নেটিজেন ভার্সেস সিটিজেন

অনিক শুভ

বুধবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৮ at ১২:১৯ অপরাহ্ণ
12

সাল ২০৫০। প্রযুক্তির ধারাবাহিকতায় এখন বাংলাদেশের প্রায় সকল সিটিজেন নেট আসক্ত হয়ে গেছে। যেসব সিটিজেন এখনো নেট আসক্ত হয়নি তারা প্রযুক্তির গতিশীলতা নিয়ে কথা বলছে, আর যারা পুরোপুরি নেট আসক্ত, নেটিজেন তারা ইন্টারনেটের বিপক্ষে কোন কথা মানতে নারাজ।
নেটিজেনরা সবকিছুতেই নেটনির্ভর। পড়াশোনা, ফ্যাশন, বিনোদন, খেলাধুলা, খাবার-দাবার, বিভিন্ন তথ্য থেকে শুরু করে যায় হোক না কেন, কোন কিছুর প্রয়োজন হলেই নেটে লগইন করছে। তারা আর মস্তিষ্ককে কাজে লাগাতে চাইল না। যার কারণ উন্নত প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির সাহায্যে অনায়াসে আরাধ্য বিষয়টা নেটে পেয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে লোপ পেতে থাকে সবার বিবেচনাবোধ। ফলে বাংলাদেশের একাংশ মানুষ যারা নেটিজেন তাদের বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতার অস্তিত্বকে টিকে রাখা বড় দায় হয়ে গেল।
স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে কেউ আর ক্লাশ রুমে সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেনা, যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা কম্পিউটার বা মোবাইলে নেট লগইন করছে। এতে প্রজন্মের উপর এক নেতিবাচক প্রভাব শুরু হল।
ডায়াল আপ ইন্টারনেটের জায়গায় যেখানে প্রথমে ছিল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, এখন সেটা ওয়াইম্যাক্সের দখলে। নেটিজেনদের এক বিরাট অংশ চলে গেছে ঐ ওয়াইম্যাক্সের জগতে। শুধু তাই নয়। বাংলাদেশের সকল জনগণের মোবাইলে এখন ইন্টারনেট সংযোগ। স্বাভাবিক ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়ে গেল। নেট আসক্তদের সংখ্যাও বেড়ে গেছে অনেক গুন হারে। পুরো দেশ এখন প্রায় নেটিজেনদের হাতে।
সৃষ্টিশীলতা কমে গেছে। সবাই সামাজিকতা এড়িয়ে চলছে। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে একা থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। প্রত্যেকের ব্যবহারেও এসেছে পরিবর্তন। এসেছে অস্থিরতা। রুক্ষ হয়ে গেছে সবাই।
এখন তারা সামাজিক যোগাযোগের সাইট মেসেঞ্জার, ইমো, ভাইবার, স্কাইপ এর মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করছে সব ঘরে বসেই। সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো তাদের বাহ্যিক যোগাযোগ কমিয়ে নেট যোগাযোগ বাড়িয়ে দিল। এতে নেটিজেনদের শারীরিক স্থূলতা, মানসিক অবসাদ ও আর্থিক সমস্যা দেখা দিল।
এতকিছুর মাঝে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ইন্টারনেটে পাওয়া সব তথ্য সঠিক নয়। অনেক ভুল তথ্যও আছে নেটে। ক্রস চেক না করার কারণে ভুল তথ্য নিয়ে সুপার নেটিজেনদের সাথে সিটিজেনদের শুরু হল এক দ্বন্দ্ব।
সিটিজেনরা বলে ওরা সঠিক, আর নেটিজেনরা বলে ওরা সঠিক। অথচ কোন বিষয় আগে থেকে জানা থাকলে তা সহজে বোঝা যায় তথ্যটি সঠিক নাকি ভুল। জানা না থাকলে ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বইপত্রের সাথে মিলিয়ে দেখলে বড় ধরনের ভুল থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু সুপার নেটিজেনদের সেই বিচার বুদ্ধি সক্ষমতাও হারিয়ে গেছে। কখন কোথায় কি করছে ওরা নিজেরাও জানেনা। অনেক ভুল তথ্যকে সঠিক প্রমাণ করে তারা কোন্দল সৃষ্টি করে দিল সিটিজেনদের মাঝে। তাদের এইরকম উদ্ভট সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা সরকারি অফিস গুলোও। তাদের একটাই কথা- নেটের সব সঠিক, আর নেট না পেলে আমরা বাঁচব না।
এত উন্নত প্রযুক্তিতে এসে সিটিজেনরা না পারছে আন্দোলন করে নেট কানেকশন কমাতে, আর না পারছে সুপার নেটিজেনদের বোঝাতে। তাই সকল সিটিজেন একসাথে হয়ে বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট এর শরণাপন্ন হল। তারা গভর্নমেন্ট কে জানালো কিভাবে সুপার নেটিজেনদের একটা স্বাভাবিক জীবনে নিয়ে আসা যায়। কিভাবে ইন্টারনেট নির্ভরতা কমিয়ে একে প্রধান না ভেবে সহযোগী অনুষঙ্গ ভাবা যায়। কিভাবে নেট আসক্তি না হয়ে এই প্রজন্মের গতিশীলতা আরো বাড়ানো যায়।
বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট সিটিজেনদের প্রত্যেকটা কথা মন দিয়ে শুনলো। তিনি দেশের উচ্চপর্যায়ের আইটি বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের এক জরুরি সভায় ডাকলেন। সভার মুল বিষয় হল কিভাবে নেটিজেনদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়।
সভায় এক এক করে সবাই তাদের মতামত দিতে লাগলেন। কিন্তু কোন মতামতই গভর্নমেন্ট এর মনমতো হল না। পরে সবাই এক সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, সুপার নেটিজেনদের কম্পিউটার থেকে দূরে না রেখে মানসিক কাউন্সিলিং করে আসক্তিটা দূর করতে পারলে তাদের নেটের ওপর থেকে নির্ভরতা কমবে এবং তারা আস্তে আস্তে আবার মস্তিষ্ককে কাজে লাগাতে পারবে।
সিটিজেনদের মাঝে যারা প্রযুক্তি নিয়ে বড় হয়েছে, তারা বেশ ভালো ভাবে জানে ইন্টারনেটের সব দিক। চেনে ও বুঝে। তাই তারাও গভর্নমেন্ট কাউন্সিলরদের সাথে যুক্ত হয়ে সুপার নেটিজেনদের কাউন্সিলিং করতে লাগলো। অভিভাবকদের আরো আধুনিক ও সতর্ক হওয়ার জন্য বলা হল যাতে নেটিজেনরা নেটে কি করছে সেটা জানা যায়।
দেশের সর্বস্তরের সকল মানুষদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হল ইন্টারনেট এবং এর ক্ষতিকারক দিক গুলো নিয়ে। ফলে নেটিজেনদের নেট আসক্তি আস্তে আস্তে কমতে থাকে।
“ইন্টারনেট না পেলে বাঁচব না” এ কথা মোটেও আর শোনা যাচ্ছে না। সিটিজেনদের মত নেটিজেনরাও তাদের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে এখন। আগের মত মোবাইল বা কম্পিউটারে নেট লগইন না করে সকল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে চট জলদি। সিটিজেন আর নেটিজেন সবাই একত্রিত হয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশকে এক ক্ষমতাসীন প্রযুক্তি সম্পন্ন দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে তুলে ধরলো । আর নেটিজেনরা নেটে বিচরণ করতে লাগলো সুজন হয়ে।

x