পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য

কাজী মুহাম্মদ আমিন উল্লাহ

মঙ্গলবার , ৯ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:১১ পূর্বাহ্ণ
28

বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রসমূহে নাগরিকদের কাছে সেবা পৌঁছানোর জন্য যেখানে সরকারি বেসরকারিভাবে প্রাণান্তকর চেষ্টা সেখানে আমাদের দেশের সেবাখাতগুলো অমানবিক নৈরাজ্যে ভরপুর। আমাদের দেশে সেবাখাত মানে যাচ্ছেতাই ভাবে নাগরিকদের জিম্মি করে অর্থোপার্জন করার একটা মোক্ষম হাতিয়ার। উন্নত বিশ্বে সেবা কেন্দ্রে সিটিজেন চার্টার ঝুলন্ত থাকলেও আমাদের দেশে তা নেই। মাঝখানে তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফখরুদ্দিন সরকারের আমলে সিটিজেন চার্টার বাধ্যতামূলক করা হলেও পরবর্তীতে পুনরায় আবার বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের কোন সেবাকেন্দ্রে কি সেবা পাওয়া যায় তার কোন পরিচয় নেই। বাংলাদেশের সেবাখাত সমূহের একটি হল পরিবহন সেক্টর। এ পরিবহন সেক্টর এখন জনগণের কাছে একটি আতংক, নৈরাজ্যকর, বিশৃংখল পরিস্থিতির নাম। পরিবহন, চালক, প্রশাসন, আইন সবই আছে নাই শুধু আইনের প্রয়োগ। পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য দেখে মনে হয় এদেশের জনগণকে শান্তি ও নিরাপত্তা দেওয়ার কোন কর্তৃপক্ষ নেই। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ পরিবহন মালিক শ্রমিক কর্তৃপক্ষের খেয়ালীপনার শিকার হয়ে নির্যাতিত হচ্ছে। কত সুশীল সমাজ তাদের ইজ্জত হারাচ্ছে পরিবহন শ্রমিকদের হাতে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাবতে অবাক লাগে পুরো পরিবহন সেক্টরের কাছে দেশের ষোল কোটি মানুষ জিম্মি। মানবের প্রাণ হন্তারক জীবন্ত দৈত্য ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে অনায়াসে বের হয়ে যাচ্ছে। অদক্ষ, স্বল্প প্রশিক্ষিত, অপরিপক্ক চালকের হাতে গাড়ির মালিক টাকার লোভে তুলে দিচ্ছে বড় বড় গাড়ি। ঐ চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। রাজপথে গতি পর্যবেক্ষণে কোন ব্যবস্থা না থাকায় ইচ্ছেমতো গাড়ি চালায়। অপরিপক্ক, তরুণ, ড্রাইভাররা গাড়ি নিয়ে ক্রেজি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। যাত্রী উঠানামা করতে গিয়ে প্রতিযোগিতা, অনর্থক ওভারটেকিং এর প্রতিযোগিতা, চালকের ইচ্ছাতে গতির মাত্রা বৃদ্ধি, যাত্রীর জন্য অযথা রাস্তায় যত্রতত্র দাঁড়িয়ে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট করা, সবমিলিয়ে চালকের কাছে যাত্রী ও সাধারণ জনগণ জিম্মি। আমাদের দেশে সংঘটিত সিংহভাগ দুর্ঘটনার জন্য চালকদের বেপরোয়াগতিতে ওভারটেকিং মানসিকতাই দায়ী। একদিকে চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর মানসিকতা অন্যদিকে রাস্তার বেহালদশা, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মেরামতকৃত রাস্তার খনন, বর্ষাকালে রাস্তা খনন করে রাস্তার সৌন্দর্য নষ্ট করা, খনন জণিত কারণে খানা খন্দক তৈরি, নষ্ট হওয়া রাস্তা দ্রুত মেরামত না করা ইত্যাদি কারণের ফলে রাস্তাগুলোতে যেকোন সময় বাস উল্টে, বা চাকা নষ্ট হয়ে ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আমাদের দেশের রাস্তার পাশের ফুটপাতগুলো পুলিশ এবং সরকারি দলের নেতাকর্মীরা কিংবা এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রভাব খাটিয়ে দৈনিক ভাড়ার ভিত্তিতে দোকানপাট বসিয়ে দেওয়া হয়। যে ফুটপাত মানুষ চলাচলের জন্য তৈরি সে ফুটপাত নিয়ে ব্যবসা, রাস্তাকে টার্মিনাল বানিয়ে রাখা সবমিলিয়ে মানুষকে বিপজ্জনক ভাবে রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য করা হয়। এ অবস্থায় রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে বিপত্তি। যে কোন সময় ওভার টেকিং করে আসা গাড়ি যে কোন মুহূর্তে জীবন্ত তরতাজা প্রাণ হরণ করতে পারে। এ রকম একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে রাস্তা পারাপার হতে হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। মহাসড়কের এমন অনেক স্থান রয়েছে যেখানে রাস্তা পারাপারের কোন ফুট ওভার ব্রিজ, জেব্রা ক্রসিং, সিগনাল লাইট, কিংবা স্পিড ব্রেকার নেই। তথাপি স্কুল কলেজগামী ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হয়। এহেন মুহূর্তে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু ঘটে বহুলাংশে। নগরীর ব্যস্ত ভিআইপি সড়কগুলোতে কোন গাড়ি চলতে পারবে কোন গাড়ি চলতে পারবে না তার কোন বিধি-নিষেধ নেই। নগরীতে জনদুর্ভোগের অপর নাম রিকশা। রিকশা চলাচলের সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম নেই। একসাথে তিন চার লাইন হয়ে যায় দেখার কেউ নেই। অপরদিকে রিকশা নির্ভরতা কমাতে যে সিএনজির উপর ভরসা করার কথা সে সিএনজি সরকারের আইন মানে না। একটি স্বাধীন দেশে মনে হয় সিএনজি চালকরা ছায়া সরকার। তাদের ক্ষমতার কাছে দেশের সরকার অসহায়। একদিকে মনগড়া ভাড়া গ্রহণ অন্যদিকে সেবার মানসিকতার বিপরীতে গলাকাটা ভাড়া আদায় করে। সবকিছু করতে রাজি কিন্তু মিটারে যেতে নারাজ। উৎসব পার্বণে তাদের সাথে কথা বলা দায়। বিভিন্ন বাস স্টেশনগুলোতে উৎসব পার্বণে চালক শ্রমিক অস্থায়ী বাদশা বনে যায়। স্বাধীন দেশে মানুষকে প্রকাশ্যে জিম্মি করলেও সরকারের কর্তৃপক্ষের দেখার কেউ নেই। একদিকে অশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত চালক কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার অন্যদিকে ইচ্ছেমত ভাড়া আদায় সাধারণ মানুষকে হতাশ ও ভগ্ন হৃদয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই। এমনটি করতে সুযোগ পাওয়ার পিছনে চালক শ্রমিকের সাথে প্রশাসনের লেনদেনের বিষয়টি এক প্রকার প্রকাশ্য। পুলিশের টোকেন মিললে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তায় নামতে পারে। লাইসেন্স বিহীন গাড়ি রাস্তায় নামতে পারে। একটি পুলিশি টোকেন সব রোগের মহৌষধ। একদিকে টোকেনে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামে অন্যদিকে দীর্ঘদিন লাইসেন্স না করানোর ফলে রাষ্ট্র যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে গাড়ি চুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার লাইসেন্স করতে গেলে বিটিআরসির দুর্নীতির কারণে স্বল্প মূল্য দিয়ে লাইসেন্স করতে পারে না। মোটা অংকের টাকা পরিশোধের ভয়ে অনেকে লাইসেন্স করাতে চান না। অথচ এ খাতে গতি আনতে লাইসেন্স কার্যক্রম সহজীকরণ করা দরকার। টাকার বিনিময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করে খুব সহজে মানব হত্যার লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হয়। এ কাজটি চালক শ্রমিক খুব সহজে সংঘটিত করতে দ্বিধাবোধ করেন না। কারণ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির মূল্য মাত্র বিশ হাজার টাকা। তাও আবার মৃত্যু পরবর্তী পোস্টমর্টেম নামক মরার উপর খাড়ার ঘা এর পরে মামলা দিলেই। ভিকটিম মামলা না করলে জরিমানাও পাওয়া যায় না। অন্যদিকে অপরাধী চালক শ্রমিকের শাস্তির পরিমাণ হালকা। তবে আশার বাণী হল সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ মন্ত্রীসভার বৈঠকে পাস হয়েছে। তবে পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘট ডাকায় সাধারণ জনগণের মনে শংকা দেখা দিয়েছে আদৌ আইনটি সংসদে পাশ হবে কিনা তা দেখার অপেক্ষায় আছে পুরো জাতি। কারণ এখানে জনগণের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ বেশি দেখা হয়। এভাবে সমগ্র বাংলাদেশের জনগণ পরিবহন শ্রমিক কর্মচারীদের নিকট জিম্মি। পরিবহন সেক্টরের সাথে জড়িত সকল সেবা কেন্দ্রগুলো দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ দেখেও জনগণের সেবায়, সহায়তায় এগিয়ে আসে না। হতাশ জাতি কার কাছে এর সুরাহা চাইবে। সে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। যা সমগ্র জাতির ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তারা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে পরিবহন সেক্টরে কি পরিমাণ অনিয়ম বিদ্যমান। আরও দেখিয়ে দিয়েছে এর জন্য কারা দায়ী। স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৭ বছর অতিবাহিত হলেও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। আর দেরি করার সুযোগ নেই। বাংলার স্বাধীন জাতি দুর্নীতি, অন্যায়, বিশৃংখল হতাশাব্যঞ্জক পরিবেশ থেকে বাঁচতে চায়। শান্তি, নিরাপত্তা ও সেবায় বাঁচতে চায়।
লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, কামালে ইশকে মুস্তফা (দ.) ফাজিল মাদরাসা,
পূর্ব বাকলিয়া, চট্টগ্রাম।

x