নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়েছিল ৫ জন

ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা

মঙ্গলবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ
642

নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন ধরানোর সময় মাদ্রাসার ছাদে পাঁচজন উপস্থিত ছিলেন বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত সংস্থা পিবিআই। তার মধ্যে অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপিও ছিলেন। মৃত্যুশয্যায় নুসরাত ঘটনাস্থলে একজনকে চম্পা নামে ডাকার যে কথা বলেছিলেন, ওই চম্পা আসলে পপি বলে এখন নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ফেনী পিবিআইয়ের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান।
দুদিন আগে সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেছিলেন, ওইদিন অন্তত চারজন বোরকা পরে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে অন্তত একজন মহিলা ছিল, এটা নিশ্চিত। তিনি গতকাল বলেন, আগুন দেওয়ার সময় প্রথমে চারজনের নাম পাওয়া গেলেও তদন্তকালে নিশ্চিত হওয়া গেছে পাঁচজন ছিল। এই পাঁচজনের মধ্যে দুজন নারী। খবর বিডিনিউজের।
এই দুই নারীরই একজন নুসরাতের মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার ভায়রার মেয়ে পপি বলে জানান ফেনীর পিবিআই কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান। এজাহারে নাম না থাকলেও যাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় আগেই। নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের করা মামলায় আসামি হিসেবে আটজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি বোরকা পরা অজ্ঞাতনামা চারজনের কথা বলা হয়েছিল।
দেহে আগুনের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে থাকার সময় নুসরাত বলেছিলেন, মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে বোরকা পরা কয়েকজন তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। মুখ ঢাকা থাকায় তাদের তিনি চিনতে পারেননি, তবে তাদের কথায় একজনকে চম্পা বলে ডাকতে শুনেছিলেন।
গত ৬ এপ্রিল এই ঘটনা ঘটার পর এই ‘চম্পা’ শম্পা নামে কেউ কি না, তা খতিয়ে দেখছিলেন পিবিআই কর্মকর্তারা; অধিকাংশ আসামিকে গ্রেপ্তার এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর এখন তারা নিঃসংশয় যে, পপিকেই সেদিন চম্পা নামে ডাকা হয়েছিল পরিচয় আড়াল করার উদ্দেশ্যে।
মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসাবে পপিকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার নাম শম্পা কি না, সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে এই পপিই শম্পা। আসামিরা শম্পা নামটি কৌশল হিসাবে ঘটনার সময় ব্যবহার করে, যা নুসরাত শুনে জবানবন্দিতে বলে। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর গত ৯ এপ্রিল পপিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতেও নেওয়ার অনুমতিও পেয়েছে পুলিশ।
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা থেকে এবার আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন নুসরাত। ৬ এপ্রিলও তার পরীক্ষা ছিল। নুসরাতের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মাদ্রাসায় যাওয়ার পর তার বান্ধবী নিশাতকে ‘ছাদে মারধর করা হচ্ছে’ বলে বোরকা পরা এক মেয়ে তাকে ছাদে যেতে প্ররোচিত করেছিলেন।
মনিরুজ্জামান বলেন, নুসরাতকে ভুয়া খবর দিয়ে ছাদে পাঠানো ওই মেয়েটি ছিল পপি। নুসরাতের পেছন পেছন ছাদে উঠে অন্যদের সহযোগিতা করেছিল সে। নুসরাত বলে গেছেন, ছাদে পরে বোরকা পরা চারজন তাকে মামলা তুলে নিতে বলে। তাতে রাজি না হওয়ায় ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, নুসরাতের গায়ে আগুন ধরানোর জন্য কেরোসিন ও বোরকা সরবরাহ করেছিলেন পপিই। প্রথমে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হলেও গতকাল পপিকেও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ছাদে পপির সঙ্গে আরো এক নারী এবং শাহাদাত হোসেন শামীমসহ তিন পুরুষ ছিলেন বলে পিবিআই কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, যারা সবাই মিলে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
নুসরাতের মাদ্রাসারই ফাজিলের শিক্ষার্থী শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি নুসরাত হত্যাকাণ্ডে যুক্ত হন বলে পিবিআই কর্মকর্তারা জানান। নুসরাতের মতো সোনাগাজীর উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামেরই যুবক শামীম। নুসরাতের গ্রামেরই আরেক যুবক ও একই মাদ্রাসার ফাজিলের ছাত্র নুর উদ্দিন এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান আসামি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শামীম ও নুর উদ্দিন ছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজের ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’। নুসরাতকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ গত ২৭ মার্চ গ্রেপ্তার হলে তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এই দুই যুবক।
ডিআইজি বনজ মজুমদার এর আগে জানিয়েছিলেন, ঘটনার দুই দিন আগে নূর উদ্দিন কারাগারে গিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজের সঙ্গে দেখা করে নির্দেশনা নিয়ে আসেন। এর পর মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে সহপাঠী শামীম, জাবেদ হোসেন, আব্দুল কাদের ও আরেকজনকে নিয়ে বৈঠক করেন নূর উদ্দিন। ওই বৈঠকেই নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা হয়।
নুসরাতের ভাইয়ের করা মামলায় আসামির তালিকায় প্রথম নামটি অধ্যক্ষ সিরাজের, তারপরই নূর উদ্দিন ও শামীমের নাম। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার সময় মাদ্রাসার ফটকে থেকে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের তদারকিতে থাকা নূর উদ্দিনকে শুক্রবার ময়মনসিংহ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আগুন দেওয়ার সময় পপি ও শামীম ছাড়া আর কোন তিনজন ছাদে উপস্থিত ছিলেন, সে বিষয়ে মুখ খোলেননি পিবিআই কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান। উপস্থিত অন্য নারীর বিষয়েও এখনি কিছু বলেতে চাননি তিনি। গতকাল সন্ধ্যায় মো. শামীম নামে ওই মাদ্রাসার এক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান মনিরুজ্জামান, যার নাম এজাহারে ছিল না। তিনি বলেন, আলোচিত এই মামলায় এ নিয়ে এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত সাতজনকে এবং এজাহারের বাইরের সাতজনসহ মোট ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হল। অধ্যক্ষ সিরাজ, নুর উদ্দিন, শামীম ছাড়া গ্রেপ্তার এজাজারভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম, মাদ্রাসাটির শিক্ষক আফছার আহমেদ, মাদ্রাসাটির ছাত্র জাবেদ হোসেন ও জোবায়ের আহমেদ। এজাহারভুক্ত আট আসামির মধ্যে হাফেজ আবদুল কাদের নামে একজন এখনও পলাতক।
পিবিআই কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। যারা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন, তারা বেশ কয়েকজনের নাম বলেছেন, যারা এই ঘটনার আগে ও পরে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেছে।
ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা
নুসরাতের জবানবন্দির ভিডিও ধারণ ও তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ায় সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। এক আইনজীবীর মামলার আবেদনের শুনানি নিয়ে গতকাল ঢাকার সাইবার আদালতের বিচারক মোহাম্মাদ আস্‌ সামছ জগলুল হোসেন পিবিআইকে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পিবিআইয়ের ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে অভিযোগ তদন্ত করে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকার শামীম আহম্মেদ জানিয়েছেন।
কাউন্সিলর মাকসুদ রিমান্ডে : নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার পৌরসভার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলমকে পাঁচদিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফ উদ্দিন আহমেদ গতকাল এই আদেশ দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে মাকসুদকে ঢাকার ফকিরাপুল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। গতকাল দুপুরে ওই আবেদনের শুনানি নিয়ে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। মাকসুদ আলম সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। নুসরাতের মৃত্যুর দুদিন পর গত ১২ এপ্রিল তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয় জেলা আওয়ামী লীগ।
দোষ স্বীকার নূর উদ্দিন ও শামীমের : এর আগে গত রোববার রাতে নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার এজহারভুক্ত দুই ও তিন নম্বর আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে ১৬৪ ধারায় তারা এ জবানবন্দি দেন।
আ. লীগের লোক না হলে এই দুঃসাহস পেত না : নুসরাত হত্যায় জড়িতরা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে দাবি করেছেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ‘লোক’ না হলে তারা এত বড় দুঃসাহস পেত না। এভাবে গায়ে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার পথ বিএনপি-জামায়াত জোটের দেখানো বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করার পর পাল্টা তার দলের দিকে এই অভিযোগ তুললেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ।

x