পরিচিতির পরিচর্যা

জেসমিন ইসলাম 

শনিবার , ৯ জুন, ২০১৮ at ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ
28

পার্শ্ববর্তী দেশসহ দীর্ঘদিন আমাদের পোশাকে ভিন্নদেশের পোশাকের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। নিজ দেশের পোশাকের প্রতি হীনমন্যতা আমাদের এক অদ্ভূত মনস্তত্ত্ব। তবে বর্তমানে আশার কথা, আমাদের স্বল্প সংখ্যক তরুণ প্রজন্ম দেশীয় উপকরণে তৈরি পোশাক দিয়ে বৈরি পরিবেশকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনের ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় উৎসবে আমরা আমাদের তৈরি পোশাক পরিধানের প্রতি মনোযোগী হয়েছি।

সদ্যপ্রয়াত আমাদের সকলের শ্রদ্ধাভাজন জাতীয় অধ্যাপক মোস্তাফা নুরুল ইসলাম জীবিতকালে ‘বাঙালির বাংলা’ নামে নিরীক্ষাধর্মী, বক্তব্য নির্ভর একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। সেই অনুষ্ঠানটিতে শোনার সুযোগ হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের পরিবেশনা। তিনি বলেছিলেন আধুনিক কালের বিষয় ‘বিশ্বায়ন’ যেটি আমরা এখন শুনছি, মূলত এই বিশ্বায়নের কার্যক্রম এই বাংলায় দীর্ঘকাল আগেই শুরু হয়েছিলো। যেমন আমাদের এই বাংলায় ইংরেজ, আরব, পর্তুগীজ, ডাচ অনেকে এসে বাণিজ্য করেছে, এখানে দীর্ঘকাল অবস্থানও করেছে। যার ফলে বাংলা অনেকভাবে এই ভিন্নদেশীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, যাপিত জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র তাদের সাথে আদানপ্রদান হয়ে শংকরায়ন হয়েছে। এতদ্‌সত্ত্বেও আমাদের দেশে যেহেতু ভিন্ন দেশ থেকে বহিরাগতরা এসেছে, আমাদের আমিত্ব নিজস্বতা সংহত রাখতে হয়েছে স্থায়ীত্বের দাবিতে। সেটিই বাঙালির বাংলা। আমাদের গ্রামগুলো, আমাদের অসংখ্য নদনদী, আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতির প্রেরণা। যখন আমরা একক রাষ্ট্রের পরিচয়ে পরিচিত ছিলাম না তখনও বাঙালিরা হৃদয়ে বাংলাকেই ধারণ করেছে। তারপর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নন্দিত ফসল স্বাধীন ভূখণ্ড বিশ্বের কাছে দৃশ্যমান হলো। যুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে অবকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণহীনতা দেখা দেয়, আমাদেরও ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্রের মধ্যকার বিভাজন দীর্ঘায়িত হলো। নিজস্ব ভূখণ্ডের এতবড় অর্জন। বাঙালির পরিচয় ধোঁয়াশে হয়ে যেতে লাগলো পরিচর্যার অভাবে। জাতিসত্তার পরিচর্যাহীনতা আমাদের ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতিতে আক্রান্ত হলো। দ্বিধা বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন হলো, সেই ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতি চর্চায় সমন্বয় রাখা সম্ভব হলো না। রাষ্ট্রীয় মূল স্রোতের বিভাজনের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরো উপেক্ষিত হলো, আমাদের বাংলার শিকড় যেখানে গাঁথা। সেই ক্রান্তিকাল থেকে উত্তরণ হওয়ার চেষ্টা আমাদের চলমান রয়েছে। আমাদের বাংলার তরুণ প্রজন্ম এখন কান্ডারি। আমাদের নকশীকাঁথা, শীতল পাটি, বাউলিয়ানা, জামদানি, পাট, তাঁতি, পহেলা বৈশাখ, বাহারি সুতি শাড়ি, নন্দিত মসলিন বিস্মৃত প্রায় হচ্ছিল, আবার তারুণ্যের সোনালী ছোঁয়ায় ফিরে এসেছে। কিন্তু একই সাথে বিশ্বায়নের ফসল শংকরায়ন ছন্দপতন ঘটায়। বিচলিত বিক্ষিপ্ত করে তুলছে। সমাজ তথা তরুণ সমাজকে। আমাদের সমৃদ্ধ সঙ্গীত, সংস্কৃতিকে তরুণ সমাজ উপেক্ষা করছে না। কিন্তু ধারণ করে রাখতে দ্বিধান্বিত হচ্ছে। আমাদের মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক রাষ্ট্রীয় বন্ধ্যা সময়ের ভ্রুুকুটিকে উহ্য করে মুক্তবুদ্ধির চর্চার মাধ্যমে বাঙালির স্বকীয়তার নাটক করেছে, এখন মুনাফালোভী কর্পোরেট পৃথিবীর ধ্বজা বহন করে আমাদের নাটক। সেদিন অষ্টাদশী একজন তরুণীর কালো চুলের অপূর্ব সুন্দর দুই বেনী দেখে ভাবছিলাম, কেনো কতিপয় বাঙালি নারীর কালো চুল বিচিত্র রং করার অনভিপ্রেত অভিপ্রায় হয়। এমন আরো অনুকরণ রয়েছে বাঙালি বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। আমাদের আলোর দিশারী সুফিয়া কামাল একবার ঈদে বহুমূল্যের ভিনদেশি পোশাকের উচ্চ মূল্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। সুনীল গন্দোপাধ্যায় তাঁর ‘পূর্ব পশ্চিম’ উপন্যাসটিতে উল্লেখ করেছিলেন ‘পশ্চিম জয় করেছে সর্বত্র’। কিন্তু বাজার অর্থনীতিতে অর্থনীতিই যখন মুখ্য বিষয়, সেই দিক বিবেচনায় এখন মধ্য প্রাচ্যও জয় করেছে সর্বত্র। বর্তমান ফ্যাশন সেটি প্রমাণ করছে। পার্শ্ববর্তী দেশসহ দীর্ঘদিন আমাদের পোশাকে ভিন্নদেশের পোশাকের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। নিজ দেশের পোশাকের প্রতি হীম্মন্যতা আমাদের এক অদ্ভূত মনস্তত্ত্ব। তবে বর্তমানে আশার কথা, আমাদের স্বল্প সংখ্যক তরুণ প্রজন্ম দেশীয় উপকরণে তৈরি পোশাক দিয়ে বৈরি পরিবেশকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের জাতীয় জীবনের ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় উৎসবে আমরা আমাদের তৈরি পোশাক পরিধানের প্রতি মনোযোগী হয়েছি।

বাংলার ঐতিহ্যের ঐশ্বর্য হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা যেখানে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পরস্পরের ধর্মীয় উৎসবে অভিনন্দন জানায়, আতিথ্য বরণ করে। স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা এই পরিশীলিত চর্চা বাংলায় বহমান থাকুক।

x