পবিত্র আশুরার তাৎপর্য ও মুহররমের শিক্ষা

ড. আ. ম. কাজী মুহাম্মদ হারুন উর রশীদ

মঙ্গলবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ
106

আজ ১০ মুহররম মঙ্গলবার পবিত্র আশুরা। প্রাচীনকাল থেকেই এ দিবসটি বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত। আজকের এ দিনে মানবজাতির ইতিহাসে বহু অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এদিনে আল্লাহপাক আসমান-জমিন, লওহ-কলম, সাগর-পর্বত সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম (আ.)- এর জন্ম, দুনিয়াতে অবতরণ, গুনাহ মাফ, জান্নাতে প্রবেশ, হযরত হাওয়া (আ.)- এর সৃষ্টি, জান্নাত সৃষ্টি, হযরত নুহ (আ.)- এর কিশতি জুদী পাহাড়ের পাদদেশে স্থির, হযরত ইবরাহিম (আ.) খলিলুল্লাহ উপাধিতে ভূষিতকরণ, হযরত ইবরাহিম (আ.)- এর জন্ম ও অগ্নিকুণ্ড থেকে নাজাত, হযরত দাউদ (আ.)- এর তাওবা কবুল, হযরত ইউনুছ (আ.) মাছের পেটে থেকে উদ্ধার, হযরত মুসা (আ.)- এর লোহিত সাগর পার, ফেরাউন ও তার দলবলসহ লোহিত সাগরে নিমজ্জিত, হযরত আইয়ুব (আ.) তাঁর কঠিন রোগ থেকে আরোগ্য, হযরত ঈসা (আ.)- এর জন্ম ও আসমানে তুলে নেয়া, চল্লিশ বছর পর হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.)- এর সঙ্গে সাক্ষাত লাভ ও ইমাম হুসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে শহীদ হয়েছিলেন এই আশুরার দিনে। বর্ণিত আছে, কিয়ামতও এ আশুরার দিনে সংঘটিত হবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে দেখতে পেলেন যে, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তখন রাসূল (সা.) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন- এদিনে তোমরা রোজা রাখছো এর কারণ কি? তখন তারা বললো- এটি একটি মহান দিবস। এদিনে আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.) ও তাঁর কাওমকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরাউন ও তার সম্প্রদায়কে নিমজ্জিত করেছেন। সুতরাং এর শুকরিয়া স্বরূপ মুসা (আ.) এ দিনে রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এদিনে রোজা রাখি। রাসূল (সা.) তা শুনে বললেন- ফানাহনু আহাক্কু ওয়া আউলা বিমুসা মিনকুম। অর্থাৎ, মুসার সঙ্গে আমার সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে আরও নিবিড়। এরপর রাসূল (সা.) আশুরার দিনে নিজেও রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। -(মিশকাত, নফল রোজার অধ্যায়)।
হযরত কাতাদাহ (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘কোনো ব্যক্তি আশুরার দিনে রোজা রাখলে আল্লাহ তায়ালা পূর্ণ এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।’ হযরত হাফসা বিনতে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সা.) চারটি জিনিস ত্যাগ করেননি। তা হচ্ছে- আশুরার রোজা। জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিনের রোজা, প্রতি চাঁদের ১৩, ১৪, ও ১৫ তারিখের রোজা এবং ফজরের দু’রাকাত সুন্নাত। -(নাসাঈ)।
আশুরার পরিচয় দিতে গিয়ে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেছেন- ইয়াওমে আশুরা হচ্ছে এমন একদিন, জাহেলী যুুগে সেদিন কুরাইশরা রোজা রাখতো এবং রাসূল (সা.)ও রোজা রাখতেন। পরে তিনি মদিনা থাকাকালে রোজা অব্যাহত রাখেন এবং লোকদের এ রোজা পালনের নির্দেশ দেন। -(বুখারি ও মুসলিম)। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেছে, রাসূল (সা.) বলেছেন- পবিত্র রমজান মাসের রোজার পরের স্থান মুহররম মাসের দশ তারিখের রোজা। আর ফরজ নামাজের পরের স্থান আশুরার রাতের নফল নামাজ- (মুসলিম)।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলে করিম (সা.) আশুরা ও রমজানের রোজাকে যতটুকু গুরুত্ব দিয়েছেন তা অন্য কোনো দিন বা মাসকে ততটা গুরুত্ব দেননি। হাদিসে আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ‘যে ব্যক্তি আশুরার রাতে খাঁটি অন্তরে নফল নামাজ আদায় করবে তার সকল গুনাহ আল্লাহপাক ক্ষমা করে দিবেন এবং তার ওপর আল্লাহর অশেষ রহমত বর্ষিত হবে। যাবতীয় বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যাধি ও দুঃখ-কষ্ট থেকে আল্লাহপাক তাকে মুক্ত রাখবেন। আর তার রুজি-রোজগারে বরকত ঢেলে দিবেন।’
আশুরার দিনে ইহুদি ও খ্রিস্টানরাও গুরুত্বের সাথে রোজা পালন করে। তাই মুহররমের নয়, দশ, ও একাদশ এ তিনদিন রোজা রাখা অধিকতর উত্তম। তবে নয়, দশ অথবা দশ, একাদশ দু’দিন রোজা রাখলেও হবে। শুধুমাত্র আশুরার দিনে রোজা রাখা মাকরুহ। আশুরার রোজা মুসলিমদের জন্য প্রথমাবস্থায় ওয়াজিব ছিলো। হিজরি দ্বিতীয় সালে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল হিসেবে বহাল রয়েছে।
১০ মুহররম বিশ্বের ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলেও দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়বিদারক এবং বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকার কারণ হলো, ন্যায় ও শান্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ (সা.)- এর আদরের দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) অসত্য, অধর্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য, ধর্ম ও ন্যায়কে চির উন্নত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে নিজ জীবনকে উৎসর্গ করে শাহাদাতবরণ করেছিলেন।
খোলাফায়ে রাশেদিনের পর হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ইসলামি রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নেতা হলেন। তারপর ইসলামের নামটুকু পর্যন্ত মুছে যাওয়ার উপক্রম হলো। রাজতন্ত্রের চিরাচরিত নিয়মানুসারে অনৈসলামিক উপায়ে আমিরে মুয়াবিয়া (রা.)- এর পুত্র ইয়াজিদ মুসলিম রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু ইমাম হুসাইন (রা.) এই অন্যায় পছন্দ করেননি এবং বরদাশতও করেননি। সুতরাং এটাই ছিলো ইয়াজিদ ও ইমাম হুসাইন (রা.)- এর মতভেদের মূল কারণ। ইতোমধ্যেই মদিনার গভর্নরকে ইয়াজিদ আদেশ দেয় যে, ইমাম হুসাইনকে ইয়াজিদের প্রতি বায়াত গ্রহণ করতে অথবা তাঁকে হত্যা করতে। তখন ইমাম হুসাইন (রা.) মক্কায় হিজরত করেন। মক্কায় হিজরতের পর কুফাবাসীর কাছ থেকে প্রায় দেড়শটির মতো চিঠি পান। এসব চিঠিগুলোতে তাঁরা ইমাম হুসাইন (রা.)-এর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেছে এবং কুফায় ইমাম হুসাইন (রা.)-কে আগমনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাই তাদের চিঠি মোতাবেক ইমাম হুসাইন (রা.) মক্কা থেকে কুফায় রওয়ানা হলেন। কিন্তু পথিমধ্যেই ইয়াজিদের সৈন্যদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলেন। ইয়াজিদের সৈন্যদেরকে তিনি বললেন- আমাকে মক্কায় ফিরে যেতে দাও নতুবা মুসলিমদের কোনো সীমান্তে ফিরতে দাও অথবা ইয়াজিদের কাছে যেতে দাও। কিন্তু ইয়াজিদ বাহিনী ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কোনো প্রস্তাবই শুনলো না। তখন লড়াই অবশ্যাম্ভাবী হয়ে উঠলো।
৬১ হিজরি ১০ মুহররম কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে দু’দলের সৈন্যবাহিনী মুখোমুখি। একদল হচ্ছে, ইমাম হুসাইন (রা.)- এর এবং অন্যদল হচ্ছে ইয়াজিদ বাহিনী। ইমাম হুসাইন (রা.)- এর দলে সৈন্য সংখ্যা ছিলো অশ্বারোহী ৩২ জন এবং পদাতিক মাত্র ৪০ জন। ইয়াজিদের পক্ষে সৈন্য সংখ্যা ছিলো চার হাজার। প্রথম দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আমর বিন সা’দ, মুয়ায়রা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে দু’দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইমাম হুসাইন (রা.) এক ভাষণ দিলেন। তিনি আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বললেন- ‘তোমরা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবি করছো। অথচ, আমার একটি অপরাধ আমি ইয়াজিদদের মতো একজন অধার্মিক, অসত্য ও গোমরাহ ব্যক্তিকে মুসলিমদের আমীর বলে স্বীকার করতে পারছি না। তাই সে অপরাধে আজ তোমরা আমার রক্তপান করতে দাঁড়িয়েছ।’ ইমাম হুসাইন (রা.)-এর এ ভাষণ ইয়াজিদ বাহিনীর মনে কোনো রকম রেখা পাত করলো না; বরং যুদ্ধ শুরু হলো। বাহিনীর সবাই বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে দুশমনের মোকাবেলায় একে একে শাহাদাতবরণ করেন। এরপর ইমাম হুসাইন (রা.) একাই জিহাদ করেন। অবশেষে কারবালা প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করলেন ইমাম হুসাইন (রা.)।
হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)- এর এই শাহাদাতের মাধ্যমে বিশ্বে মানব জাতির জন্যে এক অনন্য, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় আদর্শ স্থাপন করে গেছেন যে, মহান রাব্বুল আলামিন ও তাঁর রাসূল (সা.)- এর প্রেমে উদ্বুদ্ধ একজন মু’মিন প্রয়োজনে জীবন দিতে পারেন; কিন্তু একজন মু’মিন কোনো অবস্থাতেই আধিপত্যবাদ, অসত্য ও অন্যায়ের সামনে মাথানত করতে পারেন না।
আশুরার শিক্ষা হলো- একজন মু’মিন মাথানত করতে পারে শুধুমাত্র সকল সৃষ্টির স্রষ্টা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে; বরং অন্য কারো কাছে নয়। আশুরার দিবসে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত ছিলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মনুষ্যত্বের, ফাসাদের বিরুদ্ধে আপোসের, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংযম ও মানবতার, অহংকারের বিরুদ্ধে বিনম্রতার, হিংস্রতার বিরুদ্ধে মহত্ববোধের, নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে হৃদ্যতার ও জবরদখলের বিরুদ্ধে অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং অশান্তির বিরুদ্ধে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন- ‘ফিরে এলো আজ সেই মুহররম মাহিনা/ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’ আসুন, আমরা আশুরার এ পবিত্র দিনে মাতম, মর্সিয়া, জারি, তাজিয়া মিছিল ইত্যাদি করে পবিত্র দিনটির পবিত্রতা নষ্ট না করি। আল্লাহপাক আামাদের সবাইকে ইমাম হুসাইন (রা.)- এর আদর্শে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন॥
লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

x