নুসরাত জাহান রাফি, তুইও চলে গেলি

ডা. মহসিন জিল্লুর করিম

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
66

খুব আশা করেছিলাম এ যাত্রা যে কোন ভাবেই হোক তুই বেঁচে যাবি। ভালোইতো চিকিৎসা চলছিলো কিন্তু ৮০ ভাগ পুড়ে যাওয়া শরীরে ফিরে আসাটাও কঠিন ব্যাপার ছিলো। ভেবেছিলাম ভাগ্যμমে যদি আরেকটা দিন সামাল দিতে পারতি। সিঙ্গাপুর গিয়ে আরো উন্নত চিকিৎসায় হয়তো বা বেঁচে উঠার সম্ভাবনা থাকতেও পারতো। দেশের মানুষের অন্তরের দোয়া তোর জন্য সত্যিই ছিলোরে। ছোট বড় সবাই তোর পাশে দাড়াতে চেয়েছে। চিকিৎসকদের চেষ্টারও কোন কমতি ছিলোনা। ব্যতিμম হলেও সরকারও তোর পাশে থাকতে চেয়েছে। সরকার প্রধানের কঠোর অবস্থানের কারণে তোকে যারা জ্বালিয়ে দিয়েছিলো, পার পেতে পারেনি এখনও। জানিনা ভবিষ্যতে কি হবে। তবে ওদের চেষ্টার কমতি নেই। ফাক ফোকর গলিয়ে বেড়িয়ে যেতে ওরা চাইবেই। সাগর রুনির কথা মনে পড়ে। কত কথাই না তখন বলা হয়ে ছিলো। কি হলো ? কত বছর হয়ে গেল এখন আর মনেও পড়ে না। অনেকে ভুলেও গেছেন। সাংবাদিকরেই হয়তো আর মনে নেই। যে অন্যায়ের প্রতিবাদ তুই প্রথমবার করেছিলি, ফলস্বরূপ তোর চোখে চুন দিয়ে নষ্ট করে দিতে চেয়েছিল যারা, কোন কি বিচার হয়েছিলো? না হয়নি? হতো ও না কারণ শক্তিধর ওরা। প্রশাসনিক সহযোগিতায় এবং আর্থিক সামর্থ্যের কারণে ওরা বেপরোয়া যে কোন কিছু ঘটিয়ে ফেলার সুযোগ ওদের আছে। সব মহলেই ওদের যোগাযোগ। তোকে পুড়িয়ে মেরেও ওরা পার পেয়ে যেতো। সবার মুখ বন্ধ রাখার যথেষ্ট অর্থবিত্ত ওদের ছিলো। কিন্তু ভাগ্য বোধহয় খারাপ। দেশ ব্যাপি কিভাবে যেন পুড়িয়ে মারার ঘটনাটা ব্যাপক প্রচার পায়। হয়তো অনেকটা সে কারণ বাধ্য হয়ে এবার প্রশাসন নড়ে চড়ে ওঠেছে। গা বাঁচানোর জন্য কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। বিচার না হওয়ার সংস্কৃতিতে আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে কিছু একটা কঠিন গঠলেই অস্বাভাবিক মনে হয়। গ্রেফতার আর তদন্তের খেলা ঘটনার পর পরই হার হামশেই ঘটে। কিন্তু কখনো কোনটাই আলোর মুখ দেখে না। আমরা সাধারণেরা ভাবি এটাই বুঝি আমাদের ভাগ্যের লিখন।
রাফি তুই পুড়ে মরে গিয়ে মনের ভিতরে একটা ক্ষত তৈরি করে দিয়েছিস। কিছুতেই ঘটনাটা যেনো মেনে নিতে পারছি না। গুটিকয় শিক্ষকনামধারী নরপশু শিশুদের নিয়েও কি পাশবিক চিন্তা চেতনায় গড়ে ওঠেছে। তথাকথিত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার জীবন কাহিনী পড়ে আমি শুধু শঙ্কিতই হয়নি, আগামী ভবিষ্যত প্রজন্মের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়েও প্রবল দুচিন্তা পড়েছি। ম্যানেজ করার মানসিকতা আমাদের আজ কোথায় নিয়ে গেছে। শাহাদত নামের ছেলেটাতো বলেই দিলো, চুন দিয়ে রাফির চোখ নষ্ট করে দিতে চেয়েছিলাম, কিছুইতো হয়নি আমার, এবারও ভেবেছিলাম পুড়িয়ে মারলে হয়তো কিছুদিন গা ডাকা দিয়ে থাকতে হতে পারে। সব জায়গায়তো ব্যবস্থা করাই ছিলো। মানব বন্ধন পর্যন্ত করলাম গুরুজনদের নির্দেশে। আমাদের আশ্বাস দেয়া হয়েছিল, কিছুই হবে না, সামান্য একটা মেয়ে পুড়ে মরে গেলো? কেইবা এগুলো দেখবে। দু‘একদিন চেঁচামেচি হবে তারপর ঠিকই সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। কেউ আর কিছু মনে রাখবে না। কিন্তু কিভাবে যেনো ওসব ওলোট পালট হয়ে গেলো।
রাফি, বড় হয়ে তুই কি হতে চেয়েছিলি জানি না। কিন্তু চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখে ধারণা করতে পারি এমন কিছু যা তোকে সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের কাছাকাছি নিয়ে যেতো। কিন্তু কি করবি বল এমন দেশে জন্ম হয়েছে যেখানে না আছে মনুষ্যত্বের কোন দাম না আছে মানবিকতা। অর্থ আর ক্ষমতা কাছে আমরা সবাই অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করি। আর কিইবা করার আছে আমাদের কার কাছেই বা বলতে পারি। তুইতো ওসির কাছে গিয়েছিলি, কি করলো সে, উল্টো তোকে নাজেহাল করলো। বিতর্কিত করার একটা প্রকাশ্য চেষ্টা চালিয়ে গেলো, তুইতো খারাপ ওরা ভালো এটাই প্রচার করতে চেয়েছে। গায়ে আগুন লাগিয়ে তুই নাকি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিস। অধ্যক্ষ মহোদয়ের মতো মানুষ হয় না। তোর সাথে যে সব কথা হয়েছে তা ভিডিও করে ফেইসবুকে দিয়েছে সেই ওসি। মাঝে মাঝে ভাবি এরা কি আসলেই রক্তে মাংসের মানুষ নাকি ভিন্ন গ্রহের কোন অমানুষ। এদের নিজেদের কি কোন ছেলে মেয়ে নেই, স্ত্রী নেই। যদি তাদের সাথেও এমনটা ঘটে তবে এরা কি করবে, বলে দিবে নাকি যে নিজেদের দোষেই এমনটা হয়েছে। বিচিত্র কিছু নয়। অর্থ আর ক্ষমতার কাছে ওরা এমনভাবে বিকিয়ে গেছে যে, নিজস্ব সত্তা বলে আর কিছু নেই। ওসিকে বর্তমানে সাময়িকভাবে সরানো হয়েছে। কিন্তু দিন দিন যেভাবে ক্ষণে ক্ষণে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, তাতে শঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। ওই এলাকার এক বড় কর্তা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন তোর পরিবারই এজন্য দায়ী। কারণ তারা সময়ক্ষেপণ করেছে। এটা শুরু বোধ হয়। এরপর ধীরে ধীরে সবার অজান্তে সজ্ঞানে বিষয়টাকে অগোছালো আর বিকৃত করে তুলবে যেমনটা প্রতিবারই ঘটনার পর পরই হয়। মনে আছে দিনাজপুরের সেই হতভাগী ইয়াসমিনের কথা। পুলিশের লোক তাকে ধর্ষণ করে একজন ভ্রাম্যমাণ বেশ্যা বানিয়ে ছিলো। জীবিত একজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মৃত্যুতে কালিমাও লাগিয়ে দিয়েছিলো সহজ সরল একটা নিরপরাধ একজন বালিকা মৃত্যুতে ও কলঙ্কিত হলো। সে দিন ইয়াসমিন ধর্ষিত হয়নি, ধর্ষিত হয়েছিল পুরো নারীজাতি, হয়েছিল দেশ। বিবেক।
রাফি বেঁচে গেছিস তুই। শেষ পর্যন্ত না তোকেও এমন কিছু কথা বানিয়ে দিতো। ওটাতো সহ্য করতে পারতাম না। নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য তুই যে ভাবে লড়ে গেলি, অন্যায়, অবিচারের কাছে মাথা নত না করে, নারীদের যোগ্য সম্মানের যে দাবি তুই তুলে দিয়ে গেলি একদিন কোন একনারী অবিচল থেকে সে সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাবে। নিশ্চিত থাকিস তুই। আজ না হোক কাল তোরই রক্তের বদলার প্রতিজ্ঞায় সে এগিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে অনেকেই তার সাথে থাকতে যোগাযোগ করবে। দেখিস আমি হয়তো সেদিন নাও থাকতে পারি, দুরাকাশের কোথাও হয়ত চলে গেছি। কিন্তু আনন্দ অশ্রুতে তাকিয়ে দেখবো ওরা কঠিন প্রতিজ্ঞায় এগিয়ে যাচ্ছে। যেতে ওদের হবেই, নারী আর পুরুষের থাকবে না কোন ভেদাভেদ। ক্ষমতার সমান অধিকার দাবীদার হবে নারীরাও। কেউ বিচ্যুত ঘটাতে পারবে না এ চলাকে, সেদিন হয়তো বা এখনো দূরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে ঘটবে প্রত্যাশিতভাবে এমন ঘটনা। এটা কোন রূপ কথা হয়ে থাকবে না। আজো শহরে গ্রামে কত নারীই না প্রতিদিন ধর্ষিত হচ্ছে। তার একটারও কি বিচার হয়? হয়না? গ্রাম্য সালিশে নারীর সম্র্ভমের মূল্য হয় দুই হাজার টাকা তাও আবার বাকিতে থানায় গেলে জানাতে চায় কিভাবে ধর্ষণ করেছে। তার পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দিতে বলে, এত্ততো কথার ধর্ষণ। শুনে ওরা পুলকিত হয়। বারবার শুনতে চায়। যৌন বিকৃতির নোংরা মনোবিকার, লজ্জিত, ঘৃণিত হয়ে কেউ কেউ তো আত্ম হননের পথও বেছে নেয়। এদের সংখ্যা ও কিছু কম নয়। কজনের খবরই বা পত্রিকায় আসে। নীরবে নিভৃতে ঝরে পড়ে ওরা। কারই বা কি এসে যায়। ওরাতো সমাজের নিচের তলার মানুষ এদের খোজ কেই রাখে। প্রতিনিয়ত অপমানিত হয়েও কি এরা কখনো মুখ খোলে? না খোলে না। কারণ জানে কেউই ওদের জন্য কিছু করবে না ওরাতো উচ্ছিষ্ট সমাজের কোন দায় নেই
ওদের প্রতি। মরুক বাঁচুক তাতে কি এসে যায়। ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়ার ভয় দেখিয়ে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ করেছে মানুষরূপী জানোয়ারেরা দেখতে মানুষের মতো মনে হলেও আসলেই কি এরা মানুষ। পেশী শক্তি আর শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয়ে থেকে যে কোন কিছু করার ক্ষমতা এদের আছে। রাষ্ট্র যন্ত্রের কাছাকাছি থেকে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়ে এসব দানব বড় হয়ে উঠে। সমাজে যত অনাচার, অত্যাচার, অবিচার, শাস্তি না হওয়ার আর যে কোন ভাবেই হোক পার পেয়ে যাওয়ার চলমান সংস্কৃতিতে এ দানবেরা পুরো সমাজকে তছনছ করে দেয়। অথচ যাদের দায়িত্ব এদের কঠোরভাবে দমন করার তারাই নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য এসব পশুদের লালন পালন করে বিচার হীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। সমাজের সংঘাত, হত্যা, ধর্ষণ, জমিদখল, কারণে অকারণে থাকে ইচ্ছে মারধর, ভীতিকর পরিস্থিতি মাধ্যমে ব্যক্তি বিশেষেরা সমাজে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তাদের প্রয়োজন মানব নামের দানবদের। এদের ব্যবহার করে জানান দেয় তাদের উপস্থিতি। নৈতিক অবক্ষয়, সর্বগ্রাসী ক্ষুধা, ক্ষমতার বেসামাল আচরণ, সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। একদিকে অবহেলিত লাঞ্ছিত, ধর্ষিত নারীও জনগণ। অন্যদিকে গুটিকয় স্বঘোষিত অতি ক্ষমতাবান জনগণের প্রভু। তাই সিরাজ উদ দৌলারা এখানে স্বদর্পে, স্বগর্বে বিনা বিচারে বেঁচে থেকে যায়, মর্মান্তিক কান্নার রেশ এদের স্পর্শ করে না, বরং আরো পুলকিত হয়। এতে তারা পরবর্তী শিকার ধরা প্রস্তুতিতে।
লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রাবন্ধিক

x