পথ ও পথিক

সত্যব্রত বড়ুয়া

শুক্রবার , ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ
33

ছাত্রজীবনে রবি ঠাকুরের ‘পায়ে চলার পথ’ রচনাটি পড়ে আমি প্রবলভাবে আলোড়িত হয়েছিলাম। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের ফুটপাতকে উদ্দেশ্য করে তাঁর লেখাটি লিখেছিলেন না। সে আমলে তো কলকাতায় ফুটপাতই ছিল না। তবে জমিদারি করতে গিয়ে রবি ঠাকুর পায়ে চলার পথ দেখেছিলেন। সেকালের পথিকরা পায়ে চলার পথেই হাঁটতো। একালে আমরা শহুরে পথিকরা হাঁটি ফুটপাতে। রবি ঠাকুর আজ বেঁচে থাকলে ফুটপাতকে নিয়ে লিখতেন। তাঁর এ লেখাটি পড়েও আলোড়িত হতাম। এক সময় ফুটপাত ছিল নিরাপদ। নিরাপদ ফুটপাতে হাঁটতে খুব ভালো লাগতো। হাঁটতাম বাদাম চিবুতে চিবুতে। ফুটপাত এখন আর নিরাপদ না। হয়েছে আপদ। এই আপদের ফুটপাত যখন পথচারী আর ফেরিওয়ালার ভিড় ঠেলে হাঁটি তখন মনে হয় দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয়েছি। ‘মানুষ অভ্যাসের দাস’, তাই ফুটপাতে হাঁটবার অভ্যাস এখনো ছাড়তে পারিনি। সেদিন দেখলাম একটা কুকুর ভিড়ের মধ্যে পড়ে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। হঠাৎ দেখি মানুষের ধাক্কায় কুকুরটা আছাড় খেয়ে পড়ে গেলো। আগে জানতাম মানুষ আছাড় খায়। জীবনে এই প্রথম আমি একটা কুকুরকে আছাড় খেতে দেখলাম। অবাক হই যখন দেখি কোন অন্ধ ভিখেরি রাস্তায় লাঠি ঠুকে ঠুকে ভিড় ঠেলে হাঁটছে। আমি এ পর্যন্ত কোনো অন্ধ ভিখেরিকে রাস্তায় আছাড় খেতে দেখিনি। কয়েকদিন আগের ঘটনা। হাঁটবার সময় আমি আছাড় খেলাম। ফুটপাতের ভাঙা ডালার ফাঁকে আমার ডান পা’টা ঢুকে গেলো। আমি পা’টা কিছুতেই বের করতে পারছিলাম না। কেও আমাকে সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে এলোনা। কোনো কোনো পথচারীর কাছে আমি হয়ে উঠলাম দর্শনীয় বস্তু। কেউ কেউ তাদের স্মার্টফোনে আমার ফটো তুলে রাখলো। অনেক কষ্টে কারো সাহায্য ছাড়াই আমি আমার ডান পা’টা ফুটপাতের ফাঁক হতে বের করেছিলাম। রাতে আমার এক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানালো যে, এই মাত্র তিনি ফেসবুকে দেখলেন আমি আমার ডান পা ফুটপাতের ফাঁক হতে টেনে বের করছি। এর পরেও পথে হাঁটতে ভালো লাগে। হাঁটতে হাঁটতে জীবন দেখি। বহু বিচিত্র পথইতো রয়েছে। কোনো কোনো পথ হয়ে যায় রাজপথ। জানিনা এ ধরনের পথে রাজারা হাঁটতেন বলে এর নাম হয়েছে রাজপথ। এমনও হতে পারে পথের রাজা বলেই এর নাম রাজপথ। জনপথে হাঁটে জনপদের জনসাধারণ। আমাদের রয়েছে সড়ক, মহাসড়ক। রাস্তাতো রয়েছেই। রাস্তা থাকলে ‘জ্যাম’ও হবে। ছেলেবেলায় জ্যাম কথাটি শুনিনি। প্রথম প্রথম কথাটির অর্থ বুঝতাম না। এখন শুধু বুঝিইনা, মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। জ্যাম এখন আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁিড়য়েছে। জ্যামের কথা মাথায় রেখেই এখন আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কর্মসূচি তৈরি করি। জ্যামের কারণে যে শুধু আমাদের অফিসে আসতে দেরী হয়ে যায় তা নয়, যমেরও যমালয় হতে পৃথিবীতে আসতে দেরী হয়ে যায়। এ জন্যে যার প্রাণ নেওয়ার কথা সকাল ১০টায় তার প্রাণ যমের নিতে হয় দুপুর দু’টোয়। আমাদের এখন এতো বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে যে বিদ্যুৎ সরবরাহেও জ্যাম লেগে যায়। বিদ্যুৎ তাই বিশ্রাম নিয়ে আসে। এরই অপর নাম ‘লোড শেডিং’। কথাটির অর্থও আগে জানতাম না। এখন অনেক কথার অর্থই জানি। জানি ‘চোরা পথে’র অর্থও। বাজারে গিয়ে দেখি ইলিশ মাছের জ্যাম। দাম হাঁকালো প্রতি কেজি ৯০০ টাকা। দাম শুনে আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম। মাছ না কিনে আমি শুধু ঘ্রাণ নিলাম। ‘ঘ্রাণে অর্ধভোজন’। তাই হলো। কিন্তু আমার পাশে দাঁড়ানো ভদ্র লোকটি আমাকে বললেন, একেবারে পানির দরে বিক্রি হচ্ছে। দেখলাম দু’কেজি ইলিশ কিনলেন। আমি চুপি সারে সটকে পড়লাম। আরেক মাছ বিক্রেতার কাছ হতে ১ কেজি লেউট্টা মাছ কিনলাম। বাসায় এসে স্ত্রীকে বললাম, টাটকা লেউট্টা। তুমি পছন্দ করো তাই আনলাম। রাতে স্বপ্ন দেখলাম যে দু’জনে মিলে ইলিশ মাছ খাচ্ছি। জ্যাম মানেইতো জট। এ জন্যেই আমরা বলি যানজট। আমাদের জট বাঁধে মামলারও। এই জটে পড়ে বাবার আমলের মামলা ছেলের আমলেও নিষ্পত্তি হয়না। আমাদের রয়েছে পদচারী সেতু। সেখানে পথচারীদের পদ পড়ে না। আমি সুনাগরিক হতে গিয়ে পদচারী সেতু দিয়ে হাঁটবার সময় নাকে রুমাল দিতে হলো। দেখলাম এক কোণে বসে একটা পাগলি মাথার উকুন বাছছে। পাশে ঘুমোচ্ছে একটা নেড়ি কুত্তা। জেব্রা চিড়িয়া খানায় না দেখলেও রাস্তায় ‘জেব্রা ক্রসিং’ দেখি। এ ক্রসিং দিয়ে না হেঁটে নাতিকে নিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হই। বাসের ড্রাইভার গলা বাড়িয়ে বিশ্রী ভাষায় গালি দেয়। হজম শক্তি কমে গেলেও গালি হজম হয়ে যায়। পথে গাড়ি ছুটে। আমরা ছুটি। গাড়ি উল্টায়। প্রাণ যায়। তাকাবার সময় নেই। ট্রাফিক আছে। আইন আছে। আছে সবই। শুধু হুঁশ নেই। পথে হাঁটবার সময় মাঝে মাঝে বঙ্কিম চন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত সংলাপটি মনে ওঠে, ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ কী?’ প

x