নিশ্চিত করতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অবকাঠামো

৬৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে

শনিবার , ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৪:১২ পূর্বাহ্ণ
38

প্রাথমিক শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ, কমছে ঝরে পড়ার হারও। তবে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার এ সাফল্য থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুরা। গবেষণার তথ্য বলছে, বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী প্রতিবন্ধী শিশুদের ৬৫ শতাংশই বিদ্যালয়ে যায় না। আর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশই এখনো শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে কুড়িগ্রামের বেশ কয়েকটি হতদরিদ্র পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে ‘হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুসন (এইচআই) বাংলাদেশ প্রোগ্রাম’। এ প্রকল্পের প্রভাব নির্ণয়ের লক্ষ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রাথমিক পর্যায়ের একটি বেজলাইন পরিচালনা করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার’ (এইচডিআরসি)। গবেষক দলের নেতৃত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ‘র‌্যানডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল অব দ্য ডিজঅ্যাবেলিটি ইনক্লুসিভ প্রভার্টি গ্র্যাজুয়েশন মডেল বেজলাইন রিপোর্ট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রাম জেলার দুটি উপজেলায় প্রতিবন্ধী রয়েছে এমন ৬৮৬টি হতদরিদ্র পরিবারে জরিপ চালিয়ে এসব পরিবারের প্রতিবন্ধী ও অন্য সদস্যদের শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও আয় বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, এসব পরিবারের ছয় থেকে ১৪ বছর বয়সি বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে ৬৫ শতাংশই স্কুলে যাচ্ছে না। এছাড়া এসব পরিবারের মোট প্রতিবন্ধীর ৭৫ শতাংশ কখনো বিদ্যালয়ে যায় নি। আর শিক্ষার আওতায় আসা ৩৫ শতাংশ প্রতিবন্ধীর ১৫ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা আবার স্বাক্ষর জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ। জরিপে অংশ নেয়া বেশির ভাগ বয়স্ক প্রতিবন্ধী বলেছেন, তারা কখনও বিদ্যালয়ে যান নি। আর বিদ্যালয়ে যাওয়াদের সর্বোচ্চ গণ্ডি প্রাথমিকেই সীমাবদ্ধ। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
উপর্যুক্ত খবরটিতে দেশের প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষার্থী ও বয়স্ক প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা খুবই হতাশাজনক। দেশের প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষার্থীরা দারিদ্র্য, অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। আর এসব কারণে তারা মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে এখনো চরমভাবে পেছনে পড়ে আছে। উপরন্তু সরকারি বেসরকারি কোন সংস্থার কাছেই সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় এদের জন্য কোন কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করাও সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন রকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। তবে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার বিষয়টি সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত। প্রচলিত আইন ও বিভিন্ন ধরনের বিধিমালার ভিত্তিতে তারা এসব প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষার বিষয়টি পরিচালনা করছে। প্রতিবন্ধী শিশু কিশোরদের শিক্ষা লাভের সহায়তায় সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০০৮ অনুযায়ী এসব শিশুর উপবৃত্তি দেওয়ার কর্মসূচি প্রবর্তন করেছে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত শিক্ষা কর্মসূচিতে এসব শিশু অংশ নিতে পারে না। এমনিতেই তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম, তার ওপর তাদের সাধারণ শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় না এনে ভিন্ন ধরনের নামমাত্র শিক্ষা ব্যবস্থায় এনে নতুন করে অক্ষমতায় ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা খুবই ব্যয়বহুল এবং বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় কঠিনও বটে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান বিদ্যালয়গুলোতেই প্রতিবন্ধী সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তুলে পাঠদান করা যেতে পারে। বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এ নীতিতেই তাদের স্কুল-কলেজ এমন কি যাতায়াত অবকাঠামো গড়ে তোলে। এতে প্রতিবন্ধীরা নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে না। বাংলাদেশে এক সময় প্রতিবন্ধীদের সমাজ ও পরিবারের গলগ্রহ মনে করা হতো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রতিবন্ধীরা এখন সমাজের মূলধারায় চলে আসতে শুরু করেছে। এজন্য বর্তমান সরকার ও অটিজম বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী সালমা ওয়াজেদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতিবন্ধীদের জন্য বর্তমান সরকার আইন তৈরিসহ নানা উদ্যোগের ক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা এদেশে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমান সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ফলেই প্রতিবন্ধীদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের পাশাপাশি সাধারণ স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ দানের ক্ষেত্রটি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিবন্ধীরা রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা যেমন পাচ্ছে তেমনি সমাজের বিভিন্ন পেশা-শ্রেণির মানুষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসছে। সরকারের সদিচ্ছার কারণে বর্তমানে প্রতিবন্ধী সন্তানের লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যরা ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তবে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা শোনা যায়। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে পিছিয়ে পড়া শিশুগুলো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস। প্রতিবন্ধীদের মূল ধারার শিক্ষায় সংযুক্তি ঘটাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেই পাঠদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী বাসস্থানের পর সবচেয়ে বেশি সময় কাটাই স্কুলে। তাই বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সুবিধাদি একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের সব বিদ্যালয়ে এখনও পর্যন্ত শারীরিক প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী র‌্যাম্প বা ঢালু সিঁড়ির ব্যবস্থা নেই। এজন্য হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়ছে। সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ইসারা ভাষার ব্যবস্থা করা দরকার। এছাড়া সরকারের আরেকটি করণীয় হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকগুলো ব্রেইলে প্রকাশ করা। সম্প্রতি সরকার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা করা হয় নি। এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু নির্দেশ দিলেই তা কার্যকর করা অসম্ভব। এখনো শ্রেণিকক্ষে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর লিখন সমস্যা রয়েছে। এসবের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আওতায় আনতে হলে সরকারকে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা ও আহ্বান বাস্তবায়ন করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের এগিয়ে আসা খুবই দরকার। এতে প্রতিবন্ধীরাও যে যার সাধ্যমত সামাজিক কাজ করতে উৎসাহিত হবে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রাম পর্যায়ে বিশেষ শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল স্থাপনসহ যে বিদ্যালয়গুলো এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে তাদের মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করতে পারলে বাংলাদেশের উন্নয়নের চলমান প্রবাহ আরো বেগবান হবে।

x