ন্যাকাকুমার!

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
14

লেখকরা জনপ্রিয় হলে একটা সমস্যা হয়। নিজেদের হাজী মহসিন ভাবতে পছন্দ করেন। নিন্দা নিতে পারেন না। উল্টা প্রশ্ন করে বসেন, যেই বই অনেকে পড়ছে, সেটার নিন্দা কীভাবে হয়? এই প্রশ্ন আসলে জনপ্রিয়তার দোষে তৈরি হয়। অনেকেই হয়তো জানেন না, ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদারও এই দোষে দোষী। তিনি তার প্রকাশকদের আগেই বলে রাখেন, বইয়ের যেন রিভিউ না হয়। তার বিশ্বাস, যেবই বিক্রি হয়, সেটাই ভালো। আর, এটা জেনেও আমি তার একটা উপন্যাস নিয়ে সামান্য আলোচনা করবো। সামান্য আলোচনা বলার অর্থ আমার বিনয় না, এর অর্থ হচ্ছে, ‘কলিকাতায় নবকুমার’ উপন্যাসটা পড়ে আমি যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছি। যেহেতু বিরক্ত হয়েছি, এজন্য চাইলেও অসামান্য আলোচনা করা সম্ভব হবে না।

আসলে উপন্যাস লেখা সমরেশ মজুমদারের জন্য কঠিন কোনও কাজ না। তিনি প্রচুর উপন্যাস লিখে ফেলেছেন। কতগুলো লিখেছেন, তা হয়তো ভেবেও বলতে পারবেন না। কলিকাতায় নবকুমারের শুরুটাও তাই নাভেবেই, অর্থাৎ অবহেলা দিয়েই হয়েছে। নবকুমার উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের নাম। তার কথাই বলা যাক। ১৮৬৬ সালে ‘কপালকুন্ডলা’য় সর্বপ্রথম এই উপকারী চরিত্রটির দেখা পাওয়া গিয়েছিল। তখন ব্রিটিশ শাসন চলছে। ‘কপালকুন্ডলা’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় উপন্যাস। অন্যদিকে, সমরেশ মজুমদারের কলিকাতায় নবকুমার তা না হলেও, এটা প্রকাশের কয়েকমাস পরেই মুম্বাইতে (২৬/১১) বোমা হামলা হয়। কী কারণে জানি না, এই উপন্যাসটি বঙ্কিম পুরস্কার পায়।

পুরস্কারপ্রাপ্ত বই নিয়ে সবারই আশা থাকে। পাঠক সেটা কিনতে পছন্দ করে। সমরেশ মজুমদারের এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে সেটা হয়েছে। যদিও বিএ পাস করা নবকুমার কেনার মতো কোনও চরিত্র না। জলপাইগুঁড়ির ছেলেরা যেমন হয়, তেমনই গ্রামের সাধারণ একটা ছেলে। ভাল ভাবতে পছন্দ করে। জটিলতামুক্ত। সে তার পরিচিত এক মাস্টারমশাইয়ের হাত ধরে কলকাতা শহরে পা রাখে। মানুষের উপকার করতে গিয়ে নানারকম সমিতিতে ঢুকে পড়ে। প্রম্পটার হিসাবে তার যাত্রা শুরু হয়, এবং এটাসেটা করতেকরতে নবকুমার একসময় সিনেমার অভিনয়ে নায়ক হিসেবে ঢুকে পড়ে। যদিও এসব নিয়ে তার নিজের কোনও তাগিদ থাকে না। এটা হওয়ার কারণ, ঔপন্যাসিক খিদে লাগার আগেই নবকুমারকে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছেন।

প্রায় পঞ্চাশটার উপর চ্যাপ্টার উপন্যাসে, দুইশ তেষট্টি পৃষ্ঠা। এর মধ্যে নানা রকম চরিত্র ওই পরিবেশে ঘুরতেফিরতে এসেছে, কিন্তু নবকুমার একই থেকে গেছে। কলকাতা শহরের কোনও প্রভাব তার ভেতর পড়েনি। সে মেয়েদের দিকে পুরনো আমলের দৃষ্টিতে তাকায়। এগুলো উপন্যাসের খুঁত হতো না, যদিনা সমরেশ মজুমদার নবকুমারকে গ্রাম থেকে তুলে এনে সোনাগাছিতে ফেলতেন। সোনাগাছি হচ্ছে কলকাতার রেড লাইট এরিয়া। নবকুমার সেখানে থেকেও গ্রামের ছেলের মতোই ভাবে। একা একা সুখী হয়। জীবনানন্দ দাশ প্রচারিত অর্থ, কীর্তি, সচ্ছলতা, বিপন্ন বিস্ময়, রক্তিম গ্লাসের তরমুজ মদ কিছুই তাকে আলোড়িত করতে পারে না।

অথচ সোনাগাছিতে রাতের পর রাত আসে। পুলিশ নামে, আন্দোলন হয়, ধরপাকড় চলতে থাকে। নবকুমারকে তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমাস্টারমশাই তাকে একদিন কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন, তিনি একসময় দেখেন, তার কিছুই হচ্ছে না, কিন্তু ঔপন্যাসিকের সাহায্যে নবকুমার তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে। চরিত্রটির অসহায়ত্ব একসময় বের হয়ে আসে। নবকুমারের সঙ্গে দেখা করে চলে যাওয়ার পথে সোনাগাছির গণ্ডগোলের মধ্যে তিনি মারা যান। সম্ভবত এই একটা চ্যাপ্টারই সমরেশ মজুমদার জমিয়ে লিখেছেন, কিন্তু তাতে লাভ কী? তিনি শেষ পর্যন্ত কাহিনীই লিখতে চেয়েছেন। বলতে চেয়েছেন, নবকুমার, তুমি কীভাবে ব্যর্থ হও আমি দেখবো।

এরকম বেশ কিছু কারণে উপন্যাসের দারুণ একটা ক্ষতি হয়েছে। আপাতত একটার কথা বলি। প্রচুর পার্শ্ব চরিত্রের কারণে মুক্তো নামের চমৎকার একটা নারী চরিত্র পাঠকের সামনে আসতে পারে না। আড়ালে থেকে যায়। মেয়েটা জলের মত ঘুরে ঘুরে একা কথা বলে। চিলের মত দূরে দূরে থাকে। যদিও, কাছে চলে আসে প্রযোজকের এক বিশেষ বান্ধবি। তার সাথে নবকুমারের ভালো সম্পর্ক নিয়ে দুষ্ট আলোচনা কথা হয়। একটু সুড়সুড়িতে কাহিনী মোড় নেয় (কলকাতার জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকরা এই কৌশল নিয়মিত ব্যবহার করে থাকেন)। আর তখন তিনি বলে ফেলেন, যে দৃষ্টিতে ছেলেটা তার দিকে তাকায়, এর আগে কেউ তাকে সেই দৃষ্টিতে দেখেনি। এতে তিনি কোমল নারীত্ব অনুভব করছেন।

গ্ল্যামার ফেলে দিলে এই ঘটনাগুলো বিরক্তি নিয়ে আসে। ন্যাকা ন্যাকা লাগে। আরও বিরক্তি আসে, যখন নবকুমারের বাবামা মিথ্যে অসুস্থতার কথা বলে তাকে গ্রামে নিয়ে যায়। এ ধরণের লেখা কত লেখা হয়েছে। এই শতাব্দীতে এসব মেলোড্রামা সৃষ্টি করার কোনও মানে হয় না। তবুও জলপাইগুঁড়িতে জন্ম নেয়া জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার এসবই করেছেন। কাহিনী চলছে, সংলাপের পর সংলাপ চলছে, কিন্তু যাকে লাউ বলা হচ্ছে, সে কদু থেকে যাচ্ছে। পড়া শেষে তাই নিজের ওপর রাগ করতে ইচ্ছে করে। অন্য পাঠকদের বলতে ইচ্ছে করে, উপন্যাসটা পড়ে আপনি রাগ করবেন না। নিজেকে এক মুহূর্তেও জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প ভাববেন প্লিজ।

এই উপন্যাসটিকে মেলোড্রামার বেশি কিছু বলা যায় না। (ফাঁকে ফাঁকে রূপকথা আছে অবশ্য)। পড়ে ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদারকে এটুকু বলা যায়, খুব ভালো সংলাপ লিখেছেন। আরও লিখুন। আমরা করবো জয় একদিন।

আমি জানি, বাংলাদেশে সমরেশ মজুমদারের পাঠকদের মধ্যে যাদের এখনো কোমল মন আছে, তারা এই এক চোখা লেখা পড়ে আমার উপর রাগ করতে পারেন। যারা রাগ করবেন, তাদেরকে আরও রাগানোর জন্য বলছি, উনার অনেক দুঃখের একটা হচ্ছে, বাংলাদেশে তার বই প্রচুর পড়া হয়, কিন্তু যারা পড়েন, বেশিরভাগই পাইরেটেড কপি কেনেন। এতে তিনি প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত হন। এই কথাটা ঠাট্টা করার জন্য বলিনি। এটা বলার কারণ এর ভেতর একটা সত্য আছে। সত্যটা হচ্ছে, তিনি অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের পাঠকদের উদ্দেশ্যে লিখে থাকেন। কাজেই তার পাঠকদের জন্য কিছু দোজখের ওম দরকার। রবিশংকর বলএর একটা উপন্যাস আছে, দোজখনামা। এটা কলিকাতায় নবকুমার প্রকাশের পরের বছর বের হয়েছিল। সেখান থেকে সামান্য পড়া যাক।

‘‘ফরিদ মিয়াঁকে জিজ্ঞেস করি, কার পাণ্ডুলিপি?

সাদত হোসেন মান্টোর। আপনি নাম জানেন?

পাণ্ডুলিপির ওপর আমি ঝুঁকে পড়ি। আমার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর শোনা যায়, সাদত হোসেন মান্টো!

কিসসারা তাকে খুঁজে বেড়াত।

আপনি কী করে পেলেন?

এন্তেকালের কিছুদিন আগে আব্বাজান আমাকে দিয়ে যান। তার কাছে কীভাবে এসেছিল বলেন নি।

কী লিখেছেন মান্টো?

দস্তান। আপনারা যাকে নভেল বলেন। তবে কি জানেন, দস্তান ঠিক নভেল নয়। দস্তানের গল্প শেষ হতেই চায় না, আর নভেলের তো শুরু শেষ থাকে।’’

দোজখনামা হচ্ছে সাদত হোসেন মান্টো আর মির্জা গালিবের দস্তান। তারা দুই দেশের দুই কবর থেকে কথাবার্তা বলেন। এই কন্টেন্ট নিয়ে ঔপন্যাসিক রবিশংকর বল মাটির নিচে আলো ফেলেছেন। সুক্ষ্মভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, মাটির উপরে সীমান্ত উঠে গেছে ঠিক, কিন্তু তার নিচে কিছু হয় নি। একই আছে। তারপর আস্তেআস্তে দম বন্ধ হয়ে আসে। থমথমে অনুভূতি হয়, এবং সেই অনুভূতি আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতর খেলা করতে পারে। ক্লান্ত করতে পারে। সবমিলিয়ে একটা উপন্যাস পাঠের অভিজ্ঞতা হয়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, দোজখনামাও পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস। অথচ প্রায় কাছাকাছি সময়ে ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার সোনাগাছি এলাকার কোনও একজনের মুখে নিজেকে উপস্থাপন করে বলছেন, সোনাগাছির বাইরে পাপ আরও বেশি হয়। এই কথাটায় চমক আছে, কিন্তু তার এই বলাটা অত্যন্ত শিশুতোষ। অযৌক্তিক। এর কারণ একটাই, দুই জায়গার রিয়েলিটি ভিন্ন। এটা এভাবে মেলানোর সুযোগ নেই। তাছাড়া কোনও উপন্যাস রচয়িতা তার দায়কে এভাবে জায়েজ করে চলে যেতে পারেন না। যদিও ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার জনপ্রিয়তার দোষে বারবার এটাই করে চলেন। কিসসারা হয়তো তাকে খুঁজে পায় না। নাপাক। সমস্যা হচ্ছে, তিনি যখনই ফাঁকি মারেন, তখনই কপালকুণ্ডলার সেই বিখ্যাত বাক্যটি কানের পাশে চলে আসে। তারপর জিভের আগায় এসে বলে উঠে, সমরেশ, আপনি পথ হারাইয়াছেন।

x