রাস্তা, রেস্তোরাঁ, সুহৃদের দ্বার,
দিগন্ত রাঙিয়ে ওড়ে একমাত্র কেতন, তোমাদেরই উন্মুক্ত অন্তর্বাস‘,
প্রথম কাব্যগ্রন্থের পর কবি প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন পালাবদলের। বায়ান্ন থেকে রাজনীতির দেয়ালে প্রতিনিয়ত দৃশ্য বদলের যে চিত্র উদ্ভাসিত হয়, তার সাথে কবি একত্ম হয়ে যান। তাঁর কাব্যের শব্দরা নতুন রূপ ধারণ করে। হয়ে ওঠে অস্ত্রের মত শানিত এবং ক্ষীপ্র। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কবিতাকে করে তোলে প্রতিবাদের হাতিয়ার রূপে। তাই মুক্তিযুদ্ধোত্তর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা‘য় তীব্র আলোকখচিত হয়ে উঠেছে সে সময়ের চিত্র।
‘হে আমার শব্দমালা, তুমি কি এখনও বৃষ্টি-ভেজা
বিব্রত কাকের মতো
আমার ক্ষমতাহীন ডাইরির পাতার ভেতরে বসে নিঃশব্দে ঝিমুবে (কবিতা, অক্ষম অস্ত্র আমার)‘।
এভাবে আমরা দেখি একটি শিল্পমন্ডিত দেশের আশা করেছেন তিনি কাব্যের প্রসারনে। একটি শৈল্পিক রাষ্ট্র কল্পনা করেছেন তিনি। কল্পনাশক্তি কতটুকু প্রখর হলে এবং কাব্যচেতনা বিষয়ে কতটুকু আত্মবিশ্বাস থাকলে তবে এমন উচ্চারণ করা যায়?
‘রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন আমার প্রস্তাবগুলো
পররাষ্ট্রনীতির বদলে প্রেম, মন্ত্রীর বদলে কবি
মাইক্রোফোনের বদলে বিহ্বল বকুলের ঘ্রাণ? (রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন?)‘
এই কবিতা মনে হয় প্রবাস জীবনে শহীদ কাদরির ইন্দ্রিয়ে জাগিয়ে রেখেছে নিজ দেশ, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে। তিনি কেবলই দেশে ফিরে যেতে চাইতেন, কারণ তাঁর আত্মা সব সময় বিরাজিত ছিলো দেশে। কবিতায় কবির ভাবাবেগ আরো নিবিড় এবং আত্মানিসৃত হয়ে একটি রাষ্ট্রের অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা-পরামর্শে উপনীত হয়। সম্ভবত পাকিস্তানের অন্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে যখন টেনে বের করা হলো বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, তখন তাকে এতো আপন মনে হলো কবির, তিনি নিজ হাতেই অলংকৃত করতে চাইলেন নতুন দেশকে। বললেন-
‘ভয় নেই…আমি এমন ব্যবস্থা করবো
একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী
এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক, প্রিয়তমা!
অসম্ভব আধুনিক এবং রোম্যান্টিক একটি রাষ্ট্র কল্পনা পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগায়, কবিরা কি এমন রাষ্ট্র চায়? শুধু প্রেম নয় তাঁর নিজস্ব জগতে যেসব উপকরণ বা মাধ্যম বিরাজিত তা দিয়ে একটি রাষ্ট্রের প্রসাশনিক কাঠামোও তৈরি করতে চা কবি-
সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ হয়ে যাবে-
আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক
অনায়াসে বিরোধীদলের অধিনায়ক হয়ে যাবেন
সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয় পাহারা দেবে সারাটা বৎসর
লাল নীল সোনালি মাছি-
ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা।
নিজের দেশকে এমন দেখতে চেয়েছেন কবি, যেখানে অর্থনৈতিক কোন সংকটও থাকবে না। সাথে অস্ত্র হিসেবে প্রেমকে তিনি মস্ত হাতিয়ার হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে
শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন
আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে
গণচুম্বনের ভয়ে
হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা।(তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা)
প্রিয় স্বদেশকে প্রিয়তমার আসনে বসিয়ে তিনি তার সৌন্দর্য এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবেগ মথিত পরিকল্পনা জারি করলেন কবি। সেই কবি কিভাবে নির্বাসনে থাকেন! আসলেই কি তিনি নির্বাসনে ছিলেন? নির্বাসিত হলেই নির্বাসন বলে? না আমি অন্তত তা মনে করি না। কবি শহীদ কাদরীও তা মনে করতেন না। তাই তো বলেন, স্বদেশ ত্যাগ করলে, লেখক মরে যায়।‘ তাঁর দেহ থাকতো মার্কিন মুলুকে তিনি নন।
তারপরের কাব্যগ্রন্থ ‘কোথাও কোন ক্রন্দন নেই‘ এ ধরা পড়ে ফুল, পাখি আর প্রকৃতিঘেরা ভূমি। এর প্রতিটি কবিতা অনেক বেশি পরিশুদ্ধ এবং নতুন সুরে গাঁথা।
‘বাতাস আমাকে লম্বা হাত বাড়িয়ে
চুলের ঝুঁটি ধরে ঘুরে বেড়িয়েছে আজ সারাদিন
কয়েকটা লতাপাতা নিয়ে
বিদঘুটে বাতাস,
হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছে আমাকে,
লাল পাগড়ি-পরা পুলিশের মত কৃষ্ণচূড়া
হেঁকে বললো :
‘তুমি বন্দী’ !
আজ সকাল থেকে একজোড়া শালিক
গোয়েন্দার মতো ঘুরছে
যেন এভিনিউ পার হ’য়ে নির্জন সড়কে
পা রাখলেই আমাকে গ্রেপ্তার ক’রে নিয়ে যাবে ঠিক !‘(আজ সারাদিনে, কোথাও কোন ক্রন্দন নেই)
দেখুন কবি প্রকৃতির কাছে কতটুকু সমর্পিত। প্রকৃতিকে গায়ে মেখে যেনো নিজেই হয়ে উঠছেন কবিতা কিংবা রাষ্ট্রের নিয়ামক।
শহীদ কাদরীকে বিভিন্নভাবে পাঠের সুযোগ রয়েছে। বহুমাত্রিক বোধ ও চিন্তার মাপকাঠিতে ফেলে পাঠক নিজের মত করে তাঁর কবিতাকে আবিষ্কারের সুযোগ রয়েছে। তাঁর প্রায় সব কবিতার মর্মার্থ বোধগম্য। তারপরও কোথাও অন্তরালে গূঢ় আরো কোন অর্থ যেনো অনাবিষ্কৃত থেকে যায়। আর সেটিই হচ্ছে আধুনিক কবিতার মূল রহস্য। যা দিয়ে কবি শহীদ কাদরী পাঠককে বিমোহিত করে রাখেন। এটি তাঁর কাব্যের উচ্চতর বীজগণিত। শহীদ কাদরীকে নিয়ে শেষ কথা বলার মত ধীশক্তি আমার নেই। শুধু বলতে পারি তিনি প্রবাস জীবনে নিজের রচিত কবিতাগুলোর খোল-নলচে খুলে দেখেছেন। পাঁজর খুলে দেখেছেন, তার ভিতরে কি পরিমাণ অলংকার তিনি চালান করেছিলেন। এই কাজটি করেছিলেন বলেই তিনি দৃশ্যমান কাব্য রচনার না করেও কবি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

x