পবিত্র হজ্ব পালনে নারীদের করণীয়

জিনাত আজম

শনিবার , ২৭ জুলাই, ২০১৯ at ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ
65

সমস্ত প্রশংসা ঐ মহান সত্তার, যিনি এই দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক তথা প্রভু। জিলক্বদ মাস প্রায় শেষ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে এই বছর যাঁরা হজ্বব্রত পালন করার নিয়ত করেছেন তাঁদের অনেকেই পৌঁছে গেছেন সেই মহা পুণ্যধামে। আল্লাহপাক সকলকে সঠিকভাবে পবিত্র হজ্বের সকল আহকাম ও আরকানসমূহ পালন করার তৌফিক দিন। আমিন।
আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিনের অশেষ কৃপা, তিনি আমাকে তাঁর পবিত্র ঘরে একাধিকবার নিয়ে গেছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই পবিত্র মক্কা ও মদিনায় গিয়ে মহিলারা যে সমস্ত অসুবিধার সম্মুখীন হন এবং অজ্ঞতাহেতু অহেতুক বিষয়ে সম্পৃক্ত হয়ে গুনাহের ভাগী হন সেই বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করার জন্য আমার এই লেখা।
প্রথমত হজ্বের আরকানসমূহ ও বিভিন্ন কর্মসূচি নারী ও পুরুষের জন্য প্রায় একই। কেবল সাফা-মারওয়াতে সায়ী করতে গিয়ে সবুজ বাতির এলাকায় এবং পবিত্র বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করতে গিয়ে কিছুটা এলাকা পুরুষরা দ্রুত হেঁটে বা দৌড়ে সম্পন্ন করবেন। হজ্ব ইসলামের অন্যতম পাঁচটি রোকনের একটি। কলেমা নামাজ ও রোযা সবার জন্য, যাকাত ও হজ্ব আর্থিকভাবে সম্পদশালীদের জন্য ফরজ। হজ্ব পালন করতে হলে আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতা একান্তভাবে অপরিহার্য। এজন্যই আর্থিক সক্ষমতা অর্জিত হলেই কম বয়সে হজ্ব পালন করে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ। যেহেতু হজ্বের মত একটি মহা পবিত্র ও কল্যাণকর বিষয়ে লিখছি, কোন ভুল ত্রুটি হলে মহান স্রষ্টার দরবারে ক্ষমাপ্রার্থী। সেই সাথে প্রিয় বোনদের কাছেও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। পরওয়ারদিগার আমাদের ক্ষমা করুন। বার বার সুন্দর ও সঠিকভাবে এই মহাপুণ্য অর্জন করার তৌফিক দিন। আমিন।
এবারে আজকের আলোচনার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসছি। শারীরিকভাবে যারা অক্ষম, তারা বদলা হজ্ব করাবেন। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা দরকার, হজ্ব যখনি ফরজ হলো কারো ওপর নামাজ রোজা কাযার মতই হয়ে যাবে তাঁর জন্য ব্যাপারটা। সক্ষমতা ও সুবিধা থাকলেই হজ্ব পালন করতেই হবে। এই অবস্থায় অনাদায়ী হজ্ব রেখে গেলে, পরিবারের অন্যান্যদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে উনার পক্ষে বদলা হজ্ব আদায় করিয়ে দেয়া। তা না হলে ফরজ অনাদায়ের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে স্রষ্টার সামনে দাঁড়াতে হবে। নারীদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু এখানে অন্যতম প্রধান পার্থক্য হলো নারীদের মাহরাম লাগবে। মাহরাম হচ্ছে রক্ত সম্পর্কীয় সেইসব পুরুষ যাদের সাথে বিবাহ হারাম। বাবা-ভাই মামা-চাচা-ভাইপো- বোন পো এবং স্বামী। এঁরা রক্ত সম্পর্কিয় হবেন। মাহরাম না পেলে শরিয়তের নির্দেশ হলো শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা এবং অবশেষে বদলা হজ্ব করানো। অতীতে আমাদের নবীজীর আমলে নারীরা কাফেলার সাথে হজ্বে যেতে পারতেন। [রেফারেন্স মুয়াত্তা শরীফ হযরত ইমাম মালেক] এখনো বিভিন্ন হজ্ব কাফেলার সাথে নারীদেরকে যেতে দেখি। কিন্তু মনে প্রশ্ন একটাই জাগে বারংবার। যার কোন সঠিক উত্তর আমি আজ পর্যন্ত পাইনি। আমার প্রশ্ন আরবের মহিলারা একে অন্যের অনেক কাছাকাছি এবং নিজ এলাকায় অধিবাসী ছিলেন। সবচাইতে বড় কথা হযরত (দরুদ) এর এতে সায় ছিলো। কিন্তু এতদূর দেশ থেকে যাঁরা যাচ্ছেন তাদের ভিসা লাগছে। সেই ভিসায় মাহরামের সঙ্গে সম্পর্ক অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। কাফেলায় যারা যাচ্ছেন তাঁরা কি সঠিকভাবে জানতে পারছেন যে, তাদের মাহরাম কে হচ্ছে? এবং তাঁকে কি তিনি জানেন বা চিনেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা কতটুকু জায়েজ হচ্ছে? এই শুরুটাই যদি মিথ্যা দিয়ে হয়-তাহলে এই ত্যাগের ও শ্রমের বিনিময়ে লাভ কি আদৌ কিছু হবে? পবিত্র মক্কা মদিনায় যেখানে একটি পুণ্যের জন্য যথাক্রমে এক লক্ষ ও হাজার পুণ্যের ওয়াদা রয়েছে। সেখানে গুনাহের ভারও তেমনি ভারি। অতএব এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা আমাদের ভাবা দরকার। শরীয়তে একথাও বলা হয়েছে- কোন মহিলা যদি হজ্বে যাবার উপযোগী সম্পদের অধিকারী হন এবং স্বামী না গেলেও বাবা ভাই সন্তান বা অন্য কোন মাহরাম পান তাহলে চলে যাবেন। স্বামীর জন্য অপেক্ষা করবেন না। অনেকটা ফরজ নামাজ ও রোযার মতই। ফরজ এবাদতের বেলায় নারীদের ওপর কারো প্রাধান্য চলবে না। কিন্তু সুন্নত, নফল এসব নয়। আমি এই ব্যাপারে যাঁরা আলেম উলামা তাঁদের কাছে বিনীত অনুরোধ রাখবো, এই ব্যাপারটা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করাটা তাঁদের জরুরি দায়িত্বের মধ্যে বর্তায়।
হজ্ব এমন একটি এবাদত যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নর-নারী উভয়ের জন্য ফরজ করেছেন- কিন্তু নির্দিষ্ট কোন নামাজ রোযার শর্ত এর মধ্যে নেই। আছে কেবল নিয়ত করা এহরাম বাঁধা, তাওয়াফ-সায়ী করা। মিনা- মুজদালেফায় ও আরাফাতের ময়দানে নির্দিষ্ট সময় ও দিন অবস্থান করা। জামরায় গিয়ে পাথর মারা এবং কোরবানী করা। এসবই হজ্বের অন্তর্ভুক্ত। এসব শেষ হলেই ছেলেরা মাথা মুড়াবে, নারীরা অল্প চুল কাটবেন এবং এহরাম খুলবেন।
হজ্বের মত একটি পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অজ্ঞতা অবহেলা কিংবা গোড়ায় গলদ থাকার পরিমাণ যে কতটা সাংঘাতিক ও ভয়াবহ হতে পারে, সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকাটা অত্যন্ত জরুরি দায়িত্বের মধ্যে বর্তায়। এই দায়িত্বগুলো পালন করতে গিয়ে হাজী ভাই-বোনদের মুখে শুধুমাত্র থাকে একটি মাত্র বুলি-যা হলো- লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক. . .। হে আমার প্রভু! আমি হাজির. . . তোমার কোন শরিক নেই . . .। যার অন্তর্নিহিত ভাব হলো শুধু মাত্র ঐ সত্তার মহাপ্রভুর প্রেমে পাগলপারা তথা আত্মহারা হয়ে তাঁর সামনে কায়মনোবাক্যে হাজিরা দেয়া। সারা জীবনের সমস্ত গুনাহকে স্বীকার করে নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ফরিয়াদ করা। এজন্যই শারীরিক সুস্থতা সক্ষমতাটুকু-একান্তভাবে জরুরি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের হাজী ভাইবোনেরা বৃদ্ধ বয়সে যান এবং বিভিন্ন অসুস্থতা ও বহু ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতির শিকার হন। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি সবার মাথায় রাখা অতীব জরুরি বলে মনে করি।
পুরুষদের এহরাম আলাদা। কিন্তু নারীরা যে কোন পোশাককেই এহরাম হিসেবে নিতে পারেন। তবে তা শরিয়ত অনুযায়ী হতে হবে। বেশি রং চঙা না হওয়াই ভালো। এবং ছতর পরিপূর্ণভাবে যাতে ঢাকা থাকে সে বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এহরাম বাঁধার পর থেকেই দুনিয়াবি চিন্তা থেকে বিরত থাকা দরকার। মহাপ্রভুর সন্তুষ্টির জন্য সমস্ত মন প্রাণ ঢেলে একান্ত চিত্তে হাজিরা দিতে হবে। নিজেকে নিষ্পাপ ও পবিত্র করিয়ে নেয়ার এমন সুবর্ণ সুযোগ জীবনে আর নাও আসতে পারে। তাদের পরম সৌভাগ্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর দরবারে হাজিরা দিতে সুযোগ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ মালিক আমাকে সুযোগ দিয়েছেন, তাই তার মেহমান হতে পারছি। শোকর আল্‌হামদুলিল্লাহ। এই মনোভাব থাকতে হবে।
সুতরাং এই পবিত্র কাজ ও অসীম সাওয়াব অর্জনের পথে ছোট ছোট বাধা বিপত্তিতে কোন প্রকারের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা, কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করা, তথা ঝগড়া বিবাদকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সর্বান্তকরণে এড়িয়ে চলতে হবে। যাঁর ডাকে সাড়া দিতে এসেছি; তাঁর পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জনই একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হতে হবে। এখানে গুনাহ ও সাওয়াবের পাল্লা সমান। সারাবিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জমায়েত। লক্ষ লক্ষ মানুষের পদভারে এবং লাব্বায়েক ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত প্রকম্পিত। তেমনি এক সাথে পাশাপাশি চলতে গিয়ে নানা ধরনের বিঘ্ন ঘটা খুবই স্বাভাবিক। প্রত্যেককে সংযত ও বিনয়ী থাকতে হবে। কারো কোন অসুবিধা কিংবা বিপদে যথাসম্ভব সামগ্রিক সহায়তার হাতকে বাড়িয়ে দিতে হবে। এখানেই মওলার সন্তুষ্টি। এটাই আমাদের পরীক্ষা। পরম ধৈর্য ও সবরের সাথে সব পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিতে হবে।
আমাদের দেশ থেকে কাফেলার সাথে বয়স্ক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, অসুস্থ কিংবা নেহাত গণ্ডগ্রাম থেকে আসা মানুষের দেখা প্রচুর মেলে। তারা পথ হারান, টাকা-পয়সাসহ সর্বস্ব হারান। থাকতে গিয়ে বাথরুমের সঠিক ব্যবহার জানেন না বিধায় অনেকের বিরক্তির কারণ হন। বিশেষ করে মহিলাদের দেখেছি কাপড় শুকানোর জায়গা নিয়ে, খাওয়া-থাকা, শোয়া অর্থাৎ প্রায় সবকিছু নিয়েই অসন্তুষ্টি ও বিবাদে লিপ্ত হতে। হাজী বোনদের প্রতি বিনীত অনুরোধ-এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য রাখবেন। অন্যকে বুঝাবেন। সহায়তা দেবেন সাধ্যমত। ফরজ এবাদতের পরই মানবসেবা ইসলামের অন্যতম আর এক এবাদত হিসেবে গণ্য। হজ্বের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদনের পাশাপাশি, নফল এবাদত কম করে হলেও অসহায়দের সহায় হতে হবে। আমাদের প্রিয় নবীজী (দরুদ) তাঁর সারাটা জীবন অসহায়ের সহায় হয়েছেন এবং সহায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এটাই তাঁর পবিত্র সুন্নাহ। মহিলাদের জন্য আর একটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা নামাজের সময় তাঁদের পুরুষসঙ্গী বা সাথীদের থেকে আলাদা হয়ে যান। বিচ্ছিন্ন হলে কোথায় কত নম্বর গেটে অবস্থান করবেন, অপেক্ষায় থাকবেন তা আগে থেকেই চিনে নিবেন। এখন তো মোবাইল এই কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে। তবে সেই মোবাইল, আকামা, টাকা-পয়সা হোটেলের ঠিকানা, কাফেলার নাম, এসব সাথে রাখা-মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সাবধানেও রাখতে হবে যাতে চুরি না হয়। আমি এই সব হারিয়ে অনেককে আকুল হয়ে কাঁদতে দেখেছি। প্রয়োজনে বাংলাদেশ মিশনের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। মিনা-মুযদালিফা ও আরাফাতের ময়দানে বাথরুম থেকে ফিরে, তাঁবু হারিয়ে অনেক বোনকে এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছেন, কাঁদছেন এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। নারীরা এমন পোশাক পরবেন-যাতে টয়লেটে গিয়ে কোন অসুবিধা না হয়। আমি বিশেষ করে বলব-ম্যাক্সি-পেটিকোট এবং ভিতরে প্যান্টির ব্যবহার করতে। যেগুলো ধোয়া শুকানো খুব সহজ। সময় ও শ্রম কম লাগে।
বর্তমানে আর একটি কাজ খুবই দৃষ্টিকটু, বেয়াদবি ও চরম গুনাহর ভাগী হতে হবে বলে আমার বিশ্বাস। তা হলো সেলফি তোলা। আমি অনেককে দেখেছি পবিত্র বায়তুল্লাকে পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে। এই জঘন্য কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। যারা করছেন তাদের বোঝাতে হবে। মনে রাখতে হবে রাব্বুল আলামিন, মালিক মহান স্রষ্টা সবই দেখছেন। সুতরাং তাঁর এবং প্রিয় নবীজীর (দরুদ) সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ও আরাধ্য হওয়া উচিত। তাঁর সুন্নাহর খেলাফ করাটা আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জনেরই নামান্তর।
উমরা পালনের পরই নারীরা চুল কেটে এহরাম খুলে ফেলতে পারেন। কিন্তু হজ্বের সময়ে কোরবানির পরই এহরাম খুলতে হয়। যেহেতু হজ্বের সময় এহরামের কাপড় দীর্ঘ সময় ধরে খোলা যায় না; সেজন্য নারীরা মাথায় স্কার্ফ বা টুপিকে এহরাম হিসেবে রাখলে কষ্ট কম হবে। হজ্বের সময় যতটা সম্ভব নিজের আরাম আয়েশ ত্যাগ করে অন্যের সহায় হবেন। আল্লাহপাক আমাদেরকে সেই ধৈর্য সাহস ও মমতাটুকু দিন, আমিন। এই প্রসঙ্গে আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি; যা আমার কাছে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও গর্হিত বলে মনে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাহায্যকারী হিসেবেই আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। এটাই একমাত্র প্রার্থনা।
ঘটনা-১: এটি ছিল পবিত্র হজ্বের দিন আরাফাতের ময়দানের তাঁবুতে। একজনের স্যান্ডেল হারিয়ে গেছে। তিনি পাশের বোনকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলেন (বাথরুমে যাওয়ার জন্য) আমি কি আপনার স্যান্ডেল জোড়া নিতে পারি? কাজ শেষ হলেই ফেরত দিয়ে যাবো। স্যান্ডেলের মালিকের (স্পঞ্জের স্যান্ডেল) অবলীলায় উত্তর-না। ওগুলো আমি পরিষ্কার করে রেখেছি। দেয়া যাবে না। এই উত্তর শুনে আমরা অনেকেই হতভম্ব! পরে অবশ্য তাঁকে স্যান্ডেল দেবার মানুষের অভাব হয় নি। আল্‌হামদুলিল্লাহ।
ঘটনা-২: একজন বয়স্কা নারী এসেছেন গ্রাম থেকে ছেলের সাথে। মিনায় তাঁবুতে অবস্থান করছেন। পুত্র গেছে কোরবানী দিতে। তিনি তাঁর পুত্র আসার আগেই নিজের নখ কেটে ফেললেন। অর্থাৎ কোরবানী হয়েছে কিনা তা না জেনেই তিনি এই মহা সর্বনাশটি ঘটিয়ে ফেললেন অজ্ঞতা হেতু। কাজেই আমাদেরকে হজ্বের এসব আহকাম ও আরকানসমূহ সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। তায়াম্মুমের নিয়ম, ইমামের পেছনে নামাজ পড়ার নিয়ম, মসজিদে ঢুকেই দখলুল মসজিদের নামাজ পড়তে হবে এটাও অনেকে জানেন না দেখেছি। ইমামের আগেই সেজদা থেকে মাথা উঠিয়ে ফেলেন। সামিয়াআল্লাহুলিমান হামিদা বলা যাবে না- এসব ব্যাপারগুলো ভালোভাবে জেনে তবেই হজ্ব ও ওমরা পালনে যাওয়া উচিত। আর সঠিকভাবে সতর না ঢাকলে পুরো নামাজটাই বরবাদ। এটা জানাও ভীষণভাবে জরুরি।
ঘটনা- ৩: মসজিদে নববীতে একজন দুইটা চেয়ার নিয়ে বসেছেন। একটায় বসে আছেন, অন্যটিতে কোরআন শরীফ রেখে পড়ছেন। এক অসুস্থ মহিলা তার কাছে গিয়ে বিনয়ের সাথে একটি চেয়ার চাইলেন। তিনি তাঁর হাঁটুতে পড়ে আঘাত পেয়েছেন। এক পর্যায়ে হাঁটুর কাপড় সরিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা স্থানও দেখালেন। যদি মহিলা পবিত্র কোরআন শরিফকে সরিয়ে দয়া করেন। আসলে তিনি চাইলেই কোলের ওপর রেখে পড়তে পারতেন। কিন্তু তিনি সরাসরি ঐ প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন নির্বিকারভাবে। এটা যে কত বড় একটি গর্হিত কাজ করলেন- তা রাব্বুল আলামিনই ভালো জানেন। আল্লাহ আমাদেরকে মাফ করুন। ধৈর্য ও সবর এনায়েত করুন। আমিন।
হজ্বব্রত পালনের পর প্রায় সবাই মদিনায় যান। মদিনার বুকে শুয়ে আছেন আমাদের প্রিয় রাসূল (দরুদ)। পবিত্র মদিনার পবিত্রতা মর্যাদা ও আদব রক্ষার ব্যাপারে প্রত্যেক হাজী ও ওমরাকারীদের সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। মহিলাদের জন্য জেয়ারতের সময় যেহেতু নির্দিষ্ট এবং তুলনামূলকভাবে কম, তাই ধাক্কাধাক্কি বচসা এসব খুবই আপত্তিকর ও অনুচিত। ফেরেশতারা প্রতিমুহূর্তে তাঁর কাছে সালাম পৌঁছে দিচ্ছেন। এই প্রসঙ্গে প্রিয় রাসূল (দরুদ) স্বয়ং বলেছেন যে এখানে এসে জেয়ারত করল, সে যেন আমার সাথেই সাক্ষাৎ করল। তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি এক নাগাড়ে বিরতিহীনভাবে আমার মসজিদে চল্লিশ ওয়াক্তের নামাজ আদায় করল- তার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে গেলো। তাঁর আরো বক্তব্য ছিল- মদিনাবাসীরা দুর্দিনে আমাকে আশ্রয় ও সহায়তা দিয়েছে। তোমরাও তাদেরকে সহায়তা দিও। এই কারণে মদিনা থেকে কেনাকাটা করাকে অনেকেই উত্তম বলে অভিহিত করেছেন।
পরিশেষে বলব-ইসলাম অর্থ শান্তি। ইসলাম শান্তির ধর্ম। জাহালিয়াতের যুগের যাবতীয কুসংস্কার, অনাচার, অবক্ষয় অধর্মকে দূর করে পৃথিবীতে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্যই আল্লাহপাক তাঁর হাবিবকে (দরুদ) এই ধরায় পাঠিয়েছিলেন। সাথে দিয়েছিলেন পবিত্র কোরআন তথা তাঁর অমোঘ বাণী ও নির্দেশনামা। পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ইসলামের বিজয় পতাকা ও শান্তির বার্তা। নারীদের যথার্থ মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার দিয়েছে ইসলাম। সুতরাং আমাদের যাবতীয় কাজকর্ম শুধু ফরজ বিধি বিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদেরকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ও পদক্ষেপে ইসলামী অনুশাসনসমূহকে মেনে চলা- ফরজ সুন্নত নফলের পার্থক্যকে বুঝে পালন করা উচিত।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা-যাঁরা এবার পবিত্র হজ্বে যাচ্ছেন এবং আগামীতে যাবেন তাদের সকলকে এই বিধি-নিষেধের তারতম্যকে বুঝে চলার তথা প্রকৃত হজ্বে মাবরুর নসীব করুন, আমিন।

x