নিয়ম লঙ্ঘন করায় ৮০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শো’কজ

রতন বড়ুয়া

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ
543

চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য যথারীতি রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণ বাবদ ফি পরিশোধ করলেও পরীক্ষার আগের রাত পর্যন্ত প্রবেশপত্র পায়নি ১৩ জেএসসি পরীক্ষার্থী। গত বছরের (২০১৮ সালের) জেএসসি পরীক্ষায় নগরীর চেরাগী পাহাড়ের কদম মোবারক এম ওয়াই উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনা এটি। কেবল স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতেই এসব শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন থেকে মূল্যবান একটি বছর ঝরে যাওয়ার উপক্রম হয়। ১ নভেম্বর জেএসসি পরীক্ষা শুরুর আগের রাতে (৩১ অক্টোবর) এসেও প্রবেশপত্র না পেয়ে ওই দিন সন্ধ্যায় স্কুল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ- সারাবছরের বেতন-ফি’র পাশাপাশি জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে রেজ্রিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণ বাবদ ফিও পরিশোধ করা হয়। কিন্তু বাকীরা পেলেও ১৩ জন পরীক্ষার্থী জেএসসির রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশ পত্র পায়নি। পরে জানা যায়- অন্যদের ফরম পূরণ হলেও ১৩ শিক্ষার্থীর জেএসসির ফরম পূরণ হয়নি। এমনকি এসব শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশনও সম্পন্ন করেনি স্কুল কর্তৃপক্ষ। অথচ রেজিস্ট্রেশন ও পরীক্ষার ফরম পূরণ ফি বাবদ বরং বোর্ড নির্ধারিত ফি’র বেশি-ই আদায় করা হয় এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে। এ নিয়ে পরীক্ষা শুরুর দিন (১ নভেম্বর) দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় ‘স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, পরীক্ষার আগের রাতেই স্বপ্নভঙ্গ ১৩ জেএসসি পরীক্ষার্থীর’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওই ১৩ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ দেয় শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষা শুরুর দিন (১ নভেম্বর) সকালে হাতে লেখা প্রবেশ পত্র তৈরি করে দেয়া হয় এসব শিক্ষার্থীকে। হাতে লেখা ওই প্রবেশপত্র দিয়েই অবশেষে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৩ শিক্ষার্থী।
শিক্ষাবোর্ড সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে- কেবল এ স্কুলই নয়, পাবলিক পরীক্ষার ফরম পূরণে নিয়ম লঙ্ঘনের তালিকায় থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নেহাত কম নয়। প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় এ ধরণের গাফিলতির ঘটনা ঘটছে। এ ধরণের গাফিলতিতে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় শিক্ষার্থীকে। আর দুর্ভোগ-ভোগান্তি পোহাতে হয় শিক্ষাবোর্ডকে।
শিক্ষাবোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন- পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়। বিলম্ব ফি ছাড়া, বিলম্ব ফিসহ এবং সবশেষে বিশেষ অনুমতিতে এই ফরম পূরণের সুযোগ দেয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে ফরম পূরণের তথ্যের ভিত্তিতেই বিজি প্রেসে বিষয় ভিত্তিক ও কেন্দ্রভিত্তিক প্রশ্নপত্রের চাহিদা পাঠাতে হয় শিক্ষাবোর্ডকে।
বোর্ডগুলোর এই চাহিদার প্রেক্ষিতেই প্রশ্নপত্র ছাপানো, প্যাকেজিং, নিরাপত্তা খামে ঢুকানো এবং ট্রাংকবদ্ধ করা হয়। যা পরে জেলা-উপজেলার ট্রেজারিতে পৌছাঁনো হয়। এক একটি পাবলিক পরীক্ষা মানেই যেন বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। যার কারণে পরীক্ষা শুরুর আগে নির্দিষ্ট কিছু সময় হাতে রেখেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয় শিক্ষাবোর্ডগুলোকে। তাছাড়া প্রশ্নপত্র ছাপা শেষে ট্রাংকবদ্ধ করার পর নতুন করে প্রশ্নপত্র ছাপানোর আর সুযোগ থাকে না। এজন্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফরম পূরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নির্দেশনা দিয়ে থাকে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দফায় দফায় সুযোগ দেয়ার পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফরম পূরণ সম্পন্ন না করে পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে আবেদন করে বসে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমনকি পরীক্ষার আগের দিন এবং পরীক্ষার দিনও ফরম পূরণ করতে হয় শিক্ষাবোর্ডকে।
এতে ঝামেলার পাশাপাশি প্রশ্নপত্র সংকটের শঙ্কায়ও পড়তে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন গাফিলতির বিষয়টি পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত নিয়মের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন বলছে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ।
২০১৮ সালের জেএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে নিয়ম না মানা এমন ৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শোকজ করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড। ব্যাখ্যা প্রদানে ৭ কর্মদিবসের সময় দিয়ে গত ২৬ ডিসেম্বর ব্যাখ্যা তলব করে এ চিঠি ইস্যু করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে ফরম পূরণ না করে পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টির দায়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কেন গ্রহন করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে চিঠিতে। ৮০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শোকজের তথ্য নিশ্চিত করেছেন শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম। বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন- বোর্ডের শৃঙ্খলা কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। তাদের ব্যাখ্যা পাওয়ার পর সেগুলো পরবর্তী শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করা হবে জানিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে শৃঙ্খলা কমিটিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও জানান শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম।
শিক্ষাবোর্ড সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে- ২০১৮ সালের জেএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে গত বছরের ১৭ জুলাই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী- ৩০ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিলম্ব ফি ছাড়া ফরম পূরণের সুযোগ দেয়া হয়। বিলম্ব ফিসহ ফরম পূরণের সময়সীমা ছিল ৬ আগস্ট থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত। এরপরও বাদ পড়াদের সুযোগ দিতে বিশেষ অনুমতি সংক্রান্ত আরো একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শিক্ষাবোর্ড। ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশেষ অনুমতিতে ফরম পূরণের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু বিশেষ অনুমতির সুযোগেও ফরম পূরণ সম্পন্ন করেনি এই ৮০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরীক্ষার আগ মুহূর্তে এসে (২৫ অক্টোবরের পর) শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণে আবেদন করে বসে এসব প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতির কারণে ২৫ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর, এমনকি পরীক্ষার দিন (১ নভেম্বর) সকালেও ফরম পূরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র দিতে হয়েছে শিক্ষাবোর্ডকে।
শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান বলছেন- মানবিক দৃষ্টিকোণ বা
অন্য কোন কারণে পরীক্ষার আগ মুহূর্তে কিছু শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ হলো ঠিকই, কিন্তু তাদের জন্য প্রশ্নপত্র পাওয়া যাবে কোথা থেকে। মোটকথা নির্ধারিত সময়ে ফরম পূরণ না করে পরীক্ষার আগমুহূর্তে ফরম পূরণ করতে গেলে গোটা পরীক্ষায় এক ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ফলাফল তৈরিতেও জটিলতা দেখা দেয়। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফরম পূরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বোর্ডের পক্ষ থেকে বারংবার নির্দেশনা দেয়া হয়, অনুরোধ জানানো হয়। বোর্ডের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি দৈনিক পত্রিকায়ও এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এরপরও কিছু প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের বাইরে গিয়ে পরীক্ষার আগমুহূর্তে এসে ফরম পূরণের আবেদন নিয়ে আসে। এটি পরীক্ষা পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে বলেও মন্তব্য করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান।
শোকজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানসমূহ: ফরম পূরণে নিয়ম লঙ্ঘন করায় শোকজ পাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- কদম মোবারক এমওয়াই উচ্চ বিদ্যালয়, বাকলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, হাসনেহেনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ছাফা মোতালেব হাই স্কুল, কেলিশহর উ:বি:, হালিশহর বেগমজান উ: বি:, সরাই পাড়া হাজী আব্দুল আলী সরকারি প্রা: বি:, হালিশহর মেহের আফজল উ: বি:, পূর্ব কোদালা এম এ তাহের উ:বি:, বটতলী শাহ মোহছেন আওলিয়া উ: বি:, ডনবস্কো উ: বি:, ধুরং আদর্শ (পাইলট) উ: বি:, পাঁচলাইশ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উ: বি:, দক্ষিণ পূর্ব সন্দ্বীপ উ: বি:, আশেকান আউলিয়া আবদুস মোনায়েম উ:বি:, চকরিয়া কেন্দ্রীয় উ:বি:, হাজী চান্দ মিয়া সওদাগর উ:বি:, রাঙ্গুনিয়া মজুমদারখীল উ:বি:, রুমখাঁপালং উ:বি:, পশ্চিম গোমদন্ডী ইউনিয়ন উ:বি:, সীতাকুণ্ড বালিকা উ:বি:, সাদেক মস্তান (র:) উ:বি:, রাজানগর আর এ বি এম বহুমুখী উ:বি:, পালাকাটা উ:বি:, ইলিশিয়া জমিলা বেগম উ:বি:, চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন উ:বি:, ফাইতং উ:বি:, ভূজপুর ন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ, দেওদীঘি কে এম উ:বি:, আলহাজ্ব এম এ সালাম উ:বি:, মাইনীমুখ মডেল হাই স্কুল, শ্রী অরবিন্দ উচ্চ বালিকা বিদ্যাপীঠ, খাসখামা বালিকা উ:বি:, মরিচ্যা পালং উ:বি:, হাটহাজারী পার্বতী মডেল সরকারি উ:বি:, এ জে চৌধুরী বহুমুখী (কৃষি) উ:বি:, গাছুয়া আদর্শ উ:বি:, কঙবাজার প্রিপ্যারেটরি উ:বি:, মেরীন একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ, হাসনাবাদ মদিনাতুল আরব উ:বি:, রাউজান আর আর এ সি মডেল সরকারি হাই স্কুল, পিএইচ আমিন একাডেমী, ঘাগড়া উ:বি:, সাধনপুর পল্লী উন্নয়ন উ:বি:, সেন্টার ভ্যালী স্কুল, রাবেতা মডেল উ:বি:, রোয়াংছড়ি সরকারি উ:বি:, তিনটহরী উ:বি:, বান্দরবান সরকারি উ:বি:, সানুয়া (কাদেরীয়া) উ:বি:, বাঙ্গালহালিয়া উ:বি:, রুমা সরকারি উ:বি:, তবলছড়ি কদমতলী উ:বি:, মীরসরাই পাইলট মডেল উ:বি:, দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলাম বারী মডেল উ:বি:, মহালছড়ি সরকারি উ:বি:, দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমান উ:বি:, আবু তোরাব বহুমুখী উ:বি:, মির্জাখীল উ:বি:, নাটমুড়া পুকুরিয়া উ:বি:, ফতেপুর বহুমুখী উ:বি:, আবুল কাশেম উ:বি:, জালিয়া পালং উ:বি:, কুসুমপুরা উ:বি:, ঈদগাহ আদর্শ উ:বি:, বাঁশখালী বঙ্গবন্ধু উ:বি:, বঙ্গবন্ধু বাংলা বিদ্যাপীঠ, হাতেখড়ি স্কুল এন্ড কলেজ, বালাঘাটা বিলকিছ বেগম উ:বি:, মিঠানালা রাম দয়াল উ:বি:, কমর আলী ইউনিয়ন উ:বি:, ছমদর পাড়া বহুমুখী উ:বি:, রামু ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, চংড়াছড়ি নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হিলভিউ পাবলিক স্কুল, মহালংকা উ:বি:, নুনছড়ি উ:বি:, কুতুবদিয়া আদর্শ উ:বি:, সরফভাটা ইউনিয়ন উ:বি: এবং টেকনাফ পাইলট উ:বি:।

- Advertistment -