নিষেধাজ্ঞাতেও থেমে নেই ব্যাটারি রিকশা

ইকবাল হোসেন

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৩:৪৪ পূর্বাহ্ণ
257

নগরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ব্যাটারিচালিত রিকশা। চলাচলে স্থায়ীভাবে বন্ধে উচ্চ আদালতের আদেশ থাকার পরেও বন্ধ হয়নি ব্যাটারি চালিত রিকশার চলাচল। এতে কিছু পুলিশ সদস্যের পোয়াবারো হয়েছে। ব্যাটারি রিকশার বেপরোয়া চলাচলে নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকায় যেমন যানজট তৈরি করছে, তেমনি বাড়ছে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারও।
এ বিষয়ে নগর ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীতে কিছু ব্যাটারিচালিত রিকশা চললেও তা মোটাদাগে নয়। পিডিবি বলছে, যেসব গ্যারেজে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে অবৈধভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয় সেগুলোতে অভিযান চলছে।
জানা যায়, নগরীর মূল সড়ক থেকে অলিগলিতে চলাচল করছে প্রায় ২০ হাজার ব্যাটারি চালিত রিকশা। আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর কিছুদিন বন্ধ থাকলেও এখন পুলিশের নাকের ডগায় কিংবা পুলিশকে ম্যানেজ করতে চলছে এসব যান।
সূত্রে জানা গেছে, ব্যাটারি চালিত রিকশার চলাচল নিয়ে ২০১১ সাল থেকে উচ্চ আদালতের একাধিক রিট মামলা ছিল। পক্ষ-বিপক্ষে একাধিক বেঞ্চে কয়েকদফা স্থগিতাদেশের পর দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ২৯ এপ্রিল ব্যাটারি চালিত রিকশা মালিকদের পক্ষে করা রিট খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট বেঞ্চ। এরপর আপিল বিভাগে গেলে সবগুলো রিটই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ওই বছরের ২৪ জুন খারিজ করে দেন। এরপর থেকে নগরী থেকে ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছুদিন যেতে না যেতে নগরীতে ফিরে আসে ব্যাটারি চালিত রিকশা। সর্বশেষ গত বছরের ২৫ অক্টোবর উচ্চ আদালতের আরেক আদেশে নগরীতে ব্যাটারি চালিত রিকশা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে নগর পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপরে মূল সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ হলেও কিছু দিন না যেতেই আবারো পুলিশি সহযোগিতায় এসব ব্যাটারি রিকশা মূল সড়কেও অবাধে চলাচল করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর আন্দরকিল্লা-কোতোয়ালী-নিউ মার্কেট, হালিশহর, দেওয়ানহাট-পাহাড়তলী-হালিশহর রোড, চকবাজার-বাকলিয়া-রাহাত্তার পুল, হিলভিউ আবাসিক থেকে মুরাদপুর, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক, মেয়র গলি থেকে বায়েজিদ, আন্দরকিল্লা হতে সিরাজদ্দৌলা রোড হয়ে চকবাজার, কে বি আমান আলী রোড, আন্দরকিল্লা- কাটাপাহাড়-টেরি বাজার-কালামিয়ার বাজার, নতুন ব্রিজ- নিউ মার্কেট, নিউ মার্কেট- জুবিলী রোড হয়ে মেহেদিবাগ, আগ্রাবাদ সিডিএ, খুলশী ঝাউতলা ওয়ারলেস, চান্দগাঁও- শেরশাহ, ফিরোজশাহ এলাকায় নির্বিঘ্নে চলাচল করছে ব্যাটারি চালিত রিকশা। এসব সড়কগুলোতে বেশিরভাগ সময়ে ব্যাটারি রিকশার কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে।
ব্যাটারি রিকশা চালকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নগরীতে ব্যাটারি রিকশা চলাচল করতে কিছু কিছু স্থানে বাধায় পড়তে হয়। অনেক সময় ব্যাটারি খুলে নিয়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সার্জেন্ট না থাকলে ট্রাফিককে ৫০ টাকা থেকে ২শ টাকা, ক্ষেত্র বিশেষে তিন থেকে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে ব্যাটারি রিকশা ছেড়ে দেন। নগরীর বাকলিয়া, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, পাহাড়তলী, আমবাগান, হালিশহর এলাকায় ব্যাটারি চার্জের অনেক গ্যারেজ রয়েছে। অপেক্ষাকৃত গিঞ্জি এলাকার টিনশেড গ্যারেজে লাইন ধরে ব্যাটারি রিকশা চার্জ দেওয়া হয়।
নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকায় কামাল উদ্দিন নামের এক ব্যাটারি রিকশা চালক বলেন, নগরীতে ব্যাটারি রিকশা চালাতে আগের মতো বাধার মুখে পড়তে হয় না। আমরা টোকেন নিয়ে রিকশা চালাই। আবার মাঝেমধ্যে ট্রাফিকরা গাড়ি ধরে। তাদের ৫০-১০০ টাকা দিলে ছেড়ে দেয়।
প্যাডেল চালিত রিকশা মালিক পরিষদের ওয়াজিউল্লাহ বলেন, চট্টগ্রামে একসময় স্টিকারের প্লেট বিক্রি করতো একটি সিন্ডিকেট। আমরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। এখন সর্বশেষ রায়েও উচ্চ আদালত থেকে ব্যাটারি রিকশা চলাচলে স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। কিন্তু যারা আদালতের আদেশ প্রতিপালন করবেন, সেই পুলিশই আদালতের আদেশ প্রয়োগ করছেন না। তিনি বলেন, আগে অলিগলিতে চললেও এখন নগরীর জনবহুল এলাকাতেও ব্যাটারি চালিত রিকশা চলছে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজারের অধিক ব্যাটারি চালিত রিকশা চট্টগ্রাম শহরে চলাচল করছে।
পিডিবি দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার প্রবীর কুমার সেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ চুরি অনেক কমে গেছে। এখন চট্টগ্রামে সিস্টেম লস মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ। তবে কিছু এলাকায় অবৈধভাবে ব্যাটারি রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। মঙ্গলবার ষোলশহর এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি রিকশা ব্যাটারি জব্দ করা হয়েছে। নগরীতে যারা এসব গ্যারেজ গড়ে তুলছে তাদের বিরুদ্ধেও আমরা ব্যবস্থা নেব।
নগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক আজাদীকে বলেন, অস্বীকার করার উপায় নেই, মহানগরীর কয়েকটি স্পটে ব্যাটারি রিকশাসহ অবৈধ অটোরিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে কিছু পুলিশ সদস্যের হাত রয়েছে। তারপরেও সিএমপি থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। ব্যাটারি রিকশা বন্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে থাকে।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মূলত যে পরিমাণ ব্যাটারি রিকশা নগরীতে চলাচল করছে, সে পরিমাণ রিকশা জব্দ করে রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা সিএমপির নেই। আবার জব্দ করার সাথে সাথে এসব রিকশা ধ্বংস করা যায় না। আদালতের আদেশ পেতেও সময় লাগে। যে কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় ব্যাটারি চালিত রিকশা জব্দ করা সম্ভব হয় না।

x