পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর এক তৃতীয়াংশ খর্বকায়, দারিদ্র্য কমলেও পুষ্টিহীনতা কমেনি

সোমবার , ১ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
43

বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি খর্বকায়। আর গ্রামাঞ্চলের প্রায় অর্ধেক শিশুই খর্বকায়। এজন্যই শিশু ও প্রজনন সক্ষম নারীদের দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি বাংলাদেশের পুষ্টিনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া দরকার। নতুন এক গবেষণার বরাতে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই) গত ২৬ জুলাই ’১৮ একথা বলেছে। ‘হাউজহোল্ড ডেইরি প্রডাকশন অ্যান্ড চাইল্ড গ্রোথ: এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশ’ শিরোনামের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুর উচ্চতা ও দৈহিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব রাখে দুধ খাওয়ার অভ্যাস। জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে নবজাতককে নিয়মিত দুধ খাওয়াতে পারলে তার খাটো ও খর্বকায় হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। আইএফপিআরআইয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও প্রতিবেদনের মুখ্য লেখক ভেরেক হিডি বলেন, যথাযথভাবে বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সি শিশুদের খাবারে যথেষ্ট দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য থাকলে তাদের পুষ্টি ও দীর্ঘকালীন স্বাস্থ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে শিশুদের খর্বকায় হওয়ার ঝুঁকি কমপক্ষে ১০ শতাংশ হ্রাস পায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলে প্রায় অর্ধেক শিশু খর্বকায় হওয়ায় দেশের পুষ্টি নীতিতে শিশু ও প্রজনন সক্ষম নারীদের জন্য দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া জরুরি।
দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য আজ সারা বিশ্বে প্রশংসিত। গত ১০ বছরে দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমে অর্ধেকে নেমেছে। বাংলাদেশকে এখন দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল বলছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো বড় আন্তর্জাতিক সংস্থা। সে বিবেচনায় সাফল্য আসেনি মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে ইতিবাচক অর্জন সত্ত্বেও দেশে অপুষ্টিজনিত খর্বকায় শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। আইএফপিআরআইয়ের গবেষণা থেকে এটা পাওয়া যাচ্ছে। গত বছরও সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ খর্বকায় হয়ে বেড়ে উঠেছে বলে জানানো হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এ পরিসংখ্যান আমাদের উন্নয়ন চিন্তার দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। অনেকেই এখনো অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝাতে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে বা কমেছে কিনা তা নিয়ে মাথা ঘামান। অর্থনীতিবিদরা নানা তত্ত্ব দেন। কিন্তু সে আলোচনায় মানসম্পন্ন মানবসম্পদ উন্নয়নে অপুষ্টির বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে না।
শিশু খর্বকায় হয়ে বেড়ে উঠলে একদিকে যেমন তারা কর্মঠ ও মেধাবী মানবসম্পদ হয়ে ওঠে না তেমনি এতে জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত না করায় দেশে প্রতিবছর এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। অপুষ্টিতে ভোগা বিশাল এ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও শামিল হতে পারছে না। এটি মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিকে প্রভাবিত করছে। জীবনের শুরুতে পুষ্টির অভাবে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয় বলে এটি পরবর্তীতে শিক্ষা ও উপার্জনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শৈশবে অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি স্বাভাবিক ব্যক্তির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম মজুরি পেয়ে থাকে। অপুষ্টির কারণে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যও সৃষ্টি হয়।
আমাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আলোচনায় পুষ্টি বিষয়টি তেমন অগ্রাধিকার পায় নি এতদিন। মা, নবজাতক, শিশু ও শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পুষ্টি সমস্যা গুরুত্ব পায়নি মোটেও। এই অবহেলার বিষয়টি বোধগম্য হলেও যুক্তিযুক্ত নয়। কেবল পুষ্টি কৌশলই সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট নয়, মা ও শিশুর অপুষ্টি মোকাবেলা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা বড় প্রয়োজন। বিশ্বের অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর ৮০ শতাংশ রয়েছে মাত্র ২০টি দেশে, জোরালো পুষ্টি প্রকল্প গ্রহণ করলে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো সম্ভব। লাতিন আমেরিকান দেশগুলোয় এসব কার্যক্রম গ্রহণ করে খর্বতা, কম ওজন, শীর্ণতা অনেক কমানো গেছে। আমাদেরও স্থানীয় উপযোগী করে একই পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আন্তর্জাতিক পুষ্টি কার্যক্রমে চার ধরনের সুযোগ মানুষের জন্য সৃষ্টি করা উচিত। এগুলো হলো- তত্ত্বাবধান, অর্থনৈতিক সম্পদ আহরণ ও সংগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ে সরাসরি পুষ্টির যোগান দেয়ার ব্যবস্থা, মানব ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদকে শক্তিশালী করে তোলা। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পুষ্টি উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের নীতি নির্ধারকদের নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে এবং একই সঙ্গে তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য মাঠ পর্যায়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ করা প্রয়োজন। এছাড়া অপুষ্টি প্রবণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। সরকারের পক্ষে তদারকি ব্যবস্থাও জোরদার করা দরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও অপুষ্টি সমস্যা সমাধানে শামিল হতে হবে। দেশে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের উন্নয়নে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকার কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন। পুষ্টি খাতের উন্নয়নে গঠিত হয়েছে পুষ্টি কাউন্সিল। অথচ পুষ্টি সমস্যার উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। মাঠ পর্যায়ে পুষ্টি নিয়ে কাজ করার জন্য পৃথক স্বাস্থ্যকর্মী না থাকায় কর্মসূচি থাকলেও বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য ও পুষ্টিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সাথে সাথে নীতি সহায়তা ও পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। পাশা

x