নির্মমতা কতদূর হলে জাতি হবে নির্লজ্জ

নাহিদা সুলতানা

শনিবার , ২০ জুলাই, ২০১৯ at ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
56

আমি, আমরা আর তোমরা মিলেইতো বাংলাদেশ। কোথায় তোমরা ? তোমাদের এই প্রিয় ভূমিতে তোমাদের অস্তিত্ব কোথায় ? নাদিয়া, তনু, খাদিজা, মাজেদা, নুসরাত , রাফি তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ ? আরও কতজনের নাম তো স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। সেই মা- যাকে সন্তানের সামনে , সেই স্ত্রী- যাকে স্বামীর সামনে, সেই বোন- যাকে ভাইয়ের সামনে জীবিত লাশ হতে হয়েছিলো , তাদের নাম হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের যন্ত্রণা কি হারিয়েছে ? তাদের ক্ষতবিক্ষত শরীর , বিচূর্ণ আত্মাা ওপারে গিয়ে শান্তি পেয়েছে কি না জানি না । তবে প্রতিবার আমরা জাগে উঠে ভাবি এ যে এক দু:স্বপ্ন ছিল । অতপর আবারও কারো শরীর রক্তাক্ত হয়, আবারও কারো শরীরের পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে, আবারও আরও একটি দুঃস্বপ্ন – ভুলে যাই সবকিছু। কিন্তু যার সব হারায় সে কি সেই দু:স্বপ্নটার পর আর কখনো ঘুমাতে পারে ? সেই নারীটি কি আমি নই, আমরা নই, আমাদের বোন বা কন্যা নয় ? আর কতবার মরে প্রমাণ করতে হবে যে আমরাও বেঁচে ছিলাম ! জনসন্মুখে যদি খুন, ধর্ষণ হতে পারে তবে এর শাস্তি কেন জনসন্মুখে হতে পারবেনা ? একইভাবে কেন বর্বরদেরকে ক্ষতবিক্ষত করা হবে না ? কেন তারা জানবে না পোড়া শরীরের যন্ত্রণা কতখানি ? এমন শাস্তি কার্যকর করা হলে হয়ত এতদিনে অনেক নারী ও শিশু রক্ষা পেতো ।
গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে প্রকাশিত শুধুমাত্র ধর্ষিত শিশুদের সংখ্যা ২৩২২ জন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন এ ছয় মাসেই চার শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২০ জনের বেশি শিশুকে। ২০১৯ এর এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী ১০০ দিনে ৩৯৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন লজ্জাজনক ঘটনা। শিশু বিষয়ক বেসরকারি সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে ,২০১৮ সালে শিশুদেরকে নিয়ে ১০৩৭ টি ইতিবাচক সংবাদের বিপরীতে নেতিবাচক সংবাদের সংখ্যা ছিলো ২৯৭৩ টি । সদ্য ভুমিষ্ট হওয়া শিশু থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা কোথাও রক্ষা নেই। কোথায় লুকিয়ে রাখবো আমাদের আদরের রাজকন্যাদেরকে ! যার গ্লানি বহন করছে পুরো সমাজ, দেশ। আজ মানবতা পদদলিত , মনুষ্যত্ব দুর্লভ ।
যেখানে শিশুদের এই অবস্থা সেখানে তররুণীদের প্রসঙ্গে বলার প্রয়াস থাকে না। যেখানে সভ্যতার অগ্রগতিতে ‘ধর্ষণ’ নামক শব্দটি বিলুপ্ত হওয়ার কথা , সেই জায়গায় এসে আজকে পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের স্ক্রীনে , আড্ডায় সর্বত্র এই আলোচনা। বাসে, ট্রেনে , ট্যাঙিতে, বাড়ীতে, কর্মস্থলে কোথায় আছে নিরাপত্তা নামক সোনার হরিণ ! মধ্য বয়স্ক , প্রৌঢ় বৃদ্ধা – তাতে কি ? হায়েনার দল পেলেই আক্রমণ করবে। প্রতিবন্ধী বা ভাসমান ছিন্নমূল হলেও রক্ষা নেই । বিচ্ছিন্ন ঘটনা শব্দটির উপর ভর করে অদৃশ্য হয়ে যাবে অপরাধীরা আর সেই সাথে তাদের অপরাধগুলো।
আইন মানুষ তৈরি করে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জন্য। কিন্তু আইনতো প্রমাণ খোঁজে , যন্ত্রণা বোঝে না। আর সে কারণে আইন প্রয়োগ ও কার্যকর হতে হতে মানুষটি পরিবার, সমাজ, সম্মান, জীবন সব হারায় । তাহলে তো আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ এখনকার চেয়ে ভাল ছিল মেয়েদের জন্য । অন্তত নিশ্চিত মৃত্যু ছিল। এখনকার সময়ে প্রতি মুহূর্তে সব বয়সী নারী ও শিশুদেরকে আতংকে থাকতে হয় – এবার বুঝি আমার পালা ! এই বুঝি ওঁত পেতে থাকা হিংস্র মানুষরূপী জানোয়ার ঝাঁপিয়ে পড়লো ! এই বুঝি এসিড , কেরোসিন বা পেট্রোলে ভিজে গেলো শরীরটা ! এখন তো ছেলে-মেয়ে কোনো শিশুরাও বাদ যায় না । বাদ যায় না ৭০ বছরের বৃদ্ধাও । নিকৃষ্ট এক সময়ের সাক্ষী আমরা । হানাদারবাহিনী এখন আমাদের ঘরে ঘরে । লিমন আর রাজিবের মতো পঙ্গু হয়ে গেছে প্রশাসন । শতভাগ পুড়ে গেছে বিবেক । এখন দারিদ্র্যসীমারও নিচে নেমে গেছে চরিত্র সীমা ।
প্রতিবাদে ছেয়ে যায় রাজপথ, পত্রিকার পাতা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া । প্রতিরোধ হয় না কিছুতেই । বিচারের বাণী নিভৃতেই কেঁদে যাবে – যতদিন না দোষীর শাস্তি হবে প্রকাশ্যে, দ্রুততার সাথে , দ্রুততম সময়ে । মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ নারী ও শিশু , এই বিরাট অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এই দেশের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হবে । কারণ আমরাই এদেশের সম্ভ্রম । এই নির্মমতা রোধ করতে না পারলে নির্লজ্জ জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপ্রকাশ ঘটবে অচিরেই । আমাদের সকল উন্নয়ন আর অর্জন ঢেকে যাবে অমানবিকতার চাদরে।

x