পরিবেশ দিবসের অঙ্গীকার

মঙ্গলবার , ৫ জুন, ২০১৮ at ৪:১৯ পূর্বাহ্ণ
55

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে প্রতিবছর সারা বিশ্বের শতাধিক দেশে এই দিন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

পরিবেশ দিবসের প্রধান লক্ষ্য হলো পরিবেশ রক্ষা ও পরিবেশ দূষণ রোধ। পরিবেশ দূষণ বিষয়টি বর্তমান বিশ্বে আলোচিত একটি বিষয়। আমাদের দেশে পরিবেশ দূষণ বিষয়টি প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। এ বিশ্ব পল্লী নামক গ্রহটিতে যত উদ্বেগউৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সুদূর প্রসারি। যা এখন দেশ, মহাদেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত। পৃথিবীর সর্বত্রই পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন চলছে। নানা রকম পরিবেশ দূষণে আক্রান্ত আমরা। পরিবেশবিদদের মতে, মানুষের অপরিণামদর্শী ক্রিয়াকলাপের ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, বদলাচ্ছে জলবায়ুর গতিপ্রকৃতি। গ্রিন হাউস প্রভাব, ওজোন স্তরের ক্ষয়, বরফগলন, মরকরণ, খরা ও বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাসসহ বিভিন্ন কারণে আজ আমরা ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সাম্প্রতিককালে মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সিডর ও আইলার মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যার প্রকোপ, মরকরণ এসব আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিণামের কথা। এজন্য এসব বিষয় নিয়ে ভাবার সময় এখনই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাই সম্মিলিত প্রয়াস অত্যাবশ্যক।

পরিবেশ বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ এবং পরিবেশ দূষণের শিকার সচেতন জনগণের মতে বৃক্ষ নিধন ছাড়া ও প্রাণি বৈচিত্র্য রক্ষা না করা, রাসায়নিক সার ব্যবহার করা, কলকারখানার বর্জ্য, পলিথিন ও পোড়া জ্বালানি, কালো ধোয়া, কীটপতঙ্গ ধ্বংস করা, বস্তির উদ্ভব, ঘনবসতি, ধূমপান, পানিতে মলমূত্র ও মৃত প্রাণিদেহ ফেলা, আর্সেনিক ও অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন, গাড়ির হর্ণ ও মিল কারখানার শব্দ এবং অসচেতনতা ও শিক্ষার অভাব সর্বোপরি আইন অমান্য করা ও দেশপ্রেমের অভাবই পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে কাজ করছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, নগরায়ন এবং শহরায়নের নামে আমরা বনাঞ্চল কেটে ঘরবাড়ি বানাচ্ছি। এতে বিচিত্র ধরনের পশুপাখির অভয়ারণ্য ছোট হয়ে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন। আমরা নিজেরাই নিজেদের কি পরিমাণ ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছি তা অনুভব করছি না। আগে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর গাছ, ঝোপজঙ্গল ও ছোট ছোট বন ছিল। এখন ঘরবাড়ি ও ব্যবসার নামে চলছে বনসম্পদ বিনষ্টের অশুভ প্রতিযোগিতা। কিন্তু ১টি গাছের পরিবর্তে আর ১টি নতুন গাছ আমরা লাগাই না। এ অনীহার কারণে আমরা প্রকৃতির সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ উপাদান ধ্বংস করছি। গাছই আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং প্রকৃতির কার্বনডাই অক্সাইডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এখন আমরা কার্বনডাইঅক্সাইড উৎপাদন করছি, কিন্তু অক্সিজেন উৎপাদনের ক্ষেত্র ধ্বংস করছি।

বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলো আজ নিরপায় হয়ে শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ আমাদের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করতে হবে। ছোট একটি দেশ আমাদের, তার জনসংখ্যা অনেক বেশি। তাদের খাদ্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও উপার্জনের কথা চিন্তা করে আজ শিল্পায়ন ঘটছে। এতে হয়তো আমাদের সাময়িক সমস্যার সমাধান হচ্ছে, তবে পরিবেশ দূষণ কিন্তু বাড়ছেই। শিল্পায়নের কারণে আজ কৃষি জমির পাশাপাশি বনের ওপরও বেশ চাপ পড়েছে। আমাদের ২৫ ভাগ বন থাকার কথা থাকলেও তা নেই। হয়তো মাত্র ৭ ভাগ বন আছে। যদিও সরকারিভাবে বন পর্যাপ্ত আছে বলে বিভিন্ন সময় দাবি করা হয়েছে ও হচ্ছে। আবার এ কথাও সত্য যে, দেশের উন্নয়নে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। তবে তার জন্য প্রকৃতিকে কম শোষণ বা কম ক্ষতি করে কি করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের শক্তি। তার ব্যবহার আমরা করব। এতে বাধা দেয়া যাবে না। তবে তার ব্যবহার, মেয়াদ ও পরিমাণ নির্ধারণ এবং পরিবেশের ওপর তার প্রভাব কমানোর বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

আমরা যদি সমাজের প্রতিটি মানুষকে সম্পৃক্ত করে, বিশেষ করে তরুণ ও যুব সমাজকে সাথে নিয়ে পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বাড়াতে পারি এবং সবাইকে সচেতন করে তুলতে পারি, তাহলে একটা সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় দেশ উপহার দিতে সক্ষম হবো। তাই পরিবেশ রক্ষাই হোক এবারের পরিবেশ দিবসের অঙ্গীকার।

x