পলিথিনের উৎপাদনসহ যাবতীয় ব্যবহার বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে

মঙ্গলবার , ১৮ জুন, ২০১৯ at ৪:২৭ পূর্বাহ্ণ
39

ব্যাপক হারে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় সম্পর্কে এখন আর নতুন করে কিছু বলার নেই। দেশের পরিবেশ বিজ্ঞানী ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং শহরের চারপাশের নদ-নদী দূষণ, সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার মত বাস্তব সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার আইন করে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও আইনের বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতার কারণে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। গত ১১ জুন দৈনিক আজাদীর প্রধান শিরোনাম হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘পলিথিনেই যত সমস্যা,
মাঝে মাঝে জব্দ হয়, কিন্তু বন্ধ হয় না কারখানা, বাড়ছে ব্যবহার, নগরের খাল নালায় জমছে স্তূপ, কর্ণফুলীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে বিরূপ প্রভাব’ শীর্ষক সংবাদ।
সাম্প্রতিক গবেষণা রিপোর্টের আলোকে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ৭৯ শতাংশ পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য পানিতে মিশে জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পলিথিন থেকে সৃষ্ট নাগরিক বিড়ম্বনা এবং পরিবেশগত সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। এ বিড়ম্বনা এড়াতে সরকারি উদ্যোগও কম দেখা যায়নি। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি। পলিথিন ব্যাগ সারাবিশ্বেই ব্যবহৃত হয়। উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের কারণে উন্নত দেশগুলোতে পলিথিন এমন ভয়ঙ্করী হয়ে উঠতে পারেনি। আইনগত নিষেধাজ্ঞা এবং লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করে পলিথিনের উৎপাদন ও বিপণন সহনীয় মাত্রায় আনয়ন করা যায়নি। পলিথিনের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বাড়তি শর্ত ও শুল্ক আরোপের পাশাপাশি অবৈধ পলিথিন কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়েও পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। নাগরিক জীবনে পলিথিন ব্যাগের বহুমুখী ব্যবহার উপযোগিতা ও সহজলভ্যতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সহজলভ্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া শুধুমাত্র আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগগুলো তেমন কাজ করেনি।
আজাদীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পলিথিন কারখানার মালিকদের শক্ত একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই নেটওয়ার্কই দেশব্যাপী পলিথিন সরবরাহ করে। চাক্তাই খাতুনগঞ্জ ও রেয়াজউদ্দীন বাজারে গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ একটি চক্র পলিথিন সংরক্ষণ এবং বাজারজাত করে। চক্রটি নমুনা হিসেবে একটি বা দুইটি পলিথিন গোপনে দোকানে রাখে। ক্রেতাদের নমুনা দেখিয়ে গোডাউন থেকে পলিথিন বিক্রি করে। পরে রাতের আঁধারে ট্রাকযোগে এসব পলিথিন সরবরাহ হয় চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে। এক্ষেত্রে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজনকে ম্যানেজ করে এসব বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আসলে পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানান ক্ষতিকর দিক থাকলেও বিকল্প অন্য কিছু সহজলভ্য না হওয়ায় আটকানো যাচ্ছে না পলিব্যাগের ব্যবহার। পণ্য বহন, রক্ষা করা ও দাম কম হওয়ায় পাট কিংবা কাগজের ব্যাগের ওপর আস্থা নেই ক্রেতাদের। আবার যেহেতু বহনের ব্যাগ ফ্রি দিতে হয়, তাই ব্যবসায়ীরাও খোঁজেন সস্তা কিছু- যার অভাব পূরণ করে পলিব্যাগ। নিষিদ্ধ এই পলিথিন সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় এর বিকল্প পাওয়া দুরূহ বলে দাবি করছেন ক্রেতারা। বর্তমানে বাজারে বিকল্প হিসেবে যেসব টিস্যুব্যাগ প্রচলিত রয়েছে সেটাও ছদ্মবেশী পলিথিন বলেও দাবি করছেন তাঁরা।
অত্যন্ত দুঃখজনক যে কয়েক বছর আগে যে পলিথিন বন্ধ করা হয়েছিল সেটি এখন সর্বত্র অবাধে চলছে। অল্পদিন আগেও পলিথিন এতো বেশি দেখা যেতো না, এখন দোকানদার থেকে শুরু করে ফেরিওয়ালা সবাই পলিথিন ব্যবহার করছে। নিষিদ্ধ হওয়ার আগে যে অবস্থায় ছিলো অনেকটা সেই পর্যায়ে চলে গেছে।
অভিযোগ আছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতার কারণেই বাজারে আবার পলিথিনের ব্যবহার বেড়ে গেছে। আগে যেভাবে অভিযান দেখা যেতো, এখন সেটা দেখা যায় না। তাছাড়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা পলিথিনের দোকান ও গুদাম থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করেন। মাঝে মধ্যে দুয়েকটি অভিযান চললেও বেশির ভাগ পলিথিনই অধরা রয়ে যায়। তাই পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিনের বাজারজাত কমানো, উৎপাদন বন্ধসহ যাবতীয় ব্যবহার বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে।

x