নুসরাতকে নিয়ে আমার কোনো লেখা নেই!

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১ জুন, ২০১৯ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ
122

প্ল্যানেট ৫০:৫০ বাই ২০৩০ : স্টেপ ইট ফর জেন্ডার ইকুয়ালিটি। এটা ছিল নারী দিবসের স্লোগান তাও ২০১৬ সালের। তার সাথে পুরুষ ও নারীর সমতাভিত্তিক পৃথিবী গড়ে তোলা হবে একদিন। এখন ২০১৯ সাল।
এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো, নারী পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো।’
আসলে ভাবতে ভাবতে দিন যাবে রাত যাবে বাস্তবতা একই রকম থেকে যাবে। সারা বিশ্বের কথা বাদ দিয়ে আমাদের দেশের দিকে তাকালেই বুঝতে হবে এটা শুধু একটা অকল্পনীয় স্বপ্ন। রাজা রাম মোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সরলা ঘোচাল, নবাব ফয়জুন নেসা, বেগম রোকেয়ার মতো মহামানবদের প্রচেষ্টায় এদেশের নারীর জন্য ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়েছে জীবনের পথ। পরবর্তীতে আরও দু’একজন এসেছিলেন সুফিয়া কামালের মতো। নারী মুক্তি, নারীর কর্মসংস্থান, নারী শিক্ষা যতটাই এগুচ্ছে নারী নির্যাতনের হারও সমান তালে বেড়ে চলেছে। নারীর নিরাপত্তা আসলে কোথাও নেই। ইদানীং বাংলাদেশের নারী ও শিশু ধর্ষণ মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জানতে পারছি কি পরিমাণ নারী ও শিশু নির্যাতিত হচ্ছে। ধর্ষণ শুধু নয় ধর্ষণ করে হত্যাও যোগ হয়েছে। ভারতে একবার একজন নার্সকে গণধর্ষণ করা হয়েছিল একটি বাসে। সেদিন সারা ভারত ফুঁসে উঠেছিল, আমাদের দেশে এই একই রকম ঘটনা বারবার ঘটছে, গণ পরিবহনে গণ ধর্ষণ এবং খুন।
অতি সম্প্রতি নুসরাতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকার একটু নড়েচড়ে বসেছে মনে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কি হবে সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
রাস্তাঘাটে হেনস্তা, গণপরিবহনে যৌন হয়রানি, অশিক্ষিত কুশিক্ষিত অসৎ চরিত্রের মানুষের স্বভাবের কথা বাদ দিলাম। শিক্ষিত, পরিলক্ষিত(?) মানুষগুলো কীভাবে এমন বুনো জানোয়ার হয়ে উঠে তাতেই অবাক হই। শিক্ষা শিক্ষকতার সাথে নৈতিকতার সহ অবস্থান প্রত্যাশিত। আমাদের সমাজের সামর্থহীন মানুষের স্বপ্নের জায়গা হলো মাদ্রাসা। খরচ কম হওয়ার কারণে অনেক ছেলেমেয়ে মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে। তাছাড়া সরকারি বিশেষ কিছু সুবিধাও রয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রতি সাধারণ মানুষের একধরনের শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাস রয়েছে। এমনও বিশ্বাস করা হয় তারা আল্লাহর কোরানের হেফাজতকারী। ইসলাম ধর্মের রক্ষক, সেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ যদি সিরাজউদদোল্লার মত চরিত্রের হয় তাহলে মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু কোথায়, শেষ ভরসাটা কার উপর? মাদ্রাসায় যে শুধু ঘটছে তা নয়। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ আসছে। নুসরাতকে নিয়ে আমার কোনো লেখা নেই। নুসরাতের মৃত্যু আমাদের কাছে অনেকটাই নৈমিত্তিক ঘটনা। একেবারে সাধারণ বিষয়। মিডিয়ায় আর কয়টা নুসরাতের গল্প ভেসে বেড়ায়? নুসরাতের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছিল নুসরাত তার প্রতিবাদ করেছিল, সোচ্চার হয়েছিল। লজ্জা ছেড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চেয়েছিল। ধর্ষকের ক্ষমতার বলয় তার জানা ছিল না। তাই তাকে পুড়ে মরতে হয়েছে। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিজেকে রাজা ভেবে বসেছিল আর মাদ্রাসাকে হেরেম। আজ পর্যন্ত ধর্ষণ পরবর্তীসহ মেয়েকে খুন করা হয়েছে সবই প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার জন্য। ধর্ষকরা লড়াকু নারীদের পছন্দ করে না। নীরবে নিভৃতে তাদের পাপাচার যারা লালন করতে পারবে তারা বেঁচে যেতে পারে। পিবিআইর তদন্তে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের করুণ ও বীভৎস বিবরণ উঠে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয় সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন নুসরাত জাহান। মামলা করার পর অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হন। কিন্তু মেয়েটির এই সাহসিকতা মেনে নিতে পারেননি অধ্যক্ষ ও তার ঘনিষ্ঠজনেরা। পরীক্ষার হল থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে মেয়েটির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, তদন্তভার পাওয়ার ১ মাস ১৯ দিনের মাথায় অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে। তদন্তে ১৬ জনের বিরুদ্ধে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। যাই হোক আপাতত এইটুকুই সান্তনা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমরা যত দ্রুত বের হয়ে আসতে পারব ততই দেশের জন্য মঙ্গল।
যৌন নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের রক্ষায় সরকার একটি যুগান্তকারী ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায় বিচারের স্বার্থে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার নারী শিশুর জবানবন্দী নেওয়ার দায়িত্ব নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুসারে বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে ওয়াকিবহাল ব্যক্তির জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করা হয়। যা অপরাধ তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রীম কোর্ট মনে করে নতুন এই নির্দেশনার ফলে যৌন নির্যাতনের শিকার নারী শিশু সহজে ও নিঃসংকোচে নির্যাতনের বর্ণনা দিতে পারবে।
গবঃড়ড় তে এ পর্যন্ত যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা মোটেই লজ্জিত হয়েছেন বলে মনে হয় না। এখনও দাপটের সাথে পুরুষের ইচ্ছেই বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সমতার পৃথিবী হতে হলে পুরুষ এবং নারীর উভয়ের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আর বিশেষ করে প্রয়োজন অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা। সরকারের শক্ত অবস্থানই পারে এই মহামারী থেকে দেশকে মুক্ত করতে।

x