নীরব ঘাতকের ভূমিকায় হিযবুত তাহরীর

ঋত্বিক নয়ন

বৃহস্পতিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ
320

নীরব ঘাতকের ভূমিকায় হিযবুত তাহরীর। ‘জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) চেয়েও ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে হিযবুত তাহরীর’- আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উল্লেখ করা হলেও সুচিন্তিত কৌশলে সুচতুরভাবে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। আইনি জটিলতায় বিচারের দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি জামিনে মুক্তির কারণে চট্টগ্রামে আবারো সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনটি। আগের মতোই তারা সক্রিয়ভাবে পোস্টার, লিফলেট বিতরণ করে সরকারবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। গত ৯ বছরে হিযবুত তাহরীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪০টি মামলা হলেও এর একটিও নিষ্পত্তি হয়নি।
সিএমপি কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপ পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ আজাদীকে বলেন, হিযবুত তাহরীর মূলতঃ স্কুল কলেজকে টার্গেট করে কাজ করে চলেছে। ফাঁক পেলেই কার্যক্রম চালাচ্ছে, আমরাও ধরছি, মামলা দিচ্ছি, এটা চলমান প্রক্রিয়া। নব্য জেএমবি বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মতো সংগঠনের দিকে মনযোগ থাকার সুযোগ হিযবুত তাহরীর নিতে পারে কিনা জানতে চাইলে জঙ্গি দমন স্পেশালিস্ট এ কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট সজাগ আছে। তাই তারা তাদের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। তা না হলে তো অনেক আগেই সুযোগ নিতো।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী কাউন্টার টেররিজম এক্সচেঞ্জে (সিটিএক্স) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হিযবুত তাহরীর আইএসের চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস যখন উন্মত্ততা এবং গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণে নৃশংসতায় ব্যস্ত, তখন হিযবুত তাহরীর খিলাফত প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি হিসেবে তাদের বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে তোলায় বিশেষ মনোযোগী। নজরদারি এড়িয়ে এরই মধ্যে ৫০টি দেশে তাদের সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করেছে। বিশ্বজুড়ে হিযবুত তাহরীরের সদস্য সংখ্যা এখন ১০ লাখেরও বেশি। আইএসের সদস্য সংখ্যাও এত বেশি নয়। এ কারণে আইএসের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে হিযবুত তাহরীরের।
সূত্র জানায়, হিযবুত তাহরীর সদস্যরা মূলত ফজরের আজানের আগে এসব পোস্টার লাগায়। তবে শুক্রবার জুমার নামাজের পর লিফলেট বিতরণের জন্য স্থানীয় পথশিশু ও মাদকাসক্ত কিশোরদের বেছে নেয়। এজন্য তারা ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেয়।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট জানায়, হিযবুত তাহরীর সদস্যরা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। তারা বর্তমানে মাঠ পর্যায়ের কর্মী সংগ্রহে গুরুত্ব দিচ্ছে। নিজেদের ‘ইসলামিক রাজনৈতিক দল’ দাবি করে আর্থিক জোগানের বিষয়ে হিযবুত তাহরীর জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি অনলাইন কনফারেন্স করে। সেখানে তারা সরকারের ‘ভালো ইমেজ’ নস্যাৎ করার জন্য নানা পরিকল্পনা করে। সংগঠনের আলোচনা ও প্রচারে ক্ষমতাসীন সরকারকে হটিয়ে ‘খোলাফায়ে রাশিদাহ’ প্রতিষ্ঠার বিষয় গুরুত্ব পায়। তাদের লক্ষ্য হলো গণতন্ত্রবিরোধী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দলে টানা। তবে মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রদের বিষয়টি বোঝানো অনেক সহজ হয়। আর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রদেরই এক্ষেত্রে বেশি সক্রিয় দেখা যায়। কাউন্টার টেররিজমের এক সদস্য বলেন, তারা চরম পর্যায়ের রেডিকেলাইজেশনের মাধ্যমে সদস্যদের প্রস্তুত করছে। তারা আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতিও নিতে পারে। এছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিরা হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে মিশে নাশকতা চালাতে পারে।
এদিকে বিগত ২০১০ সাল থেকে গত নয় বছরে চট্টগ্রামে হিযবুত তাহরীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ৪০টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ২০১৩ সালে সবোচ্চ ১৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। আর এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে হিযবুত তাহরীরের ১২৬ জন সক্রিয় সদস্যকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব মামলার একটিরও বিচার শেষ হয়নি। পাশাপাশি জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছে অধিকাংশ হিযবুত তাহরীর সদস্য। সিএমপি’র অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান আজাদীকে বলেন, ৩২ টি মামলার মধ্যে দুইটি মামলা এখনো তদন্তাধীন আছে। আর বাকি মামলাগুলোর চার্জশিট চলে এসেছে। এগুলো বিচারাধীন আছে।

x