পদ্মা সেতু তৈরিতে মানুষের মাথা লাগার গুজব কেন?

বৃহস্পতিবার , ১১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
1676

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের জন্য মানুষের মাথা লাগবে বলে যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে তার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সমপ্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি গুজবের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকতে বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি মহল সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি তুলে ধরে ওই বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়, ব্রিজ নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি গুজব।
পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ওই অঞ্চলের কাছে বেশ কয়েকটি এলাকায় বিভিন্ন বয়সী মানুষ অপহৃত হচ্ছে বলেও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় কিছু এলাকায় মানুষের মধ্যে ভিত্তিহীন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর বের হয়।
তবে, কোনো এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে কোনো অপহরণের খবর পাওয়া যায়নি। তাহলে কেন এমন একটি ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়ে পড়ল? খবর বিবিসির।
বাংলাদেশে সেতু নির্মাণ বা এ রকম বড় কোনো স্থাপনা নির্মাণ কাজে নরবলির গুজব নতুন নয। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী বলেন, দেশের শাসনব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের চিন্তাধারা পর্যবেক্ষণ করলেই এর কারণ বোঝা সম্ভব। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখবেন, আমাদের এই অঞ্চল বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন রাজা, সম্রাটদের মতো বিভিন্ন ধাঁচের শাসকদের অধীনে ছিল। নানা কিংবদন্তীমূলক কাহিনী, আবহমান কাল ধরে চলে আসা জনশ্রুতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন গল্পের ওপর বিশ্বাস করার প্রবণতা মানুষের মধ্যে প্রবল।
তিনি বলেন, কথিত আছে, ১৫৮০ সালের দিকে মৌলভীবাজারে কমলার দীঘি তৈরি করার সময় দীঘিতে যখন পানি উঠছিল না, তখন রাজা স্বপ্ন দেখেন তার স্ত্রী দীঘিতে আত্মবিসর্জন দিলে পানি উঠবে এবং পরবর্তীতে রাজার স্ত্রী আত্মাহুতি দেওয়ার ফলেই ওই দীঘিতে পানি ওঠে। দিনাজপুরের রামসাগর তৈরিতেও একই ধরনের কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে।
অধ্যাপক সুস্মিতা বলেন, এসব ঘটনার কোনো প্রামাণিক দলিল বা সুনিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকলেও শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে চলে আসার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধরনের গল্পের একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। আবার ইতিহাস বিবেচনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রায় সব এলাকার শাসকই তাদের প্রজাদের ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচার করেছেন। শাসকদের সেসব অত্যাচারের কাহিনীও কালের বিবর্তনে মানুষের মুখে মুখে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
সফলভাবে ব্রিজ তৈরি করতে পিলারের নিচে মানুষের মাথা দিতে হবে- আবহমান কাল থেকে মানুষের মধ্যে প্রচলিত এই কুসংস্কার নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বেশ কিছু গল্পও রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এসব গল্প শুনে আসে। কোনো ধরনের যাচাই ছাড়া সেগুলো বিশ্বাস করার প্রবণতার কারণেই এই প্রযুক্তির যুগেও সেসব গল্প সত্যি বলে বিশ্বাস করে।
তাঁর মতে, এ ধরনের গুজব যেন ছড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করার একমাত্র পদ্ধতি ব্রিজ নির্মাণের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালকের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে বিস্তারিত জানানো। জনগণের কাছে তথ্যপ্রবাহকে যতটা অবারিত করা হবে, সাধারণ মানুষকে ধোঁয়াশা থেকে মুক্ত করার জন্য যত বেশি প্রয়াস নেওয়া হবে, ততই এ ধরনের গুজব তৈরি হওয়া ও ছড়িয়ে পড়া কমবে।

x