পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে

মঙ্গলবার , ২৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
19

পাট আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। এই পাটকে একসময় বলা হত সোনালি আঁশ। বাংলাদেশ পাট উৎপাদনে ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ। এমনকি পাট সম্পদকে কেন্দ্র করে আমরা একটি স্বনির্ভর ও স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করি পাকিস্তান আমলে। বাংলাদেশকে সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দিয়েছে পাট। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে পাট ছিল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম খাত। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব তন্তু হিসেবে আবার পাটের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পাট ও পাটজাত পণ্য শুধু পরিবেশবান্ধব এবং সহজে পচনশীলই নয় এটা পরিবেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়কারী কৃত্রিম তন্তুর জনপ্রিয়তা বা ব্যবহার ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে জানা যায়, আবার সুদিন ফিরে আসছে সোনালি আঁশের। বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়াসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ খাতে ৪১ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হলেও গত অর্থবছরে তা ১১৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে প্রায় ১৭৫ শতাংশ। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে । বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাটের পাশাপাশি জুট ইয়ার্ন, টুওয়াইন, চট ও বস্তা রফতানি করা হয়। এর পাশাপাশি রফতানি হয় হাতে তৈরি বিভিন্ন পাটজাত পণ্য ও কার্পেট। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে ৪১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। পরের দুই বছরে তা যথাক্রমে ৮৭ কোটি ৩২ লাখ এবং ১২১ কোটি ৮২ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। এরপর ২০১১-১২ অর্থবছরে ১০৫ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১১৪ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি হয়। পরের দুই অর্থবছরে রফতানি ১০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে আসে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৯৩ কোটি ৮০ লাখ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়। তবে পরের অর্থবছরগুলোয় ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১০৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১০৭ কোটি ৯০ লাখ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১১৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলারে উন্নীত হয় রফতানি আয়।
জানা গেছে, বিশ্বে উৎপাদিত কাঁচা পাটের ৫৫ শতাংশ উৎপাদন করছে ভারত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবদান ৪০ শতাংশ। তবে পাট খাতের বৈশ্বিক রফতানি আয়ের ৭২ শতাংশই এখন বাংলাদেশের দখলে। রফতানি আয়ে ভারতের অংশীদারিত্ব হলো ১৯ শতাংশ। এছাড়া চীন, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রত্যেকের প্রায় ১ শতাংশ করে অবদান রয়েছে। জেনে আনন্দিত হই যে, বিশ্ববাজারে শুধু পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে ৫০০ বিলিয়ন পিস। এর ১০ শতাংশও দখল করতে পারলে শুধু এই একটি পণ্য থেকে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য বিশেষ করে ব্যাগের ব্যবহার নিশ্চিত করাও যে বর্তমান সময়ে কতটা জরুরি তা নতুন করে বলার কিছু নেই। পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে নদ-নদী, ড্রেন-নর্দমা সবকিছুতেই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের প্রায় সব ক’টি নদ-নদী-খালের অবস্থা খুবই শোচনীয়। চট্টগ্রাম নগরী এমনকি রাজধানী ঢাকা যে একটু বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় তারও প্রধান কারণ পলিথিন। পলিথিন যেহেতু মাটিতে মেশে না সে কারণে সূর্যালোক, পানি ও অন্যান্য উপাদান প্রবেশ করতে না পারায় মাটির উর্বরতা শক্তি কমে যায়। এর বিষাক্ততা কৃষি এবং পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকারক। বিশ্বের অনেক দেশে পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও প্রদর্শনী ইতোমধ্যেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও দোর্দণ্ডপ্রতাপে তার দৌড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষিপণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগের ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা সত্যিই দুঃখজনক।

x