পরিবেশ দূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে

শনিবার , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
33

দেশে পরিবেশ দূষণ রোধ না করেই শিল্পায়ন হচ্ছে দ্রুত। নিয়ন্ত্রণহীন এই দূষণ ক্ষতি বাড়াচ্ছে অর্থনীতির বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে দেশে মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশের জন্য দায়ী পরিবেশ দূষণ। এ হার বৈশ্বিক গড় এমনকি, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ। পরিবেশ দূষণে মৃত্যুজনিত শ্রমের ক্ষতি বিবেচনায় নিলে এর আর্থিকমূল্য বছরে ৬৫২ কোটি ডলার বা প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। দেশের তিনটি জেলা ঢাকা, কক্সবাজার ও পাবনার ওপর ২০১৫ সালে একটি জরিপ চালায় বিশ্বব্যাংক। জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি ‘এনহ্যান্সিং অপরচুনিটিজ ফর ক্লিন অ্যান্ড রেসিলিয়েন্ট ইন আরবান বাংলাদেশ ঃ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্ট অ্যানালাইসিস-২০১৮’ শীর্ষ প্রতিবেদনটি গত ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করে সংস্থাটি। ওই প্রতিবেদনেই এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে দেশের কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশ দূষণে ২০১৫ সালে শুধু শহরাঞ্চলেই মারা গেছে ৮০ হাজার ২৯৪ জন। বায়ু দূষণ, আর্সেনিকযুক্ত পানি, কর্মক্ষেত্রে দূষণজনিত কারণে মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে ২৬ লাখ ২৭ হাজার ৯২৬ ঘন্টা। দূষণের কারণে মৃত্যু ও কর্মঘন্টা হারিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি ৬৫২ কোটি ডলার বা ৫১ হাজার কোটি টাকা। (২০১৫ সালে প্রতি ডলার ৭৮ টাকা ধরে), এই ক্ষতি ওই সময় জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশে দ্রুত বাড়ছে শহুরে মানুষের সংখ্যা। বর্তমানে এ বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ বলছে, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ হবে শহুরে। আর্থিক ক্ষতি পরিমাপে পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি বায়ু দূষণের কারণে পোশাক শিল্পে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, শিল্প কারখানার সিসা দূষণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়া এবং বায়ু দূষণে মৃত্যুকে হিসাবে নেয়া হয়েছে। দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের মতে বিশ্বের দূষণপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই পরিস্থিতির উন্নয়নে সুনজর নেই। এদেশেই সবচেয়ে কম তদারকি ও আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। শিল্প-কারখানার বর্জ্য নদী-খালে গিয়ে পড়ছে, যা আশে পাশের এলাকার দরিদ্র মানুষের মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করছে।
বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার সার্বিক জীবনমান উন্নয়ন ও নিম্নমধ্যম আয় থেকে উচ্চ মাধ্যম আয়ে উত্তরণে অর্থনৈতিক গতিশীলতা অব্যাহত রাখতে দেশে নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত প্রসার ঘটছে শিল্পায়নের। কিন্তু এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে। ফলে এর প্রভাবে পরিবেশ দূষণের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে চলেছে। নিয়ন্ত্রণহীন এ দূষণ ক্রমাগত ক্ষতি বাড়াচ্ছে অর্থনীতির। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনই তার প্রমাণ। এ অবস্থা যদি দীর্ঘতর হয় তবে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আরো চড়া মূল্য দিতে হবে। কাজেই পরিবেশ দূষণ বন্ধে ন্যূনতম শৈথিল্য প্রদর্শন হবে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর। সরকারের উচিত এ বিষয়টি আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এটা ঠিক যে বিশ্বজুড়েই পরিবেশ দূষণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের অবস্থান বিশ্বের ১১৩টি দেশের মধ্যে নিচের দিক থেকে ৯৭তম। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে আমাদের দেশে দূষণ রোধ ও পরিবেশ উন্নয়নের প্রয়াস চলছে না চলারই মতো। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এ নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। আজকাল সারা বিশ্বে ‘সবুজ-প্রবৃদ্ধির’ উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। সবুজ-প্রবৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ অধিকার থাকে পরিবেশ সংরক্ষণ। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও সনাতনী উন্নয়ন ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। উন্নয়নশীল কিছু দেশও আলোচ্য ধারণার ভিত্তিতে নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা বিন্যাস করেছে। যেমন পাশের দেশ ভুটান। বাংলাদেশের চেয়ে ভুটানের সম্পদ কম। তার ওপর ভূমি বেষ্টিত। অর্থনৈতিক সুযোগ সেই অর্থে নেই বললেই চলে। তবুও দেশটি পরিবেশের ক্ষতি করে নিজেদের উন্‌য়ন অব্যাহত রাখার নীতি গ্রহণ করেনি। ভুটান আমাদের দৃষ্টান্ত হতে পারে। পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
দেশের পরিবেশগত দিক লক্ষ্য করলে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের আন্তরিকতা কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন করা চলে। সরকারের যেসব সংস্থার দূষণ নিয়ন্ত্রণ করবার কথা সেসব সংস্থার সামর্থ্য ও দক্ষতার ঘাটতি আছ্ল্লে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারের তেমন কোন তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। পরিবেশ দূষণ রোধে সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করা দরকার। পরিবেশ রক্ষায় যেসব আইন আছে তা অনেক দুর্বল। কিন্তু দুর্বল আইনও বাস্তবায়ন করা হয় না। ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরের চারদিকে অসংখ্য ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরী এবং দেশের অন্য শহরগুলোর চারপাশের নদনদীগুলো দখল-দূষণের শিকার হয়েই যাচ্ছে। এর জলাশয়গুলো দখল হচ্ছে। এসব দখল-দূষণের বিরুদ্ধে সরকার তেমন কোন ব্যবস্থা নেয় না।
পরিবেশ দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী ও শিশু। দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের মানুষ দূষণজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। তাদের স্বাস্থ্যগত ও আর্থিক ক্ষতিটা বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার চেষ্টা করছে। সরকার বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো অসুস্থ জাতিকে নিয়ে সেই লক্ষ্য পূরণ কি সম্ভব হবে? স্বভাবতই পরিবেশ দূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া বিকল্প নেই। দূষণ বন্ধে যুগোপযোগী নীতি ও আইন প্রণয়ন করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোও অপরিহার্য।

x