পাকিস্তানের পাঠ্যবইয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

মাধব দীপ

শনিবার , ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ
15008

একটা বইয়ের কথা প্রায়শই মনে পড়ে। বইটির লেখক আরিফ রহমানের সঙ্গে বারকয়েক কথা হয়েছে নানাসময়ে নানাপ্রসঙ্গে। আমার ফেসবুকের ‘নিউজ ফিডে’ তাঁর কিছু এ্যাকটিভিটিসও আমার চোখে পড়ে। বয়সে সে আমার ছোট হলেও তাঁর কাজকে আমি সম্মান করি। তাঁর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর সম্মান, দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, তারুণ্যের প্রতি তাঁর সাহসী বক্তব্যের নিবেদন আমাকে মুগ্ধ করে। যাই হোক, বলছিলাম তাঁর লেখা ‘ত্রিশ লক্ষ শহীদ : বাহুল্য নাকি বাস্তবতা’ বইটির ব্যাপারে। বইটি নিয়ে আমি বছর কয়েক আগে একটা রিভিউ-ও লিখেছিলাম এই প্রিয় আজাদীতে। এমনকি আমার বিভাগের ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ কোর্সেও বইটির বেশ কয়েকটি অধ্যায়কে আমি ‘টেঙট’ হিসেবে পড়িয়েছি এবং পড়াচ্ছি। আমার বারবার মনে হয়েছে- এই বইটি প্রতিটি বাঙালি তরুণের পড়া উচিত। এই বইটি-ই অনেকদিন পর আবার হাতে নিলাম। নাড়াচাড়া করলাম। বইটিতে একটি অধ্যায় আছে- ‘কেন আজও পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে হয়’ -এই শিরোনামে। এটি গ্রন্থভুক্ত ১২তম অধ্যায়। অধ্যায়টির শেষদিকে দেখানো হয়েছে পাকিস্তানি শিশুরা তাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে পড়ছে, কীভাবে দেখছে। যাই হোক, দেরি না করে বইটি থেকে হুবহু বিষয়গুলো তুলে ধরা যাক।
‘পঞ্চম শ্রেণি:
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর ভারত পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের সহযোগিতায় সেখানকার অধিবাসীদের পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলে। পরে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে। ভারতের ষড়যন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক হয়ে যায়।
নবম-দশম শ্রেণি:
পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহু সংখ্যক হিন্দু শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। হিন্দু শিক্ষকেরা বাঙালিদের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।
পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় এক কোটি হিন্দু বাস করত। ভারত তাদের স্বার্থ বাস্তবায়নে এই হিন্দুদেরকে ব্যবহার করে। ভারত পূর্ব পাকিস্তান পৃথক করতে চেয়েছিল। অনেক হিন্দুই ভারতের চর হিসেবে কাজ করে। পাকিস্তান আমেরিকাকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া রাশিয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল। ফলে রাশিয়া ভারতের সামরিক আগ্রাসনে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে আমেরিকাও পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা চেয়েছিল।
আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তানের পতন হয়।
উচ্চ মাধ্যমিক:
মার্শাল ল কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অভিযানে জামায়াতে ইসলামী সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে অংশগ্রহণ করে। সামরিক অভিযানের মুখে আওয়ামীলীগ অনেক কর্মী ভারতে পালিয়ে যায় এবং শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে। ভারত তাদেরকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পূর্ব পাকিস্তানে প্রেরণ করে। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ডিসেম্বর ৩, ১৯৭১ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। স্থানীয় জনগণের সমর্থনের অভাব, সামরিক বাহিনী ও সরঞ্জামাদি সরবরাহের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে পাকিস্তানের সৈন্যরা ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্নসমর্পণে বাধ্য হয়।
১৯৭১ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সাহসিকতার এক নতুন রেকর্ড স্থাপন করে।
উপরের অল্প কিছু উদাহরণ থেকেই দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানি শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত প্রত্যেক মানুষ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভুল তথ্য জেনে আসছে। কোনো কিছু ভুল জেনে একটা দেশ সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ফলে দিনের শেষে তারা তাদের পূর্বপুরুষের হাতে এই মাটিতে সংঘটিত এত বড় একটা গণহত্যা অস্বীকার করছে; কিছু হাস্যকর খোঁড়া যুক্তি দিয়ে নিজেদের জাতির বর্বরতার ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। এহেন প্রতিহিংসামূলক ইতিহাস জেনে পাকিস্তানে বছরের পর বছর আত্মাভিমানী, নির্বোধ, অথর্ব প্রজন্ম জন্ম নিচ্ছে যারা প্রতিনিয়ত আমাদের দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যার অপমান করছে।
তবু পাকিস্তানকে ঘৃণা করা বলতে পাকিস্তানের সদ্য জন্ম নেওয়া কোনো নিস্পাপ শিশুকে বোঝানো হয় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা তরুণ দলকে বোঝানো হয় না। ‘বাংলাদেশ’ নামের উর্দু কবিতা লেখা কবি কাইফি আজমীকে বোঝানো হয় না।…’
মোটা দাগে, এই হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানিদের পাঠ্যবইয়ের সারমর্ম যেখানে তারা- গবেষক আরিফ রহমানের ভাষায় ‘…নিয়মিত মিথ্যাচারিতা, বাংলাদেশি সাধারণ নাগরিকদের প্রতি বিনা কারণে বিদ্বেষে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। অথচ বাংলাদেশের সমস্ত পাঠ্যবইতে নিয়মমাফিক পাকবাহিনীর নির্মমতার কথাই বলা আছে। কখনও কোনো পুস্তকে পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকদের প্রতি কোনো হিংসার বাণী ছড়ানো হয়নি, পাকিস্তানিদের হেয় প্রতিপন্ন করা হয়নি। কেউ দেখাতে পারবেন না আমাদের কোনো শ্রেণির কোনো পাঠ্যপুস্তকে পাকিস্তানের সাধারণ জনগণদের প্রতি ঘৃৃণা ছড়িয়ে কোনো কথা বলা হয়েছে।…’
আমরা এমনই। বাঙালি এমনই। চরম বীরের জাতি। পরম ক্ষমার জাতি। আমরা জানি, কীভাবে ক্ষমা করতে হয়। আমি মনে করি, পৃথিবীতে এমন কোনো শব্দ নেই যে শব্দ দিয়ে আমাদের সেই দিনগুলোর আত্মত্যাগকে ধারণ করা যায়! এমন কোনো অভিব্যক্তি নেই যা দিয়ে আমরা আমাদের একাত্তরের দুঃসহ যন্ত্রণাকে তুলে ধরতে পারি! এমনকী এমন কোনো বিনিময়ও নেই, যার দ্বারা আমাদের ক্ষতি পোষানো যেতে পারে!
আমাদের বীরত্বের ইতিহাস আর নাম না জানা লক্ষ-লক্ষ নারী-পুরুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস হয়তো একদিন পাকিস্তানি শিশুরা ঠিকই জানবে। জেনে হয়তো একদিন রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা ক্ষমাও চাইবে। এখনই পাকিস্তানের কেউ-কেউ, কোনো-কোনো মানবিক মানুষ-মানাবাধিকার নেতা এ-ব্যাপারে আওয়াজ তুলছেন। কারণ, ইতিহাস এমনই। ইতিহাস কখনো কাউকে ছাড় দেয় না।
সেই অপেক্ষায় রইলাম।

x