নির্যাতন গৃহস্থালি কাজের অংশ কি?

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ৯ জুন, ২০১৮ at ৯:১২ পূর্বাহ্ণ
11

আমাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন আইন ২০১৩ কি বলে-

বহুকালের রক্ষণশীল একটা দেশে বহুকাল ধরে নীরবে, গোপনে নারী নিপীড়ন তবে নিশ্চয়ই ছিল! নইলে হঠাৎ আইনের প্রশ্ন কেন এলো? সোজা কথায় ঘোর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী পণ্য; তার সম্ভ্রম হরণ বা হনন তুচ্ছ বিষয়। সুরক্ষিত স্বদেশি নারী যাদের কাছে নিরাপদ নয় আমাদের অবলা, অসহায় গৃহকর্মী তাদের দৃষ্টিতে কী, সহজেই তা অনুমান করা যায়।

খবরটা সাম্প্রতিক। মনসুর আলী ওভারসিজ অ্যান্ড ট্রাভেলস এজেন্সির মাধ্যমে গত সাড়ে তিন মাসে দেশের ৭টি জেলা থেকে পাঠানো ন’জন নারী সৌদি আরবের দাম্মামের খোবার এলাকার একটি ক্যাম্পে অবরুদ্ধ অবস্থায় দেশে ফেরার দিন গুণছে। গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যোগদানের পরপর এরা নানারকম নির্যাতনের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং হাসপাতালে এদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ সুস্থ হবার আগেই এদের ক্যাম্পে পাঠানো হয়। হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড হেলথ ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী সোনিয়া দেওয়ান প্রীতির মাধ্যমে এই নারীরা আরববাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিসে কিছু তথ্য পাঠায়। প্রীতি জানান বিষয়টি জানার পর তিনি সৌদি আরবে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে যোগাযোগ করেন। ভিকটিমদের স্বজনদের মাধ্যমে সেখানকার ভিডিও, ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে কনস্যুলেট অফিসে পাঠান তিনি। ভিডিও দেখে সেখান থেকে প্রীতিকে নিশ্চিত করা হয় যে ওই নারীরা দাম্মামের খোবার ক্যাম্পে রয়েছেন। রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর (শ্রম) সারওয়ার আলম বলেন, ওই নারী শ্রমিকদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়া হয়েছে। তাদের ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে। (দৈনিক সমকাল, ১৯..২০১৮) আমরা এদের ফেরার প্রতীক্ষায় রয়েছি।

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবের সঙ্গে নারী গৃহকর্মী বিষয়ক চুক্তি সইয়ের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া ২ লক্ষ নারীর মধ্যে ১৬ মাসে গেছে ১ লক্ষ ৬১ হাজার ৫০০ নারী। চলতি বছর প্রথম ৪ মাসে ৩৯ হাজার ৫৭৫ জন নারী গেছে ১৫টি দেশে যার মধ্যে সৌদি আরবে যাওয়া নারীর সংখ্যা ৩০ হাজারেরও বেশি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যমতে গত ৩ বছরে ৫০০০ নারী নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩২৪ জন এবং গত মাসের শেষ দিকে (২০ জুন থেকে ২৬ জুন, ২০১৮) ৯৩ জন ফিরেছে। এরা মেয়াদ শেষ হবার আগেই ফিরেছে। ফেরার আগে এদের অনেকে ছিলেন দূতাবাসের সেফ হোমে।

প্রসঙ্গতঃ সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো নিয়ে আমাদের পত্রপত্রিকার কয়েকটি শিরোনামের কথা বলি। সোমবার, ১২ মার্চ ২০১৮ দৈনিক সমকালের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: কোনো মেয়ে যেন সৌদিতে না যায়। দৈনিক প্রথম আলো ২২ মে ২০১৮র একটি সম্পাদকীয় শিরোনাম: শ্রমবাজার বড় কিন্তু অনিরাপদ। নিচে উপশিরোনাম ছিল: সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করুন। এই সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে গৃহকর্তাদের নির্যাতনে পালিয়ে আসা নারীদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দিতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসকে সেফ হোম খুলতে হয়েছে। দূতাবাস কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করার সুপারিশ পাঠিয়েছে কিন্তু. . . সরকারের নীতি নির্ধারকেরা ভাবছেন এত বড় শ্রমবাজার ত্যাগ করা ঠিক হবে না। অথচ ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ অনেক দেশ সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় নারী গৃহকর্মী পাঠানো কয়েক বছর আগেই বন্ধ করে দিয়েছে।

দৈনিক প্রথম আলোর নারীমঞ্চ পাতায় মানসুরা হোসাইনের দীর্ঘ এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: শুনতে কি পান এই নারীদের কান্না? (১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮) যারা পড়েছেন তাঁরা জেনেছেন সেখানে কী অকরুণ নির্মমতার শিকার আমাদের গৃহকর্মীরা। অথচ যাবার স্বপ্নে বিভোর হওয়ার পর থেকে পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে এই নারীদের কত যে কষ্ট, কত ছোটাছুটি সেও আমাদের অজানা নয়। এর চেয়ে স্বদেশে, স্বগৃহে থেকেই নারী তার দিন ফেরাতে পারে এমন সব উদ্যোগ চলছে দেশজুড়ে। নারী উন্নয়নে বিশেষ করে ‘কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম জোরদারকরণ প্রকল্প’টি (সংশোধিত) গত কয়েক বছর ধরে নানান কোর্সে যুব নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বনির্ভর করে তোলার কাজটি সাফল্যের সঙ্গে করে যাচ্ছে। এই সঙ্গে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি উদ্যোগ যুক্ত হলে নারীকে দেশত্যাগের চিন্তাই করতে হয় না। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে সৌদি আরবের প্রতি দুর্বলতা কতটা অবিমৃষ্যকারিতার প্রমাণ তা নিরক্ষর বা অল্প শিক্ষিত নারীদের বা তাদের অভিভাবকদের বোঝাবে কে?

এখন, এই সময়ে যখন সংস্কার ঝড়ে দেশটি প্রায় দিশেহারা তখনও আমরা জানি ওয়ালিয়া আইনের অভিভাবকত্বে সেখানকার নারীর জীবন কতটা যন্ত্রণাময়। ভ্রমণ, বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা, আইডি কার্ড গ্রহণ থেকে কোনও কারণে সাজাভোগ থেকে কারামুক্তির জন্যও একজন ওয়ালির (অভিভাবকের) সম্মতি নারীর জন্য জরুরি। এ উপমহাদেশে এক সময়ে মনুর বিধান ছিল নারী শৈশবে পিতার, যৌবনে স্বামীর ও বার্ধক্যে পুত্রের অধীন। সৌদিতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ওয়ালি থেকে ওয়ালির হাতে নারীর জীবন বাঁধা থাকে। প্রথমে পিতা, তারপরে স্বামী; এদের অনুপস্থিতিতে নিকটাত্মীয় যে কোনও পুরুষ। এমনকি নিজের নাবালক সন্তান বা ছোট ভাইটিও হতে পারে তার ওয়ালি। ছেলেরা সেখানে বয়োসন্ধি থেকে সাবালক। নারী আজীবন অধীনস্ত একজন। এক কর্মজীবী, তালাকপ্রাপ্ত নারীর ১৭ বছরের ছোট ভাই ওয়ালি হিসেবে বোনের পুরো রোজগার পকেটস্থ করছে এমন একটা খবর পত্রিকার পাতায় দেখেছি। দেখেছি স্ত্রী (এক সন্তানের জননী) বিদেশে পড়তে যাবার শিক্ষা বৃত্তি পাবার অপরাধে তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে। পড়াশোনার পর সামাজিক মর্যাদায় স্বামীকে ছাড়িয়ে যাবে স্ত্রী, এ কিছুতেই হবার নয়। তাছাড়া স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে স্বামীর সেবার ভার কে নেবে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন স্ত্রীকে প্রহার করার সুখ থেকে স্বামীকে কেন বঞ্চিত হতে হবে?

রিয়াদের ইমাম মাহমুদ ইবন সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানী মনসুর আল আসকার জানান প্রতি বছর অন্তত ১০০০ নারী দেশ ছাড়ছে। সে সামর্থ্য যাদের নেই তারা অন্তত রিয়াদ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি শিক্ষাবিদদের মতে ওয়ালি আইন ইসলাম পূর্ব বেদুঈন প্রথা থেকে উদ্ভুত। ইসলাম নারীকে দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তি দিয়েছে। বিয়েতে নারীর অসম্মতি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে ওয়ালি আইন অমান্য করার জন্য সাজাও পাচ্ছেন কোনও কোনও নারী। দুঃখজনক হচ্ছে এ আইনের ঘোর সমর্থকদের অনেকেই নারী। যদিও আরবের বর্তমান নেতৃত্ব নারীর জীবনকে খোলনলচে সমেত বদলে দেবার কথা বলছে তবু সত্যটা হচ্ছে দ্রুতগতির একটা সংস্কার যুদ্ধ বাইরে বিস্তর পরিবর্তন হয়তো ঘটাতে সক্ষম কিন্তু সমাজ মানস রাতারাতি বদলে দেয়া সহজকর্ম নয়। সহজসম্ভব তো নয়ই। ২০১৩ সালে চার ধরনের কাজে অভিভাবকের অনুমতি নিষ্প্রয়োজন এমন একটা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। যেমন, পোশাকের দোকানে সহকারীর কাজে বা বাবুর্চি ও বিনোদন পার্কের চাকরিতেণ্ড কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর নারী তখন জানিয়ে দিয়েছিল এমন খুদকুঁড়ো পরিবর্তনে তাঁরা মোটেই আগ্রহী নন। সমাজবিজ্ঞানীরা তখন খোলাখুলি নির্যাতক পুরুষদের আইনের আওতায় আনার কথা বলেছিলেন। আজ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি নারীর জন্য একে একে একের পর এক বন্ধ দুয়ার সব খুলে যাচ্ছে তখন যৌন নিপীড়ন রোধে নতুন আইন তৈরি হতে যাচ্ছে। মন্ত্রী সভার বৈঠকে সে আইনের খসড়া অনুমোদিত হয়েছে। এখন শুধু রাজকীয় ফরমান জারির অপেক্ষা। এ আইনে নিপীড়কের সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩ লক্ষ রিয়াল (৮০ হাজার ডলার) জরিমানার বিধানও থাকছে। শুরা কাউন্সিলের এক সদস্যের মতে এ আইন প্রবর্তিত হলে আইনের এতদিনকার একটা বিশাল ফাঁক পূরণ হবে। আরেক সদস্য বলেন, মৌখিক ও যন্ত্রের মাধ্যমে হয়রানি উভয় ক্ষেত্রে আইনটি প্রযোজ্য হবে। বহুকালের রক্ষণশীল একটা দেশে বহুকাল ধরে নীরবে, গোপনে নারী নিপীড়ন তবে নিশ্চয়ই ছিল! নইলে হঠাৎ আইনের প্রশ্ন কেন এলো? সোজা কথায় ঘোর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী পণ্য; তার সম্ভ্রম হরণ বা হনন তুচ্ছ বিষয়। সুরক্ষিত স্বদেশি নারী যাদের কাছে নিরাপদ নয় আমাদের অবলা, অসহায় গৃহকর্মী তাদের দৃষ্টিতে কী, সহজেই তা অনুমান করা যায়। তবু ধরে নিলাম নিজেদের ভুলে, নিজেদের দোষে তারা যদি এ ধরনের নির্যাতনের শিকার না হয়েও মিথ্যা বলে আমরা চাই সে সত্যেরও প্রচার হোক, তার প্রমাণ হোক। প্রয়োজনে শাস্তি প্রাপ্য হলে তাও হোক। কিন্তু রিক্ত হাতে, ভাঙা মন আর বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে কোনও নারী শ্রমিককে যেন ফিরে আসতে না হয়।

নারী গৃহকর্মীদের সমস্যা কৌশলগতভাবে মেটানোতে সময়ক্ষেপণ অন্তত সরকারি পর্যায়ে কিছুতেই কাঙিক্ষত নয়। জনশক্তি রপ্তানি চুক্তির ক্ষেত্রে অশিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত, অদক্ষ নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। নারীর জীবন বা সম্ভ্রমের বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আত্মঘাতী চিন্তা বাঞ্ছনীয় নয়। নিয়োগ বিষয়ক স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তার সব ধরনের প্রতিশ্রুতি থাকুক আমাদের গৃহকর্মী নারীর জন্য।

x