পরামর্শক নিয়োগ চূড়ান্ত চলতি সপ্তাহে

চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প ।। ব্যয় হবে তিন হাজার ৮০৮ কোটি টাকা

হাসান আকবর

বুধবার , ১৭ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ
468

প্রায় চার হাজার কোটি টাকার চট্টগ্রামের প্রথম স্যুয়ারেজ প্রকল্প। এ প্রকল্পের জন্য বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ চলতি সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত করা হচ্ছে। মলসহ সব ধরনের তরল বর্জ্য ঘর থেকে সরাসরি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে নিয়ে যাওয়ার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ওয়াসার প্রধান কাজ পানীয় জলের সংস্থানের পাশাপাশি স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনাও। কিন্তু চট্টগ্রাম ওয়াসা গত ৫৭ বছরে স্যুয়ারেজের কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অবশেষে স্যুয়ারেজের একটি প্রকল্প তৈরি করেছে। নগরীর ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম নিয়ে দুই বছর ধরে পরিচালিত মাস্টার প্ল্যানের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি তৈরি করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় পুরো নগরীকে ছয়টি ব্লকে বিভক্ত করে বিশ লাখ মানুষকে স্যুয়ারেজের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ নামের এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৮০৮ কোটি ৫৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর বিস্তৃত এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।
ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে জানান, নগরীর বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করে। দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি লিটার তরল বর্জ্য তৈরি হয় মানুষের ব্যবহার থেকে। রান্নাঘর এবং বাথরুমের পানি সরাসরি যেমন নালায় গিয়ে পড়ছে, তেমনি সেপটিক ট্যাংক থেকেও তরল বর্জ্যের একটি অংশ সরাসরি নালায় গিয়ে পড়ে। স্যুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় এই বর্জ্য নানা পথ ঘুরে গিয়ে পড়ছে হালদা, কর্ণফুলী নদী এবং কিছু অংশ বঙ্গোপসাগরে। হালদা ও কর্ণফুলী হচ্ছে ওয়াসার সুপেয় পানির একমাত্র উৎস। কোটি কোটি টন তরল বর্জ্যে কর্ণফুলী এবং হালদা প্রতিনিয়ত মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। জোয়ার-ভাটা আছে বলে এই দুই নদী এখনো মরে যায়নি। না হয় বিপুল বর্জ্যের কারণে নদী দুটি বহু আগেই বুড়িগঙ্গার মতো মরে যেত।
তিনি বলেন, নগরীতে কোথাও উন্মুক্ত স্থানে মল ত্যাগ করা হয় না। তবে সেপটিক ট্যাংকগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মল জমছে। নগরীতে কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতিদিনই সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কারের ঘটনা ঘটছে। সেই বর্জ্য ফেলা হয় নিকটস্থ নালায়। নালা থেকে খাল হয়ে তা হালদা কিংবা কর্ণফুলীতে পড়ছে। এতে করে ক্ষতির পরিমাণ উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে।
তিনি জানান, নগরীতে প্রতিদিন যে পরিমাণ মল জমা হয়, তা পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন খুব সামান্য পরিমাণে পরিশোধন করতে পারে। এনজিও সংস্থা জিএসকেও সামান্য পরিমাণ পরিশোধন করে।
পরিবেশের এই দূষণের মাঝে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প আশার সঞ্চার করেছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রতিদিন প্রায় বিশ লাখ মানুষের বাড়ির মল ও তরল বর্জ্য পাইপের সাহায্যে সংগ্রহ করা হবে। বিল্ডিংগুলোতে কোনো সেপটিক ট্যাংক থাকবে না। স্যুয়ারেজের পাইপের সাহায্যে মল থেকে শুরু করে ব্যবহার্য সব পানি ওয়াসার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে চলে যাবে। ওখানে পরিশোধন করে তা বঙ্গোপসাগরে ফেলা হবে।
স্যুয়ারেজ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, নগরীর হালিশহরে ওয়াসার ১৬৩ একর জায়গা রয়েছে। ওই জায়গায় পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্প স্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পের অধীনে মোট ২০০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন, ১৫টি পাম্প স্টেশন, ১৪৪ কিলোমিটার সার্ভিস লাইন করা হবে। এর মাধ্যমে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহ করে পরিশোধন করা হবে। অবশিষ্ট কঠিন বর্জ্য দিয়ে কম্পোস্ট সার তৈরি হবে। এর জন্য তৈরি হবে দিনে ৮০ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার একটি পয়ঃশোধনাগার এবং দিনে ৪৫০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার একটি ফিকেল স্ল্যাজ শোধনাগার।
তিনি বলেন, নগরীকে ছয়টি জোনে বিভক্ত করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে শুরুতে আমরা একটি জোনে এই কার্যক্রম চালু করার প্রক্রিয়া চালাব। স্ল্যাজ সংগ্রহে যেখানে পাইপ লাইন স্থাপন করা যাবে না, সেখানকার জন্য গাড়ি সংগ্রহ করা হবে। গাড়িতে করে বর্জ্য হালিশহরের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে নেওয়া হবে।
আরিফুল ইসলাম বলেন, এই প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শক নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্রে ২১টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। যাছাই বাছাই শেষে ৭টি প্রতিষ্ঠানের শর্টলিস্ট করেছি। এখান থেকে আরো যাছাই বাছাই শেষে একটি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে এই পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। একটি প্রতিষ্ঠানের নাম আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। মন্ত্রণালয় থেকে পরামর্শক নিয়োগের বাকি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানান তিনি।

x