নূর মোহাম্মদ রফিক আঞ্চলিক ভাষা প্রেমিক এক মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক

জামাল উদ্দিন

শুক্রবার , ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৭:৩৫ পূর্বাহ্ণ
165

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, ছড়াকার নূর মোহাম্মদ রফিক; একটি নাম, একটি ইতিহাস। ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অবিধান’, অবিস্মরণীয় এই গ্রন্থ সম্পাদনা করে তিনি আজ কিংবদন্তি। এছাড়া লিখেছেন ‘কালবৈরী’ নামে আত্মোপন্যাস’। এই দু’টি ঐতিহাসিক গ্রন্থর সাক্ষী সাগরনন্দিনী বীর চট্টলার মাটি ও মানুষের ভাষা। সাক্ষী মানতে পারি ছন্দেআনন্দে ধেই ধেই করে ছুটে চলা পাহাড়ি নদী কর্ণফুলী, হালদা, শঙ্খ আর সাম্পান মাঝিকেও। সবাই সাক্ষ্য দেবে তিনি চট্টগ্রামের ক্ষণজন্মা পুরুষ। তাঁর নামের আগে যোগ করা যায় ভাষাবিদ, ছড়াকার, কবি, সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, সংগঠক ইত্যাদি বিশ্লেষণে। এক কথায় তিনি চট্টগ্রামের ইতিহাসের প্রত্নমানুষ।

চলুন এবার চোখ রাখি এই কৃতী ব্যক্তিত্বের জন্মকথার খেরোখাতায়। তাঁর জন্ম ১৯৪৪ সালের ১৭ নভেম্বর। পিতা আবদুল নবী খান ও মাতা ফুল মেহের খাতুন। তাঁর পৈত্রিক নাম রফিক খান, কি‘ তিনি নূর মোহাম্মদ রফিক নামেই পরিচিত। জন্মস্থান চট্টগ্রাম শহরের মধ্যম হালিশহরের জাফর খান পাড়ায়।

বয়স তাঁর ৭৪ হলেও জীবনবোধ, চলাফেরা, লেখালেখি, কথা বলা কোনো কিছুতেই তাঁকে বৃদ্ধ মনে হয়নি, বরং সব কিছুতেই চির তরুণের মতো অদম্য স্পৃহা নিয়ে বিচরণ করেছেন। কয়দিন আগেই তিনি অসু’বোধ করলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, অনেকটা সুস্থ হয়েই বাসায় ফিরেছিলেন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, তিনি হঠাৎ করেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

রফিক ভাইয়ের দীর্ঘ জীবনের প্রথমভাগ কেটেছে বাউণ্ডুলেপনায়। উনিশশ আটষট্টিতে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ অফিসে এসে স্থিত হন পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত। পরবর্তী জীবনের পুরোটাই কেটেছে তাঁর সাংবাদিকতায় আর এসবের মধ্যে চলেছে তাঁর লেখালেখি। আর এই লেখালেখির পর্বে তিনি চমৎকার এক গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেনণ্ড ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’। গত ২০০১ সালে ঢাকায় বই মেলায় গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন চট্টগ্রামেরই কৃতী সন্তান কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা। বইটি প্রকাশের পরে দেশের সুধীমহল ও পণ্ডিতবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়।

পণ্ডিত সমাজের অনেকেই ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এরূপ একটি গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা ও তার ভালোমন্দ তুলে ধরেন। এছাড়া, সিটিভিতে ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ শিরোনামে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইমেরিটাস প্রফেসর ড. আবদুল করিমও বইটির উপর আলোকপাত করে এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। চট্টগ্রাম হেরিটেজ রিসার্চ সেন্টারের উদ্যোগে বইটির উপর এক সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়, যাতে চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দ আলোচনা করেন। বইটির ব্যাপারে পত্রপত্রিকা ও সেমিনারে প্রবন্ধাকারে আলোচনা করেছেন গুণীজ্ঞানী অনেকেই। গেল ২০১৫ সালের মার্চ মাসে মোমিন রোড কদমমোবারক বিল্ডিংএর আমার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘বলাকা প্রকাশনে’ সেদিন এক নির্জন সময়ের আলাপচারিতায় তাঁর এই গ্রন্থটি প্রণয়নের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও তার ইতিহাস জানতে চাইলে রফিক ভাই বললেনসে এক দীর্ঘ ইতিহাস। অতঃপর তিনি বলে চললেনণ্ড চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ভাষা প্রীতিটা আমার সে শৈশবকৈশোর থেকেই। পরিণত বয়সে এসে আমার কেমন যেন ভয় হচ্ছিল যেভাবে শহরায়ণ এবং নগরায়ণএর সঙ্গে সঙ্গে ভাষার প্রমিতায়ন এবং হালের বিশ্বায়নের দ্রুতায়ন ঘটছে তাতে চট্টগ্রামের এই সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ভাষাটি অচিরেই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। এর শব্দসম্ভারকে একত্রিত করে গ্রন্থাকারে ধরে রাখার লক্ষ্যে অনেক ভেবেচিন্তে সাহসে বুক বেঁধে শুরু করলাম কাজ। বন্ধুদের অনেকে হাসাহাসি করে আমার পাগলামো দেখে। খুব ঘনিষ্ঠজনের দু’একজন একান্ত কাছে এসে বলে, কি সব বাজে কাজে মেতে আছ। দু’চারটা টাকা কামাইয়ের কথা চিন্তা কর, নতুবা কপালে দুঃখ আছে।

কাজটা যে বাজে, তার সঙ্গে অর্থ ব্যয় ছাড়া আয়ের কোন সংযোগ নেই, আর কপালে যে দুঃখ আছে সেটা আমিও দেখছি স্পষ্ট। কি‘ ঐ যে নেশায় পেয়ে গেছে। কাজ শুরুর পর সাড়ে তিন বছরের মাথায় বিভিন্ন উপায়ে সংগৃহীত হল দশ সহস্রাধিক মৌলিক শব্দ। যার একটা সিংহভাগ বাংলা একাডেমির বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ থেকে নেওয়া। সেই দশ সহস্রাধিক শব্দের পুঁজি নিয়ে বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নিলাম।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ আলী গ্রন্থটির কম্পিউটারাইজড্‌ পাণ্ডুলিপি দেখেশুনে সানুগ্রহে একটি ভূমিকা লিখে দিলেন। এই মুহূর্তে আমি তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। বই মেলা চলাকালীন মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি অবশেষে প্রকাশিত হলো ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান।’

মেলার সুনির্দিষ্ট মঞ্চে বইএর মোড়ক উন্মোচন করলেন চট্টগ্রামেরই এক কৃতী সন্তান কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা। তাঁর সাথে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কলকাতার এক পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়া, ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়াসহ আরো বেশ কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

বোধ হয় নতুন বিষয় বলেই বইটির বিক্রিবাট্টা চলছিল মোটামুটি ভালই। ক্রেতাদের মধ্যে বেশীর ভাগই চট্টগ্রামী। এইরূপ কাজটি করার জন্যে তাদের দু’একজন বয়স্ক নরনারী আমাকে দোয়াও করলেন মাথায় হাত বুলিয়ে। অন্য জেলার লোকও কেউ কেউ বইটি কিনছিলেন। কেন তারা বইটি কিনছেন জিজ্ঞেস করলে তাদের একজন জানালেন, তাদের জেলার আঞ্চলিক ভাষায় এই ধরনের একটি বই করার ইচ্ছা তারও আছে।

পুরানা পল্টনে চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান শিল্পী সবিহউল আলমএর টইটম্বুর অফিসে গেলাম তাঁকে একটি বই পৌঁছে দিতে। ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ নামটি দেখে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ। তিনি জানালেন, আপনি তো আমাদেরকে শেষ করে দিয়েছেন, এইরূপ একটি প্রকল্পের কথা তো আমাদের মাথায়ও ছিল এবং এই জন্যে আমরা একটি গ্রন্থও করেছি। স্মিত হেসে জানালাম, আমি একাই করেছি কাজটি।

সবহিউল আলম পরবর্তীতে বইটির চাউস এক আলোচনা ছেপেছেন ঢাকা’ চট্টগ্রাম সমিতির মুখপত্র ‘চট্টল শিখা’য়। তবে বইটির ব্যাপারে প্রথমে আলোচনা আসে চট্টগ্রামের আরেক কৃতী সন্তান সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরএর হাত দিয়ে। চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী’র সাপ্তাহিক ‘ঢাকার চিঠি’ কলামে। পরবর্তীতে ঢাকার দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক যুগান্তর প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য দৈনিকগুলোতে বিভিন্ন জনের আলোচনা আসে বইটির উপর।

চট্টগ্রামে বইটি হাতে পেয়ে নোবেল উইনার খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস মন্তব্য করেন, বইটির সম্পাদক শিক্ষিত ও পণ্ডিত ব্যক্তি বটে।

শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ তাঁর কাছের ২/৪ জনকে বলেছেনণ্ড রফিক মিয়ার বইটি কালেকশানে রেখো।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ময়ূখ চৌধুরী গ্রন্থটি প্রকাশের পর তাঁর ছাত্রছাত্রীদেরকে তা সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন সে খবর তাঁর একাধিক ছাত্রের কাছ থেকে জানতে পেরেছি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক প্রয়াত চৌধুরী জহুরুল হক বলেছিলেন, আমরা লিখে লিখে সারা, আর আপনি একটি দিয়েই বাজিমাৎ করে দিলেন!

বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার অভীক ওসমান একদিন সামনাসামনি পেয়ে বললেন, আপনার তিনটি বই আমি কিনে দু’বন্ধুকে দু’টি উপহার দিয়েছি। খুশীর খবরই বটে!

২০০৩ সালের ১৭ নভেম্বর আমার ষাটতম জন্মদিনে ‘সাহিত্য সম্বাদ’ একটি স্মারক প্রকাশ করে আমার উপর। তাতে প্রায় অর্ধ শতেক মত লেখক, কবি, ছড়াকারের লেখা স্থান পায়। অধিকাংশ প্রবন্ধে স্থান দখল করে অভিধানএর বিষয়টি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক সাহেবতো কেবল অভিধানের উপরেই বড় ও মূল্যবান এক প্রবন্ধ লেখেন। পরবর্তীতে ওই অভিধান নিয়ে প্রবন্ধকারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আরো অনেকে। যেমন ড. মো. আবুল কাসেম, . আহমেদ মাওলা, শিক্ষাবিদ শিশির বড়ুয়া প্রমুখ গুণীজনও।

সে বারের জন্মদিনে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী, পূর্বকোণ ও চট্টগ্রাম মঞ্চে আমার উপর বিভিন্ন জনের লেখাও প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে দৈনিক পূর্বকোণে প্রকাশিত ঢাকা থেকে পাঠানো ঢাকার দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্য বিভাগে কর্মরত আমার অনুজতুল্য জাফর আহমদ রাশেদের পাঠানো লেখাটি আমার মনে খুবই রেখাপাত করে। ‘নূর মোহাম্মদ রফিক নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন’ শিরোনামে তার লেখাটির শেষ প্যারাটি ছিল অভিধান বিষয়ে। আগের প্যারায় আমাকে খুব করে তুলোধুনো করে পরের প্যারায় লিখেছেনণ্ড ‘তবে একটি ঘটনা ঘটে গেছে যা অবিশ্বাস্য। নূর মোহাম্মদ রফিক দিনে দিনে গড়ে তুলেছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান এবং তা বেরিয়েও গেছে। প্রকৃত ভাষা মানেই আঞ্চলিক ভাষা, ভাষার গহিন গভীর প্রাণ আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে। শুধু চট্টগ্রামের মানুষের জন্য নয়, ভাষাবৈচিত্র্যের ব্যাপারে যাদের সামান্য আগ্রহও আছে, এই বদ্বীপ, সন্নিহিত অঞ্চল, এমনকি এ অঞ্চলের ভাষাসমূহের প্রতি আগ্রহী মহাসমুদ্রের ওপারের লোকদেরও এই অভিধানের কাছে আসতে হবে। আমরা যারা ‘ঘরর গোর“ ঘাঁডার খের ন হাই’ আমরাই শুধু এই অসম্ভব মূল্যবান কাজটির গুরুত্ব সহজে বুঝে উঠতে পারব না।

রফিকদার অনেক অপচয় আছে। নানাধরনের প্রতিভার বহুমাত্রিক অপচয়ের কথা আমরা জানি, রফিকদা অত বড় প্রতিভা কিনা আমি জানি না। কি‘ বেঁচে থাকা অবস্থায় একথা বলে আমি আনন্দিত হতে চাই যে, রফিকদা, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান এই একটি কাজ দিয়ে আপনি অনেক অনেককে, এমনকি নিজেকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এ নিয়ে আপনি আরো কাজ করতে পারেন এবং আর কারো তোয়াক্কা আপনার না করলেও চলে।’

কোন প্রকার পাণ্ডিত্য ফলানো কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য নয়, কেবলমাত্র একটি ভাষার প্রতি মমতাবশতঃ এই কাজটি করেছি ভাষাবিজ্ঞানে আমার কোন একাডেমির জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও। এটি অভিধানের একটি নমুনা মাত্র, কোন পূর্ণাঙ্গ অভিধান নয়। আমার সীমাবদ্ধতার কারণে বিবিধ প্রকারে ত্রুটিপক্ষবিচ্যুতি এতে থাকবে এটি অনস্বীকার্য। আমি সূত্রধরের কাজটাই করেছি মাত্র। পিণ্ডাকার সূত্রের প্রান্তটা আমি বের করে দিয়েছি, এর পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার কাজ এখন প্রকৃত ভাষা বিজ্ঞানীদেরই। জাফর অভিধানটির ব্যাপারে আরো কাজের কথা বলেছে।

অভিধানটিকে সমৃদ্ধ করার এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক শব্দগুলোকে বিভিন্ন কায়দায় যেমন ছড়া, লিমেরিক, এমনকি প্রমিত বাংলার লেখালেখিতেও ধরে রাখার চিন্তাভাবনা আমার মাথায় রয়েছে। যার কিছু কাজ ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছি। নমুনা স্বরূপ দু’টি ছড়া ও লিমেরিক শুনিয়ে এ প্রসঙ্গ শেষ করতে চাই।

কাউয়ার খোপ

বস্তি কি অর? জংলা ঝোপ,

ঝোপের ভিতর কাউয়ার খোপ।

কাউয়ার খোপত মাইনসর ছা,

তেনা পিঁদাত উইদ্দা গা।

উয়াস্যা পেট ফুয়ানা মুখ,

মেইট্যা পাডিত কন্‌ডে সুখ।

সুখ গেইয়ে গই বর্‌ বারীত

কাউয়ার খোপত দুখর গীত

কাঁদন আছে রাঁধন নাই,

ভালবাসার বাঁধন নাই।

লিমেরিক

চাটগেঁয়েতে জ্বালানী কাঠ শুকনা হলে ণ্ড ‘দাউরগা’

যে ছেলেটি জারজ হলো সমাজে সে ণ্ড ‘জাউরগা’।

আরেক অর্থ ণ্ড ‘আউরগা’

চারটি মানে ‘চাউরগা’

যে দুর্ভাগা বউয়ের অধীন তাকে বলে ণ্ড ‘ভাউরগা’।

এক পশলা চানাস্তার পর জনাব রফিকের কাছে জানতে চাই তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠার কাহিনী। সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে শুরু করলেন তিনিণ্ড

চট্টলার কৃতী সন্তান জননেতা এম.. আজিজের হাত ধরে আমি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ অফিসে এসেছিলাম ৬৮র পয়লা জুলাই। আওয়ামী লীগের অফিস ছিল তখন ১২০, আন্দরকিল্লায়। পরবর্তীতে এই ১২০ নম্বরটি কোড নম্বরের মতো ব্যবহৃত হতো হান্ড্রেড টুয়েন্টি হিসেবে। নানা কারণে এই অফিসটি ছিল ঐতিহাসিক। আন্দোলনসংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সাংগঠনিক আলাপআলোচনা, কর্মপরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়াও অতীতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর আওয়ামী নেতৃত্ব জীবনের ষাটের দশকে এই ছোট্ট অফিসটিতে একাধিকবার পদার্পণ করেছেন এবং এমনকি এই অফিসের পেছনের কুয়োর শীতল জলে স্নানও করেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট এই অফিসের সামনের কক্ষটি ছিল আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর আর পেছনের ছোট কক্ষটি ছিল যুবলীগ ও ছাত্রলীগের। এইসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের পদভারে অফিস সর্বক্ষণ গমগম করত। অফিসে সহকারী হিসেবে পেয়েছিলাম রাউজান লেলেঙ্গারার আবু মুসা নামে এক তরুণকে, যে আগে থেকেই সেখানে ছিল।

ছেষট্টির ৬ দফা ঘোষণাউত্তর সঙ্কট পেরিয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থা তখন ভালোর দিকে। জনসমর্থন ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছিল। সে বছরই শেখ সাহেবের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জনতা দ্রুত আওয়ামী মুখী হতে থাকে। পরবর্তীতে ’৬৯এর গণঅভ্যুত্থান ও শেখ মুজিবের মুক্তি, ’৭০ এর সাধারণ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, ৭১এ ক্ষমতা হস্তান্তরে পশ্চিমাদের ধানাইপানাই, এদেশবাসীর অসহযোগ ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরু। এর প্রতিটি পর্বে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব আমি আন্তরিকতার সঙ্গে পালনে ব্রতী ছিলাম।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম জেলা ও শহর শাখা আওয়ামী ঘরানায় দুটি ধারা প্রবহমান ছিল তখন, প্রবীণদের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবেণ্ড আর নবীনদের মধ্যে প্রকাশ্যেই। তার একটি সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন চরমপন্থী আর অন্যটি শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বাধীন নরমপন্থী ধারা। চরমপন্থীরা চাইছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ত্বরান্বিত করতে আর অপর পক্ষ চাইছিলেন ধীরেসুস্থে এগিয়ে যেতে। সিরাজপন্থীদের অনেকে অনেক আগে থেকেই দেশব্যাপী যুদ্ধপ্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ‘নিউক্লিয়াস’ নামে এক গোপন সংগঠনের মাধ্যমে। চট্টগ্রামে এর নেতৃত্বে ছিলেন আবুল কালাম আজাদ। এছাড়া, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এম.. আজিজ নিজেই ছিলেন এক দফার প্রবক্তা। এদিক থেকে জেলা ছাত্রলীগাররা ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। যুদ্ধ শুরুর মাস মার্চ থেকে অবশ্য উভয় গ্রুপই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ঐক্যবদ্ধভাবে।

ঊনসত্তুরসত্তুরের সেই ভয়াল দিনগুলোতে কোন কোন সময় রাত বারটার পর ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বেরোত দল বেঁধে, সঙ্গে আমিও। কারো বগলে হাতে লেখা পোস্টারের বান্ডিল, কারো হাতে পোস্টার লাগানোর আঠার পাত্র, কারো হাতে আলকাতরার বালতি, আর কারো কাঁধে মই। পাকিস্তানী পুলিশের রক্তচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে আমরা সারা রাত চষে বেড়াচ্ছি পুরো শহর, পোস্টার লাগাচ্ছি সর্বত্র, আর আলকাতরায় দেয়াল লিখন চলছে নির্ভয়ে। আমাদের নৈশ যাত্রার শুরুটা হতো আন্দরকিল্লা’ সংগঠনের অফিস থেকে বেরিয়ে হাজারীলেনের পূর্ব মাথার শামী হোটেল কিংবা পশ্চিম মাথার কেসিদে রোডের হ্যাপী লজ থেকে কিছু মুখে দিয়ে, আর যাত্রা শেষ হতো শেষ রাত্রে কেসিদে রোড’ ইসলামিয়া হোটেলে এসে। সেখান থেকে কিছু খেয়েদেয়ে আমাদের কারো কারো বাকী রাতটা কাটতো আন্দরকিল্লার সংগঠন অফিসে। বালিশ বলতে ছিল একটাই, তাও ছিল তেল চিটচিটে। কারো মাথার নীচে পত্রিকার বান্ডিল, কারো মাথার নীচে অফিসের ফাইল। আর কেউ মাথার নীচে শুধু একটা ইট বিছিয়েই ঘুমিয়ে পড়তো।

সে সময়ের কর্মব্যস্ত দিন আর বিনিদ্র ভয়াবহ রাতগুলোর কথা মনে পড়লে এখন ভয়ে শিহরিত হই। অথচ সে সময় ডরভয় যে আমাদের কোথায় পালিয়েছিল তা ভেবে অবাক হতে হয়। সে সময় সার্বক্ষণিক একটা দ্রোহ, একটা ক্রোধ, একটা জেদ আমাদেরকে তাড়িয়ে ফিরতো, যে জন্যে কোনও ক্লান্তি ও ভয়ভীতি কাবু করতে পারেনি আমাদেরকে। এ সময় বিশেষত গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে কত যে দুঃসাহসিক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলাম তার পরিণাম ফলের কথা এখন চিন্তা করলে শরীর শিউরে উঠে। সে পরিণাম ফলের কথা তখন মনে আসলে তেমন কাজ করতে পারতাম কিনা সন্দেহ। এসব কাজের একটি যেমন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ বুলেটিন প্রকাশ। জেলা অফিসের পেছনের কুয়োর পাড়ে বারী সাহেবদের ভাড়া ঘরের দরজাজানালা বন্ধ করে স্টেনসিল কেটে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে বের করি ৪ পৃষ্ঠার ডিমাই ওয়ানফোর সাইজের সংবাদ বুলেটিন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’। ২৭ ও ২৮ মার্চ ২ দিন বের করি এ বুলেটিন। এর প্রতীকী মূল্য রাখা হয়েছিল ১০ পয়সা। আমি আর অফিস সহকারী আবু মুসা সেগুলো বিলি করেছি। ২৯ মার্চ সাইক্লোস্টাইল মেশিনটি আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভাইয়ের পাথরঘাটা’ জুপিটার হাউজের মোটর গ্যারেজে গোপন স্থানে রেখে যাই। কি‘ দুর্ভাগ্য, যুদ্ধশেষে এসে দেখি সেটি তখন মরচে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

২৯শে মার্চ হান্নান সাহেবের নির্দেশে আমি হালিশহর যাই এম.এ মজিদ এম.এন.এ এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও হালিশহর ইপিআর ক্যাম্পের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য। মজিদ মিয়া সাংকেতিক ভাষায় লেখা একটা চিরকূট দেন আমাকে, যাতে লেখা ছিল ‘লাকড়ি আছে চালডাল নাই’। তার মর্মার্থ তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে না পারলেও পরে বুঝেছিলাম গুলিগোলার প্রয়োজনীয়তার কথাই বলেছিলেন তিনি সেদিন।

চিরকূট নিয়ে বাড়িতে যাই। পরদিন ৩০শে মার্চ সকালে বের হই বাড়ি থেকে। উদ্দেশ্য, ইপিআর ক্যাম্পে টাচ্‌ দিয়ে আন্দরকিল্লা আওয়ামী লীগ অফিসে যাব। বড়পোলের উত্তরে কিছুদূর যেতেই শুরু হয়ে গেল বহির্নোঙরে অবস্থানরত পাকিস্তানী জাহাজ ‘বাবর’ থেকে কামানের গোলা বর্ষণ। তখন বেলা ১০টা উত্তীর্ণ। তাদের লক্ষ্য, ইপিআর ক্যাম্প। মারা পড়ল অনেক বেসমরিক লোক ও ইপিআর। বেলা ১১টার দিকে স্প্লিন্টারবিদ্ধ হলাম আমি। শরীরের ৩ জায়গায়, কোমরে ও বাম পায়ের উপরেনীচে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, উদ্ধারের কেউ নেই। রক্তক্ষরণ বন্ধের কিছু নেই। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়লাম ঐ উন্মুক্ত বিলে। রাতের দিকে জ্ঞান ফিরে পেলাম আপনা থেকে। সকাল হওয়া পর্যন্ত অবর্ণনীয় কষ্টে কেটেছে সে রাতটুকু। অন্ধকার রাত, রক্তের গন্ধ, অদূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাশ, পিঁপড়া, মাকড়শা, টিকটিকি ও মশার উৎপাত, ক্ষুধার জ্বালা, আঘাতের যন্ত্রণা আর সঙ্গিনযুক্ত রাইফেল হাতে টহলরত পাকিস্তানী সেনার ঠকঠক পদচারণার ভীতিকর শব্দ।

সকালে গ্রামবাসীর সহায়তায় উদ্ধার পেলাম। নেয়া হল প্রথমে অধ্যক্ষ ফজলুল হকের বাড়ি, সেখান থেকে বেগমজান প্রাইমারী স্কুলে মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসা কেন্দ্রে, সীমিত চিকিৎসা দিয়ে আনা হলো বাড়িতে। রফিক নামে আমার এক বাল্যবন্ধুর চিকিৎসা সহায়তায় বেঁচে যাই সে যাত্রা। রফিক ছিল করাচীর জিন্নাহ হাসপাতালের মেডিক্যাল এ্যাসিস্টেন্ট। ছুটিতে এসে আর যাওয়া হয়নি তার। প্রাণে বাঁচলাম বটে, তবে পায়ের অবস্থা ভাল নয়, কেটে ফেলতে হবে। এই জন্যে হাসপাতালে যেতে হবে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল হাসপাতাল তখন হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দালালদের দখলে। একাত্তরের শেষভাগে পাকিস্তান সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলো। অনেক ভেবেচিন্তে পরিচয় গোপন রেখে নভেম্বরের মাঝামাঝি গেলাম হাসপাতালে। সৌভাগ্যবশতঃ পড়লাম একজন ভালো সার্জেন ডা. করিমের হাতে। পা কাটতে হলো না। চললো চিকিৎসা। ইতোমধ্যে আর গোপন থাকলো না আমার পরিচয়। ১২ই ডিসেম্বর রাতে ভয়াবহ সংবাদটা দিল সুইপার হৃদয়ণ্ড‘সম্ভব হলে সরে যান আপনি, ওরা আপনার কথা বলাবলি করছে।’ ওরা মানে আলবদর নেতা হামিদুল কবির খোকা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। গত কিছুদিন তারা হাসপাতাল থেকে অনেককে নামিয়ে নিয়ে গেছে কাছের প্রবর্তক পাহাড়ের দিকে, ফেরত আসেনি আর তারা। সেদিন রাতটা কাটিয়ে দিলাম নির্ঘুম ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থাতেই।

সকাল হলো। ক্রাচে ভর দিয়ে নীচে নামলাম, এগিয়ে গেলাম পূর্বদিকের গেটের দিকে। গেটের পাশেই এক টেক্সি। যেন আমারই অপেক্ষায়। বললাম, চলো। ব্যাপারটি আমার কাছে অলৌকিকের মতোই মনে হয়েছে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়েই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমার গন্তব্যের কথা। বলেছিলাম, হালিশহর আনন্দ বাজার। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। সেদিন ছিল ১৩ই ডিসেম্বর, ১৯৭১।

১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে ক্রাচে ভর দিয়ে ছুটলাম চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে। সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে তখন হাজার হাজার জনতার ভিড়। তাদের সঙ্গে সামিল হলাম আমিও। ভারতফেরত হান্নান সাহেব নীচে নেমে এলেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘রফিক, তুমি বেঁচে আছো?’ কঠিনহৃদয় হান্নান সাহেবের চোখের কোণা তখন চিকচিক করছে পানিতে। সে ছিল আনন্দের অশ্রু, আর সে আনন্দ ছিল বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক বিজয়েরই আনন্দ।

১৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ অফিসের কার্যক্রম চালু হয় নূর আহমদ সড়ক’ ইয়াসমিন প্যালেস (পুরানো বিমান অফিস) এর দোতলার প্রায় পুরোটা জুড়ে। কাকতালীয়ভাবে এ ভবনের হোল্ডিং নম্বর ছিল হান্ড্রেড টুয়েন্টি ওয়ান। ক্র্যাচে ভর দিয়ে সেদিনই আমি আমার পূর্বদায়িত্বে নিয়োজিত হই। অফিসের একটি কক্ষ ছেড়ে দেয়া হয় আমার থাকা খাওয়ার জন্য।

সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের ক্ষমতাসীন দলের বৃহত্তর জেলা অফিস। তখন নেতাকর্মী ও জনসাধারণের কলরব ও পদধ্বনিতে গমগম ও রমরমা অবস্থা। আমার দেখা চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সে সময়টাই ছিল সুবর্ণ সময়। ১২০ আন্দরকিল্লা’ জেলা সংগঠনের এম.. হান্নান আর স্টেশন রোড রেস্ট হাউস’ মহানগরীর এম.. মান্নান সে বৃহত্তর জেলা সংগঠনের যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ইতিপূর্বে জেলা ও মহানগরী যথাক্রমে সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক এ দু’ ধারায় প্রবহমান ছিল প্রচ্ছন্নভাবে। আর সে জেলা ও মহানগরীরই মহাসম্মিলন গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগ অফিসে যে কয়বছর ছিলাম আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব আমি যথাযথ পালন করেছি যথার্থ আন্তরিকতার সঙ্গে। এ অফিস থেকে নামি ’৭৫এর ১৫ আগস্টের সে ভয়ঙ্কর দিনটির সকালে, যখন রেডিওতে শুনলাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে শাহাদাৎ বরণের কথা। সত্যি বলতে কি, আমি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায়। কারণ এ ধরনের অকল্পনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি ইতিপূর্বে আর কোনদিন হইনি।

আওয়ামী লীগ অফিসে থাকতেই হান্নান ভাই আমাকে চিকিৎসার জন্য লিবিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু সেটি বিলম্বিত হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের প্যারিসেই পাঠানো হয় সরকারের উদ্যোগে। ৫ মাস ছিলাম সেখানের সেঁ মরিস ও রথচিল্ড হাসপাতালে। সেখানে আমরা ৫ জন ছিলাম। প্রথম মাস আমাদেরকে ১০০ ফ্রাঙ্ক (তখন বাংলাদেশী ২০০ টাকা, বর্তমানে অবশ্য আরো বেশী) হাত খরচের জন্য মাসোহারা দেওয়া হয়। দ্বিতীয় মাসে ফ্রান্সের বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহ সাহেবসহ ফ্রান্স রেডক্রসের চেয়ারম্যান (ভদ্রলোকের নাম এখন মনে পড়ছে না) সাহেব আসেন আমাদেরকে দেখতে। আলাপকালে এক পর্যায়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের দেশের সমাজতন্ত্র কিরূপ হবে। সত্যি বলতে কি, বাংলাদেশের সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আমার তখন সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। তবুও যেটুকু আমি বুঝি সেটিই তাঁকে বুঝাবার চেষ্টা করলাম। আমার ডান হাতের পাতাটা তাঁর সামনে ধরে বললাম, দিস্‌ ইজ আওয়ার বাংলাদেশ। আঙ্গুলগুলো ধরে বললাম, এবং এগুলো হচ্ছি আমরা। আমাদের একেক জনের একেক নাম, একেক জায়গায় অবস্থান, একেক চেহারা এবং প্রত্যেকের দায়িত্বও ভিন্ন ভিন্ন। আমরা যে যার অবস্থানে সুদৃঢ়ভাবে থাকবো। দায়িত্ব পালনের ব্যাপারেও তাই হবে। স্ব স্ব স্থানে দাঁড়িয়ে স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করবো আমরা নিজেরা। আমাদের এই ঐক্যবদ্ধ কাজের ফল জমা হবে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারে। রাষ্ট্র আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখবে সমবন্টনের মাধ্যমে। সমবন্টন হবে এমনণ্ড যার যতটুকু প্রয়োজন, তাকে ততটুকুই দেওয়া, এর যেন বেশীকম না হয়। আমরা মনে করি ভবিষ্যতে এভাবেই আমরা সুখী সমৃদ্ধ একটি দেশ গড়ে তুলতে পারব।

রেডক্রস চেয়ারম্যান আমার এই নাতিদীর্ঘ বয়ানে মনে হয় খুশী হলেন এবং আমার পিঠ চাপড়ে হাসিমুখে বিদায় নিলেন সেদিন তাঁরা। দ্বিতীয় মাস থেকে দেখলাম আমার মাসোহারা ২০০ ফ্রাঙ্কে উন্নীত হয়েছে। এভাবে আমি আমাদের ৫ জনের মধ্যে অলিখিত গ্রুপ লীডার বনে গেলাম। পরে খবর নিয়ে জেনেছি, রেডক্রস চেয়ারম্যান ওই ভদ্রলোক সমাজতান্ত্রিক মনমানসিকতার লোক ছিলেন। আমাদের রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহ সাহেবেরও সুনজর ছিল আমার প্রতি। দেশের মায়ায় চিকিৎসা কিছুটা অসম্পূর্ণ রেখে আমি স্বদেশে ফিরে আসতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, থাকেন না আরও কিছুদিন। দেশে গিয়ে লিখতে পারবেন। এ ছাড়া, আপনাদের আগের ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধা আলমগীরকে আমি এখানে চাকরি নিয়ে দিয়েছি।

রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহ সাহেবের এমন আন্তরিকতাপূর্ণ কথার পরও আমার মন চায়নি প্যারিসের মতো এমন একটা সুন্দর রাজধানীতে থাকতে। দিনের বেলা ফ্রান্সবাংলাদেশ এসোসিয়েশনের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে হৈহুল্লোড় আর বেড়ানোয় চলে যেতো। রাতের বেলা কেবিনে একা হলে কেবলই ছটফট করতাম। এ অবস্থাকে কেবল হোম্‌সিক্‌নেস বলা হলে ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হবে। কারণ, আমার কেবলই মনে পড়তো, আওয়ামী লীগ অফিসের কথা। সেখানের ফাইলপত্রের কথা। আমার অনুপস্থিতিতে নেতৃবর্গের অসুবিধা হচ্ছে এসব চিন্তা। প্যারিস থেকে এসে প্রথম আমি বাড়িতে মায়ের কাছে না গিয়ে প্রথমেই উঠেছিলাম আওয়ামী লীগ অফিসে, ইয়াসমীন প্যালেসের দোতালায়। সে সব স্মৃতি কখনো বিস্মৃত হবার নয়।

দেশের অশান্ত ও ঘোলাটে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসলে আমি আত্মগোপন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসি। তখন দেখি ইয়াসমীন প্যালেসের দোতালায় আওয়ামী লীগ অফিসের যে কক্ষটি আমার থাকা খাওয়ার জন্যে বরাদ্দ ছিল, সেই কক্ষটিতে দৈনিক ইত্তেফাকের চট্টগ্রাম ব্যুরোচীফ মঈনুল আলম তাঁর বাবা মাহবুবউল আলমের দৈনিক জমানাকে সাপ্তাহিকে রূপান্তর করে প্রকাশ করছেন। সেখানে চাকরি নিলাম আমি বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে। মাস কয়েক পরে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল হারুন জামালখান রোড থেকে দৈনিক স্বাধীনতা প্রকাশের উদ্যোগ নিলে সেখানে প্রথমে প্রশাসনিক পদে এবং পরে সহসম্পাদক হিসেবে চাকরিতে নিযুক্ত হই। স্বাধীনতায় সাংবাদিকতা কালে ডাক আসে ঢাকা’ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে, ট্রাস্ট প্রকাশিত পাক্ষিক দুর্বার পত্রিকার বার্তা সম্পাদক হিসেবে। টেবলয়েড সাইজ ১৬ পৃষ্ঠার মাল্টি কালারড পত্রিকা। সম্পাদক ছিলেন মেজর এস.আই.এম. নূরুন্নবী খান। প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার, ভাস্কর্যশিল্পী শামীম সিকদার পত্রিকাটির শিল্প উপদেষ্টা। ১৬ পৃষ্ঠার টেবলয়েড সাইজ পাক্ষিক পত্রিকার বার্তাও কি, শিল্পও কি। আসলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কিছু শিল্পীসাহিত্যিকসংস্কৃতিসেবীর চাকরির সংস্থানই ছিল এ পত্রিকা প্রকাশের মুখ্য ‘উদ্দেশ্য। তবে সত্যি বলতে কি, পত্রপত্রিকায় কাজ জানা, পত্রিকা চালানোর মতো সাংবাদিক সমাবেশ সেখানে হয়নি। ফলে যা হবার তাই হলো, কয়েক সংখ্যা প্রকাশের পর অচিরেই বন্ধ হয়ে গেলো পত্রিকাটি।

পত্রিকাটি ছাপানো হতো মতিঝিল’ মধুমিতা মুদ্রণালয় থেকে। সেটি ছিল শহীদ,শেখ ফজলুল হক মনির। বাংলার বাণী ও বাংলাদেশ টাইম্‌স পত্রিকা ছাপা হতো সেখান থেকেই। দুর্বার পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে আমরা বেকার হয়ে পড়ি। দুর্বার এ্যাড নাম দিয়ে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থা দাঁড় করিয়ে তাতে দুর্বার পত্রিকার কিছু লোককে পুনর্বাসিত করা হয়। কিন্তু একটি বিজ্ঞাপন সংস্থা পরিচালনার মতো দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকের অভাব এবং কারো কারো অসততায় দুর্বার এ্যাডও টিকেনি বেশীদিন, বন্ধ হয়ে যায় আমাদের চোখের সামনেই। পরবর্তীতে আমাকে ট্রাস্টের মালিকানাধীন চট্টগ্রামের আলমাস সিনেমায় দেবার কথা উঠে। সিনেমা হলের নিম্নতম পদে চাকরির মানসিকতা আমার ছিল না। আমি দৈনিক স্বাধীনতায় আগের চাকরিতে এসে পুনর্বার যোগদান করি। পরবর্তীতে জনাব আবদুল্লাহ আল ছগীরএর সম্পাদনায় দৈনিক নয়াবাংলা প্রকাশিত হলে সেখানে যোগ দেই প্রথম দফায় সহসম্পাদক হিসেবে, পরের বারে মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্বে। নয়াবাংলায় সব মিলিয়ে বছর দশেক ছিলাম। এর পরের চাকরি দৈনিক ইত্তেফাকএর চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিসে। তখন ব্যুরোচীফ ছিলেন জনাব ওসমান গনি মনসুর, এখন যিনি দৈনিক পূর্বদেশএর সম্পাদক। আমাকে দেখতে হতো চট্টগ্রামের পৃষ্ঠা। চাকরিটির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ছিল। কিন্তু আমারই উদাসীনতা ও গাফেলতির কারণে চাকরিটি হারাতে হয়।

এরপর দৈনিক ঈশান বের হলে তাতে যোগ দেই প্রথম দফায় সহসম্পাদক হিসেবে এবং দ্বিতীয় দফায় প্রথমে সম্পাদনা সহকারী বিভাগের প্রধান ও পরে মফস্বল সম্পাদক হিসেবে। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন জনাব একেএম শাহজাহান। অর্থসঙ্কটে পড়ে শেষপর্যন্ত পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। যোগ দেই অতঃপর দৈনিক পূর্বকোণের চাকরিতে ২০০২ সালের ৮ আগস্টে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৮ তারিখে স্বাস্থ্যগত কারণে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়ে বর্তমানে অবসর জীবনযাপন চলছে।

আলাপচারিতার শেষ পর্বে এসে জানতে চাইলাম আপনার পরিচয় তো অনেক। আপনি সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ছড়াকার, গবেষক, সমাজকর্মী, মুক্তিযোদ্ধাণ্ড কোন পরিচয়টিতে আপনি গর্বিত। সহাস্যে বললেন তিনি, মুক্তিযোদ্ধা নিঃসন্দেহে আমার অহংকারী পরিচয়। তবে নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতেই আমার বেশি আনন্দ। কবি চণ্ডীদাশের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই আমিওণ্ড

শুনহে মানুষ ভাই,

সবার ওপরে মানুষ সত্য

তাহার উপরে নাই।

দীর্ঘ সময়ের এই আলাপচারিতা শেষে ধন্যবাদ বিনিময় করে উভয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

x