নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা ও যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়

শুক্রবার , ৩১ মে, ২০১৯ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ
69

আজ বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। অন্যান্য দেশের মতো আজ বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট রোগ, আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি সম্পর্কে জনসচেতনতার মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লক্ষ্যেই বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালন করা হয়ে থাকে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘তামাকে হয় ফুসফুসে ক্ষয় : সুস্বাস্থ্য কাম্য, তামাক নয়’।
তামাকের ভয়াবহ দিক থেকে দেশের মানুষকে রক্ষায় সরকার ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ এবং বিধিমালা ২০০৬ প্রণয়ন করেছে। বিশ্বের অন্যান্য ৭৭টি দেশের মতো বাংলাদেশেও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধি অনুসারে ১৯ মার্চ ২০১৬ তারিখ থেকে সব তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট ও কৌটার উভয় পাশে ৫০ ভাগজুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মুদ্রণ কার্যকর হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকার জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ২০১৩ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনটি সংশোধন করে এবং ২০১৫ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রকাশ করে। আইন ও বিধি বাস্তবায়নে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি, তামাক চাষ নিরুৎসাহিতকরণ নীতি, স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ব্যবস্থাপনা নীতি ইত্যাদি প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব নীতি ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ,অধিদপ্তর, দপ্তরের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য মতে, বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৭ শতাংশ তামাক সেবন করে থাকে। আর প্রতি বছর এ হার ১০ থেকে ১২ শতাংশ আকারে বেড়ে চলছে। বর্তমানে ৪৩ শতাংশ অর্থাৎ ৪ কোটি ১৩ লাখ প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষ প্রত্যক্ষভাবে তামাক ব্যবহার করছে। এছাড়া ৫৮ ভাগ পুরুষ ও ২৯ ভাগ নারী বিড়ি-সিগারেট তামাক সেবন করে থাকে। আর নারীদের মধ্যে ২৮ শতাংশ এবং ২৬ শতাংশ পুরুষ প্রতিদিন পান, জর্দা, গুলের মাধ্যমে ধোয়াহীন তামাক সেবন করে। অন্যদিকে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর পৃথিবীতে ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে তামাকের কারণে এবং বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মৃত্যুর এ সংখ্যা ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে ৮০ লাখে দাঁড়াবে। বাংলাদেশে ধূমপানজনিত প্রধান আটটি রোগে প্রতি বছর প্রায় ৫৭ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। তদুপরি ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন তামাকজনিত রোগে। প্রতি বছর যে ১২ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে ভোগেন তাদের চিকিৎসাব্যয় বিপুল। প্রতি বছর যে হারে তামাক ব্যবহার জনিত কারণে মৃত্যু হয়, এর অন্যতম কারণ হল এসব দ্রব্যের সহজলভ্যতা ও মূল্য কম হওয়া। ক্যান্সার হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, গত ২০ বছরে বিড়ি সিগারেটের দাম যে হারে বেড়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য (যেমন চাল, ডাল, তেল, আটা) দাম তার চেয়ে অনেক গুণ বেড়েছে। অন্যদিকে নেশা জাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা ও যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলেই বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, দেশে যে হারে মাদকাসক্তদের সংখ্যা বাড়ছে তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। মাদক সেবন ও বিক্রিতে ছিন্নমূল মানুষ ছাড়াও উচ্চবিত্ত নারীরা ইয়াবাসহ নানা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। এভাবে কোমলমতি শিশু ও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকেও জড়ানো হচ্ছে এ পেশায়। ছোট ছোট নেশায় আবদ্ধ নয় এখনকার তরুণরা। ওরা বড় নেশায় বুদ হয়ে আছে। এদের রক্ষা করতে হবে। পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও অহরহ দেখা যায় ধূমপান করতে। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ হওয়া দরকার।
ধূমপান বিরোধী আইনের বাস্তবায়ন তামাকের ক্ষতিকর বিষয়ে জনগণকে সচেতন করলেও কার্যকরভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ ও মূল্য বৃদ্ধি বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব ব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক গবেষণায় বলেছে, ১০% মূল্য বৃদ্ধিতে ৪২ মিলিয়ন লোক ধূমপান ত্যাগ করবে এবং উন্নয়নশীল দেশে ৯ মিলিয়ন লোকের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। তাই এ বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

x