পরীক্ষা পাস বনাম জ্ঞান চর্চা

ডা. মোহাম্মদ নিজাম মোর্শেদ চৌধুরী

শনিবার , ১০ আগস্ট, ২০১৯ at ৯:০২ পূর্বাহ্ণ
99

The foundation of every state is the education of the youth: Diogenes
অনেকেই মনে করেন পরীক্ষা পাস ও জ্ঞান অর্জন সমার্থক। আসলে তা নয়। বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা জাতির জন্য জরুরি। কিন্তু শিক্ষার লক্ষ্য শুধু উপযোগবাদ নয়। এটার লক্ষ্য ব্যাপক। আত্মউপলব্ধির মাধ্যমে আত্মদর্শন বিশ্ব উপলব্ধি, স্রষ্টা ও তাঁর অসীমতা, জগৎ ও জীবন, আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা, পরিবার, সমাজ উপলব্ধি শিক্ষার লক্ষ্য। তাই শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য সচেষ্ট হলে জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করা সহজসাধ্য হবে না। আমাদের দেশে শিক্ষা কাঠামো এরূপ যে, বিশেষ বিশেষ কয়েকটা প্রশ্ন পূর্ববর্তী বছরের থেকে যাচাই বাছাই করে পড়লেই পরীক্ষায় মোটামুটি সাফল্য লাভ করা যায়। এজন্য বাজারে সাহায্যকারী অনেক বই সহজলভ্য। এমনকি দেখা যায়, ফটোকপির দোকানেও সাজেশন ও উত্তরপত্র পাওয়া যায়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য যে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয় সেগুলোর রেডিমেড ব্যবস্থা আছে। তাই পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তু ন্যূনতম জেনেই সাফল্য অর্জন কঠিন নয়।
কিন্তু এই পরিস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত। এ ধরনের সনদ সংগ্রহ আত্মবঞ্চনার নামান্তর। তখনকার একজন এন্ট্রান্স বা ম্যাট্রিকুলেশন পাসের সঙ্গে এখন এখনকার এসএসসি পাস শিক্ষার্থীর পার্থক্য অনেক। তখনকার শিক্ষার মান ছিল উন্নত, কিন্তু পাসের হার এত উঁচু ছিল না। তখন ছিল কোয়ালিটেটিভ শিক্ষা। আর এখন হচ্ছে কোয়ানটেটিভ শিক্ষা। তখনকার ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত খ্যাতনামা কবি, দার্শনিক, প্রবন্ধকার, উপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোটগল্পকারদের লেখা শ্রেণী অনুসারে সংযোজন করা হতো। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা আদর্শ হৃদয়বৃত্তি, চিত্তবৃত্তি, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, সহমর্মিতা, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা, পরিবার, সমাজ, স্বদেশ ও বিশ্বের প্রতি দায়িত্ববোধ শিক্ষা লাভ করত। বর্তমানের শিক্ষাবোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরূপ সমৃদ্ধ লেখকের লেখা পাঠ্যক্রমে অনেকটাই অনুপস্থিত। মূল্যবোধের অবক্ষয়, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, নৈতিকতার দেউলিয়াপনা ইত্যাদি এর অন্যতম ফলশ্রুতি হতে পারে।
তখনকার দিনে গ্রামে-গঞ্জে সংস্কৃতিচর্চা, নাট্য সঞ্চালন, মহাপুরুষদের জন্মবার্ষিকী উদযাপন, আবৃত্তি ইত্যাদি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ছিল। দূরদর্শন ও তথ্যপ্রযুক্তি-বিদ্যার দৌরাত্ম্যে এখন পাড়া-মহল্লায় সেগুলো বিলুপ্ত প্রায়। আগের দিনে গ্রামের মধ্যে পাঠাগারকে কেন্দ্র করে সাহিত্যচর্চা, গ্রাম্য খেলাধূলা ইত্যাদির মধ্যে ছিল প্রচণ্ড জৌলুস। যাত্রাপালা, কবিগান, জারিগান, সারিগান, পালাগান ইত্যাদি বহুল প্রচলিত ও আনন্দঘন ছিল। এ ধরনের শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চা হচ্ছে মাদকাসক্তি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদির জঘন্য অনৈতিকতার মহৌষধ।
পক্ষান্তরে, ভবিষ্যতের আশা-ভরসা শিক্ষার্থীরা যদি জ্ঞানার্জনের জন্য পড়াশুনা করে তাহলে পরীক্ষায় পাসও হবে, জ্ঞানার্জনও হবে। নিজের, সমাজের ও দেশের কল্যাণ হবে। ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ, সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি, সংস্কার, কুসংস্কার, ধর্ম-অধর্ম, পাশবিকতা-মানবিকতা, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদির পার্থক্য সম্যক উপলব্ধি করতে পারবে।
প্রবাদ আছে ‘Education is to tame the beast in ourselves.’ অর্থাৎ শিক্ষার অর্থ হচ্ছে আমাদের ভেতরের পশুপ্রবৃত্তিকে নিবৃত করা। অজ্ঞতাই সকল অপকর্মের মূল। আরো প্রবাদ আছে, ‘Knowledge is light, Ignorance is darkness.’ তাই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন বিদ্যার্থীদের সর্ব প্রধান দায়িত্ব এবং মূল লক্ষ্য। আরো অনেক দায়িত্ব তাদের সম্পাদন করতে হয়। কিন্তু স্মরণে রাখতে হবে, নিজেকে সুনাগরিক করতে হলে যুগোপযোগী আন্তর্জাতিক মানের সুশিক্ষার বিকল্প নেয়। বর্তমান প্রগতিশীল বিশ্ব ‘সফিস্টিকেটেড’। এখানে টিকে থাকা নিতান্তই প্রাণান্তকর ব্যাপার।
এ প্রসঙ্গে এ এন হোয়াইটহেডের একটি বাণী স্মরণীয়। তিনি বলেছেন, ‘ঊফঁপধঃরড়হ রং ধ ফরংপরঢ়ষরহব ভড়ৎ ঃযব ধফাবহঃঁৎব ড়ভ ষরভব.’ আসলেই জীবনটা হচ্ছে একটি দুঃসাহসিক অভিযান। আর বিদ্যা শিক্ষাটা হচ্ছে তার একটি বিধিমালা। তাই আশা করব, এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য পড়বে না; জ্ঞানার্জনের জন্যও পড়বে। পড়বে বিরাট বিশ্বকে দরদ দিয়ে জানতে। তাতে করে তারা পরীক্ষায় ভালো ফল পাবে, সাথে সাথে জ্ঞানার্জন ও করতে পারবে। কারণ প্রকৃত শিক্ষাটা হচ্ছে সমাজের আত্মা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পরিক্রমণ করবে।
এ প্রসঙ্গে জগৎ বিখ্যাত মনিষী জি এম চেস্টারটন বলেছেন, ‘ঊফঁপধঃরড়হ রং ঃযব ংড়ঁষ ড়ভ ঃযব ংড়পরবঃু ধং রঃ ঢ়ধংংবং ভৎড়স মবহবৎধঃরড়হ ঃড় ধহড়ঃযবৎ.’ মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানান্বেষণ কর।’ বিশ্ববিখ্যাত রাশিয়ান লেখক আন্তন চেখভ লিখেছেন, ‘ও বীঢ়বপঃ ও ংযধষষ নব ধ ংঃঁফবহঃ ঃড় ঃযব বহফ সু ফধুং.’
সুতরাং প্রকৃত শিক্ষাই আমাদের জরুরি। এখানে প্রয়োগিক দিকও থাকবে, উচ্চতম চেতনার বিকাশও থাকবে; যা একটি প্রগতিশীল জাতির জন্য অপরিহার্য্য। এ ধরনের শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার মানস কাঠামোর পরিবর্তন দরকার। শিক্ষা কাঠামো ও পরীক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বুদ্ধিজীবীদের চেতনার উৎকর্ষকে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষাখাতে বাজেটের ব্যয় বরাদ্দ আনুপাতিক হতে হবে।

লেখক : অধ্যক্ষ, কন্টিনেন্টাল ইনস্টিটিউট
অব মেডিকেল টেকনোলোজি

x