নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রায় ভোগান্তির শংকা

মহাসড়কে ছোট ছোট গর্ত হচ্ছে বড় ।। নগরে ঈদ আনন্দ ম্লান হবে ভাঙা সড়কে

আজাদী ডেস্ক

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ
62

নাড়ির টানে বাড়ির পানে ছুটছে মানুষ। ইতোমধ্যে ঈদ যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। ছুটে চলা মানুষের যাত্রায় অতিবৃষ্টিও বাধা হতে পারছে না। সময় মতোই বাস ও রেল স্টেশন থেকে গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। মানুষের ঈদযাত্রা যেন নির্বিঘ্ন হয় এমনটাই প্রত্যাশা সবার। প্রতিবারের মতো এবারো ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে খোদ প্রধানমন্ত্রীর তদারকি রয়েছে। মঙ্গলবার রাতে তিনি কানাডা সফর শেষে দেশে ফিরেই সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে জানতে চান, মহাসড়কের কী অবস্থা? ভোগান্তি আছে কী না? গতকাল বুধবার রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে এসে এ কথা জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদের নিজেই। তিনি বলেন, মধ্যরাতে দেশে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, মহাসড়কের অবস্থা কী? ‘আমি বলেছিনেত্রী, অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো। কোনো যানজট নেই। ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা আগের চেয়ে স্বস্তিদায়ক।’ মহাসড়কের বেহাল দশা হতে পারে এমন শংকায় প্রতিবছর ট্রেন ও আকাশপথকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন যাত্রীরা। সেজন্য এ সময়ে ট্রেন ও প্লেনের টিকেটের চাহিদাই বেশি থাকে। এছাড়া বর্ষায় নৌপথও ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণে জেলা সড়ক ও মহাসড়কগুলোর অবস্থা বেহাল হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট গর্তগুলো পানি জমে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। আর এতে করে নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রায় শেষপর্যন্ত ভোগান্তি নামার শংকাও করছেন যাত্রীদের সাথে বাস মালিক শ্রমিক নেতারা। তারা বলছেন, ঈদের মাত্র তিনদিন আগে একটানা ভারী বর্ষণে জেলা সড়কগুলো এবং মহাসড়কগুলোর অবস্থা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই সাথে নগরীর সড়কগুলোর দশাও বেহাল হয়ে পড়ছে। মহাসড়কে আজ থেকে পণ্যবাহী যান চলাচলে জারি করা নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর হচ্ছে। এদিকে ঈদের সময়ও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ফরিদ আহমেদ। ফলে বৃষ্টিপাতে আনন্দের ঈদযাত্রা নিরানন্দও হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে রমজানের আগে যে যানজটের আতংক ছিল তা এখন আর নেই। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে কর্ণফুলী সেতুর গোলা চত্বর (উত্তর পাশে শহরের অংশে) এলাকা। কক্সবাজারবান্দরবানসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েক লাখ মানুষের ঈদ যাত্রার দুর্ভোগের কারণ এই গোল চত্বর। এই চত্বরের চারিদিকে বড় বড় গর্ত। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদাজলে একাকার হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

চট্টগ্রাম মহানগরী : সরেজমিনে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জিইসির মোড়, ২ নম্বর গেট, ষোলশহর থেকে জিইসির মোড় পর্যন্ত সড়কের অবস্থা খুবই বেহাল দশা। এদিকে আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের অবস্থা এতোই নাজুক যে এই সড়কের সচিত্র সংবাদ ইতোমধ্যে দেশের সকল প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রটিক মিডিয়ায় স্থান পেয়েছে। নগরবাসীর ঈদের সকল আনন্দও এই সড়ক হ্মান করে দেবে এমনটাই বলছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা।

তারা বলছেন, একে তো এলাকা সড়কগুলো সব ভাঙা। তার উপর বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বন্দি অবস্থাতেই কাটাতে হবে ঈদ আনন্দ।

একটানা ভারী বর্ষণে কর্ণফুলী সেতুর গোলা চত্বর (উত্তর পাশে শহরের অংশে) এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অংশটিতে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারবান্দরবানসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েক লাখ মানুষ ঈদে বাড়ি ফিরবেন এই সড়ক দিয়ে। গোল চত্বরের উত্তর অংশে বহদ্দারহাটের দিকে ৩শ’ গজ এবং পশ্চিমাংশে শহরে প্রবেশের সড়কের দিকে ২শ’ গজের মতো এলাকা খানাখন্দে ভরে গেছে। দ্রুত গতিতে কোন গাড়ি আসলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অতি সম্প্রতি এই অংশে দ্রুতগামী একটি ট্রাকের চাপায় ৩জন প্রাণ হারিয়েছেন।

আবহাওয়াবিদ ফরিদ আহমেদ আজাদীকে জানিয়েছেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ঈদের সময় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এখন বর্ষাকাল। প্রতিদিনই কমবেশি বৃষ্টিপাত হবে।

জেলা ও মহাসড়ক : ঢাকাচট্টগ্রাম, চট্টগ্রামকক্সবাজার, চট্টগ্রামবান্দরবান, চট্টগ্রামরাঙামাটি, চট্টগ্রামখাগড়াছড়ি মহাসড়কের অনেক এলাকায় কার্পেটিং উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

এই ব্যাপারে সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার আহমেদ (ঢাকাচট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামরাঙ্গামাটি, চট্টগ্রামখাগড়াছড়ি অংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত) আজাদীকে জানান, ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের কিছু কিছু এলাকায় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মেরামত করা হয়েছে। গাড়ি চলাচল করতে পারবে। কোন অসুবিধা হবে না। ঈদের আগে আমরা মেরামত করে ফেলবো। এদিকে চট্টগ্রামরাঙামাটি এবং চট্টগ্রামখাগড়াছড়ি মহাসড়ক এখনো পানিতে ডুবে আছে। পানি কমলে তখন বুঝা যাবে। পানি কমলে আমরা গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করে দেবো।

চট্টগ্রামকক্সবাজার এবং বান্দরবান সড়কের অনেক এলাকায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বান্দরবান সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। ঈদ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে।

এদিকে চট্টগ্রামঢাকা মহাসড়কের ফেনীকুমিল্লাদাউদকান্দি অংশের অবস্থা ভালো নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকাচট্টগ্রাম রুটের যাত্রীরা। এদিকে কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় যানজট রয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিষ্ট যাত্রীরা।

আমাদের মীরসরাই প্রতিনিধি মাহবুব পলাশ জানিয়েছেন, মহাসড়কে ঈদযাত্রার গাড়িগুলো ছুটে চলা শুরু করেছে। শেকড় ও নাড়ির টানে সবাই ছুটছে নিজ নিজ গন্তব্যে। তবে এবার মাহে রমজানের আগে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে যে যানজটের আতংক ছিল তা এখন আর নেই। যাত্রীরা বলছেন, মহাসড়কে কোন ধরনের ভোগান্তি ছাড়া নির্বিঘ্নই হচ্ছে তাদের ঈদযাত্রা। তাদের আশা, সামনের দিনগুলো যেন এ রকমই থাকে।

গতকাল বুধবার ঢাকা থেকে আসা গ্রীন লাইনের যাত্রী সরকারি কর্মজীবী ইমরানুল ইসলামের বাসটি ইফতারের সময় থেমেছে মীরসরাইয়ের বারইয়াহাট গ্রীণপার্ক রেস্টুরেন্টে। ঈদ যাত্রায় ভ্রমণ কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেনীর পর থেকে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি দেখতে পেলেও ঢাকা থেকে বেরুনোর পর দীর্ঘসময় কোথাও জ্যামে পড়তে হয়নি। একইস্থানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকামুখি তিশা পরিবহনের যাত্রী কর্মজীবী ফারজানা ইসলাম বলেন, গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা যাচ্ছি। চট্টগ্রাম থেকে পুরো পথ বেশ আরামদায়ক বলেই জানালেন।

তবে ভারী বৃষ্টিপাতে মহাসড়কে ছোট ছোট গর্তগুলো ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে মহাসড়ক এলাকায় কিছু ছিচকে চোর ও পকেটমারের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম থেকে মীরসরাই পৌঁছা চয়েস বাসের যাত্রী কর্মজীবী মাঈন উদ্দিন জানান, তাঁর পরিবারের ঈদের কেনাকাটার আস্ত ব্যাগটি কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। এতে পুরো পরিবারের মাথায় হাত। আবার বারইয়াহাটের মসজিদ গলির শামীম জুয়েলার্সের সামনে থেকে পকেট মারার সময় জনতা এক পকেটমারকে আটক করে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশে সোপর্দ করে।

ফেনী রেলওয়ে ওভারপাসও সচল থাকায় সেখানেও কোন রকম যানজটের খবর পাওয়া যায়নি। কুমিল্লা এবং দাউদকান্দি অংশেও কিছুটা ধীরগতির খবর পাওয়া গেছে। জোরারগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ সোহেল সরকার জানান, মিঠাছরা থেকে সোনাপাহাড় পর্যন্ত কোথাও কোথাও ছোট ছোট গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে দ্রুত রিপেয়ার করা প্রয়োজন। এই বিষয়ে ফোরলেনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জুলফিকার হোসেন বলেন, যতক্ষণ বৃষ্টি চলমান ততক্ষণ কাজ করা যাচ্ছে না। তবুও আমাদের দৃষ্টি এখন মহাসড়কের দিকে, বৃষ্টি থামলেই সেখানে দ্রুত রিপেয়ার করা হবে।

মীরসরাই থানার ওসি সাইরুল ইসলাম বলেন, পুরো ঢাকাচট্টগ্রাম রুটের যাত্রীদের নিরাপত্তায় বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ টহল রয়েছে। যে কোন অপরাধের বিষয়ে পুলিশের কড়া নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

আমাদের সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি লিটন কুমার চৌধুরী জানিয়েছেন, ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কে বেড়েছে পণ্যবাহী ট্রাককাভার্ডভ্যান। ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের যানজট বিড়ম্বনা এড়াতে সরকার ঈদের তিন দিন আগে ও ঈদের তিন দিন পর সড়কমহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাককাভার্ডভ্যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আজ থেকে পণ্যবাহী ট্রাককাভার্ডভ্যান চলাচলের এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। ফলে গতকাল মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাককাভার্ডভ্যানের আধিক্য পরিল িত হয়েছে।

মহাসড়কের বড় দারোগারহাট ওজন স্কেলের টোল ইজারাদার সমন্বয়কারী কামরুল হাসান জানান, এ মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ঢাকামুখী ৫/৬ হাজার যানবাহন যাতায়াত করে। ঈদ আসলে গড়ে ১০২০ শতাংশ গাড়ি যাতায়াত বাড়ে। গতকাল বুধবার যাত্রীবাহী বাসের তুলনায় পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যাই বেশি ছিল।

সীতাকুণ্ড বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার অফিসার্স ইনচার্জ আহসান হাবিব জানান, ঈদের তিন দিন আগে ও পরে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ সপ্তাহে মহাসড়কে পণ্যবাহী যান চলাচল বেড়েছে। গতকাল পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।

x