পরিবেশ দূষণ রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি

শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

শুক্রবার , ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ
37

দেশের ব্যবসায়ীদের নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহবান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গত ১ সেপ্টেম্বর রফতানি ট্রফি ২০১৬-১৭ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার ব্যবসাবান্ধব সরকার। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে, তাদের কাজে আমরা সহযোগিতা করব। তাঁর সরকার এ ব্যাপারে সম্ভব সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাটা শুরু থেকেই করতে হবে, যেমন খুব হার্ড কেমিক্যাল ওয়েস্ট অথবা সলিড ওয়েস্ট বা অন্যান্য লিকুইড ওয়েস্টের ব্যবস্থাপনা যদি শুরু থেকেই করেন, তাহলে আমাদের পরিবেশ রক্ষায় সহযোগিতা হবে। দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে। প্রতিটি শিল্প এলাকায় একটি করে জলাধার রাখার জন্যও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও পরিবেশের প্রতি মনোযোগী হবার যে আহ্বান ব্যবসায়ীদের প্রতি জানিয়েছেন তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী।শিল্পবিপ্লব পরবর্তী যুগে প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং জীবনযাপন আরো সহজ, ভোগ্য ও আধুনিক করার জন্য প্রকৃতিতে বেড়েছে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অভঙ্গুর (নন-বায়োডিগ্রেডেবল) বর্জ্য। প্রতিদিন বেড়ে চলেছে এ বর্জ্য। এটা মোকাবেলা করাই এখন পরিবেশ রক্ষার অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কারখানার বর্জ্য বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকলাপ বিপন্ন করে চলেছে। জীবমণ্ডলের স্থিতাবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একথা খুবই প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে আমাদের পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এতোটাই অপেশাদারি কায়দায় চলছে যে তার প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। ডায়িং কারখানাগুলোর রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত পানি হামেশাই নদী বা খালে ফেলা হচ্ছে। পানির তীব্র দূষণে সেখানে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণির বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অভিযোগ পাওয়া যায় ইটিপি থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান তা যথাযথভাবে চালু করে না। অনেক প্রতিষ্ঠানের ইটিপি জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। এ ধরনের প্রবণতা রোধ করা দরকার আর এজন্য প্রয়োজন পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ানো। একই সাথে নিয়মিত বিরতিতে কারখানাগুলো পরিদর্শনও প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে শিল্পবর্জ্য নির্গমন ১০৯ শতাংশ বাড়বে। নানা ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য একদিকে যেমন জলাশয় বিষাক্ত করবে, তেমনি অন্যদিকে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলকে বিনষ্ট করবে। তাই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই বাংলাদেশকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য এখন থেকেই উন্নত দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতেই হবে। শিল্পখাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর পানীয় বর্জ্য, বিশেষ করে পোশাক খাতের বর্জ্য নির্গমন ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। দেশে পরিবেশ দূষণ রোধ না করেই শিল্পায়ন হচ্ছে দ্রুত। নিয়ন্ত্রণহীন এ দূষণ ক্ষতি বাড়াচ্ছে অর্থনীতির। সরকার দূষণ রোধে যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছে। তবে শুধু আহ্বান জানানোর মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিল্প মালিকদের পরিবেশ দূষণরোধে বাধ্য করতে হবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দূষণ করার জন্য। একই সঙ্গে তাদের উদ্বুদ্ধ করারও প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া এক্ষেত্রে প্রণোদনা ও তিরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। উচ্চ দূষণ করারোপ এক্ষেত্রে একটি সমাধান হতে পারে। সরকারি নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। ইদানীং সমগ্র বিশ্বে ‘সবুজ প্রবৃদ্ধির’ উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, সবুজ প্রবৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ অধিকার থাকে পরিবেশ সংরক্ষণ। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সার্বিক উন্নয়ন ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। উন্নয়নশীল কিছু দেশও আলোচ্য ধারণার ভিত্তিতে নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা বিন্যাস করেছে। তার একটি দৃষ্টান্ত পাশের দেশ ভুটান। দেশটির সম্পদ বাংলাদেশ থেকে কম। তার ওপর দেশটি ভূমিবেষ্টিত। সেই অর্থে অর্থনৈতিক সম্পদ নেই বললেই চলে। তার পরও দেশটি পরিবেশের ক্ষতি করে নিজেদের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার নীতি গ্রহণ করেনি। ভুটান আমাদের দৃষ্টান্ত হতে পারে। পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে বা দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। পরিবেশ দূষণ রোধে সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। পরিবেশ রক্ষায় বর্তমানে যে সব আইন রয়েছে সেগুলো অনেক দুর্বল। সেই দুর্বল আইনও প্রয়োগ করা হয় না।
দেশে কল-কারখানার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই শিল্পবর্জ্যের পরিমাণও বেড়ে চলেছে। অথচ সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারো কোন মাথাব্যথা নেই বিশেষ করে শিল্পমালিকদের। একাজ করার দায়িত্ব যাদের তারা নির্বিকার। কিন্তু এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। তাই শিল্প কারখানা স্থাপনের বা এখন শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর হতে হবে। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে কোন শিল্প স্থাপন করার অনুমোদন না দেয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি কঠোর হতে হবে কর্তৃপক্ষকে। প্লাস্টিকের জিনিসপত্র পলিব্যাগ, চিপস সামগ্রীর মোড়কের ব্যাপারেও চিন্তা ভাবনা করে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেননা এগুলো নদীদূষণের অন্যতম কারণ। কেবল আইন করে আইন প্রয়োগ করলেই এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে না। সরকার, শিল্পপতি ও জনগণ সবাইকে সচেতন হতে হবে। যার যার ক্ষেত্রে আন্তরিক হলে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে। তবে পাশাপাশি আরো দু-একটি কাজ করতে হবে। যেমন, সরকারকে তদারকি জোরদার করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করাটা জরুরি। আলোচ্য ক্ষেত্রে জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ দূষণ রোধের ব্যয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হতে হবে। প্রকৃত পক্ষে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী, শিল্প মালিক ও উদ্যোক্তাদের বাধ্য করার বিকল্প নেই।

x