পরীক্ষার উত্তরপত্র নিরীক্ষণে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে

শনিবার , ৮ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
59

গত ২ জুন দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় ‘ফেল থেকে পাস ৮০ শিক্ষার্থী, জিপিএ-৫ পেল ৪২ জন’ শীর্ষক প্রকাশিত সংবাদে এসএসসির ফল পুনঃনিরীক্ষণ বিষয়ে আমরা নতুন তথ্য পেলাম। প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়- চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ২০১৯ সালের এসএসসির উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফলে ফল পরিবর্তন হয়েছে মোট ৪৯২ শিক্ষার্থীর। এর মধ্যে গ্রেড পয়েন্ট পরিবর্তন হয়েছে ৩৯৮ জনের। ফেল থেকে পাশ করেছে ৮০ জন। আর নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে আরো ৪২ পরীক্ষার্থী। গত ৬ মে প্রকাশিত ফলাফলে এসব শিক্ষার্থীর ফল ভুল আসে। পুনঃনিরীক্ষণের পর এদের সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করা হলো।
কোনো পরীক্ষা সঠিক ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-পরবর্তী উত্তরপত্র মূল্যায়নকাল। কিন্তু দেখা যায়, শিক্ষকদের খেয়ালখুশিতে নম্বর দেওয়ার কারণে উত্তরপত্রের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। মাঝেমধ্যে নানা অবহেলায় ঘটে অমূল্যায়ন, যা সত্যি দুঃখজনক। শুধু অবমূল্যায়ন নয়, এর ফল আরো খারাপ হতে পারে। যে কেউ এই ফলাফলে অসন্তুষ্ট হয়ে অপমানিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি আমরা কী করে এড়ায়? ভুল করে নম্বর বেশি দিলে তার প্রভাব এক রকম, আর নম্বর কম দিলে তার প্রভাব অন্য রকম।
সঞ্জয় কুমার ভৌমিক এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, সমাপনী পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর চলবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজ। কিন্তু দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় তিন-চার দিন একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে সব শিক্ষক একত্রে বসে উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজ করেন। এই দ্রুততার ফলে পর্যাপ্ত সময় যেমন পাওয়া যায় না, তেমনি উত্তরপত্রগুলো ১০০ ভাগ নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন সম্ভব হয় বলে মনে হয় না। প্রয়োজন উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় বেঁধে দেওয়া এবং সেই সঙ্গে জেএসসি কিংবা এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের মতো কাজটি প্রত্যেক শিক্ষক বাড়িতে বসে করলে উত্তর হবে সঠিক। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও কিছু করণীয় আছে। যেমন প্রথমত, এক বসায় নয়-দশটির বেশি খাতা মূল্যায়ন না করা। দ্বিতীয়ত, উত্তরপত্র দেখাকালে অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ না দেওয়া। তৃতীয়ত, সরবরাহকৃত বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন নিদের্শিকায় প্রতিটি অভীক্ষার জন্য যে নির্দেশনা দেওয়া থাকে, তা অনুসরণ করা। চতুর্থত, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করার সময় ধৈর্য্যের পরিচয় দেওয়া। পঞ্চমত, যেখানে-সেখানে না রেখে উত্তরপত্রগুলো সযত্নে রাখা।
সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক মাছুম বিল্লাহ তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, একজন পরীক্ষক যিনি জীবনে প্রথমবার পরীক্ষক হয়েছেন কিংবা তিনি তত সিনসিয়ার নন কিংবা নম্বর দিতে উদারতা প্রকাশ করেন কিংবা নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কৃপণ ইত্যাদি বিষয়ের যে কোনো একটিও যদি মূল্যায়নের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন কখনো সঠিক হয় না। অথচ এই নম্বর প্রদানের ওপর নির্ভর করছে একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা, চাকরি, বিদেশে যাওয়া, তার সারা জীবনের একটি প্রাপ্তি। সেটি কোনক্রমেই একজন শিক্ষকের মতামতের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। মূল্যায়ন হতে হবে সঠিক আর তা করার জন্য কমপক্ষে দুজন পরীক্ষক থাকতে হবে। প্রথম পরীক্ষক লাল কালি দিয়ে ভুলত্রুটি শনাক্ত করবেন এবং খাতায় নম্বর না দিয়ে আলাদা একটি শিটে গোপনে নম্বর প্রদান করবেন। দ্বিতীয় আরেকজন পরীক্ষক নীল কিংবা সবুজ কালি দিয়ে ভুলত্রুটি নির্ণয় করে নম্বর প্রদান করবেন। দু্‌ই পরীক্ষকের নম্বর প্রদানে যদি বেশি পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তখন তৃতীয় একজন পরীক্ষক ওই খাতা মূল্যায়ন করবেন। পরিশেষে ট্যাবুলেশনের মাধ্যমে সব নম্বরের গড় করতে হবে। প্রথম পরীক্ষক যখন জানবেন যে তাঁর দেখা খাতা অন্য আরেকজন পরীক্ষক মূল্যায়ন করবেন, তিনি তখন সতর্কতার সঙ্গে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন। এতে সময় একটু বেশি লাগবে কিন্তু মূল্যায়ন হবে অনেকটাই সঠিক। কেউ আর মূল্যায়ন নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবেন না। তাই পরীক্ষকদের কমসংখ্যক খাতা দিতে হবে, সম্মানী বেশি দিতে হবে। এখন যে দ্রুততার সঙ্গে খাতা দেখা হয় ও একজন অনভিজ্ঞ পরীক্ষকও যেনতেন প্রকারে নম্বর প্রদান করেন। কারণ তিনি জানেন তাঁর এই খাতা আর কেউ দেখবেন না।
আমরা পরীক্ষাকে যেমন গুরুত্ব দিয়ে থাকি, তেমনি গুরুত্ব দিতে হবে উত্তরপত্র নিরীক্ষণেও। কোনো ভুল নিরীক্ষণের দায়ভার কোনো শিক্ষার্থী নিক, সেটা কারো কাম্য হতে পারে না। শিক্ষা বোর্ডকে এজন্য আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।

x