নির্যাতিত হয়ে প্রবাসী নারী শ্রমিকরা দেশে ফিরছেন ॥ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিন

রবিবার , ৩ জুন, ২০১৮ at ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ
81

ভালো বেতনের প্রত্যাশায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা। গৃহকর্মী হিসেবে অনেকের কাজও জুটে যাচ্ছে। এরপরই শুরু হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অনেকেই পালিয়ে শরণাপন্ন হচ্ছেন দূতাবাসের। বিদেশ পাড়ি দেয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আবার শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও শুধু সৌদি আরব ও ওমানের সেফ হোমে আশ্রয় শেষে ফিরতে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ নারী শ্রমিককে। তার আগের বছর এ প্রক্রিয়ায় ফিরতে হয়েছিল ১ হাজার ৩৬২ নারী শ্রমিককে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।

খবরে আরো বলা হয়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরির জন্য বিদেশ যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন মোট ৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৩৬ জন নারী শ্রমিক। এদের মধ্যে ৩১ দশমিক ২৩ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে। বাকিদের মধ্যে ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে, ১৮ দশমিক ২৩ শতাংশ জর্দানে, ১৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ লেবাননে ও ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ পাড়ি দিয়েছেন ওমানে। জর্দানে ও লেবাননে পোশাক কারখানায় কাজ করলেও এখনো গৃহকর্মী হিসেবে পাড়ি দিচ্ছেন বাংলাদেশি নারীরা। এর বড় অংশকে আবার অল্প দিনের মধ্যেই ফিরেও আসতে হচ্ছে খালি হাতে।

নারীরা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এমন দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। সবচেয়ে বেশি শিকার গৃহকর্মীরা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক নারী কর্মীকে নির্যাতনের পর চাকরিদাতা হুমকি দিয়েছেন, ‘তোমাকে আমরা কিনেছি, অভিযোগ করবে না’ এ থেকেই স্পষ্ট, প্রবাসে নারী কর্মীদের সঙ্গে কী নির্মম আচরণ করা হয়, দেশে ফিরে অনেক নারী কর্মী যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার কাছে মধ্যযুগীয় দাসপ্রথাও হার মানে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ডে নিম্ন মধ্যম আয় ও জাতিসংঘের নির্ধারিত উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে রেমিটেন্স আয়ের ওপর গুরুত্বারোপ জরুরি। সেই সঙ্গে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করাও গুরুত্বপূর্ণ। আর তা করতে হলে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিকল্প নেই। বিদেশের কর্মক্ষেত্র নারীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সেটা বন্ধ করা ঠিক হবে না। আবার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তাদের বিদেশে পাঠানোও উচিত হবে না। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন সৌদি আরব থেকে বাসার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের ফেরত নিয়েছে। নেপাল সরকার ৩০ বছরের নিচের নারীদের মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ভারতে আগে থেকেই এ ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু এ স্পর্শকাতর বিষয়ে যতটুকু সচেতনতা প্রয়োজন ততটুকু সচেতন আমরা হতে পারি নি। বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশ, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার সময় নারীদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বৈধ তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সঠিক নিয়মে ও নিরাপদ উপায়ে বিদেশ গমন নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে। বিদেশ গমনেচ্ছু নারী শ্রমিকদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশ পাঠানো উচিত। হংকং, থাইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যে রকম করা হচ্ছে। তবে এ মুহূর্তে অদক্ষ শ্রমিকদের পরিবর্তে দক্ষ ও কমপক্ষে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নারী শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করায় যথাযথ, যাতে তারা খুব সহজেই সেখানকার পোশাক শিল্প, সেবা প্রতিষ্ঠান ও আরো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কিছুটা হলেও সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত হতে পারেন।

অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বিদেশে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন অনেক নারী। উদয়াস্ত খেটেও ন্যায্য বেতন পান না, ঠিকমত খাবারও জোটে না অনেকের। নিশ্চিত হয় না নিরাপদ বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধা। সরকারকে এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য এজেন্সি, লেবার উইংস ও দূতাবাসগুলোকে আরো আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। নিয়োগদাতা দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসে রাখতে হবে সেন্টার হোমের ব্যবস্থা। সৌদি আরবে কাজে যেতে ইচ্ছুক নারীদের জন্য সেলফোন ব্যবহার, নিজেদের পাসপোর্ট নিজেদের সঙ্গে রাখা এবং ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন সুবিধার কথা বলছে সরকার। এসব বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে কাজে গিয়ে নির্যাতনের শিকার নারী অভিবাসীদের সহায়তার জন্য আলাদা সেল গঠন করতে পারে সরকার। জাতিসংঘ কনভেনশন ও সিডও সনদের যথাযথ প্রয়োগ প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। আর এ দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই। অনিরাপদভাবে বিদেশে যাওয়া নারীদের সুসংগঠিত নীতি ও কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপত্তা দিতে হবে।

x