নির্বাচন ঘিরে রণকৌশলে জামায়াত-শিবির

গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট ।। বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক দ্রব্যসহ কয়েকশ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

আজাদী প্রতিবেদন

বৃহস্পতিবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ
1500

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে মাঠে নামছে জামায়াত শিবির। উদ্দেশ্য দুটো। এক, নিজেরা যে ফুরিয়ে যায়নি তার জানান দেয়া। দুই, নির্বাচন বানচালের চেষ্টার মধ্য দিয়ে বিদেশি শক্তির কাছে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে জামায়াত শিবিরের কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে প্রতিবেদন দিয়েছে। তারই আলোকে গত অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে ধরপাকড়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট নিজস্ব কৌশলে মাঠে নেমেছে। ইতোমধ্যে কয়েকশ’ নেতা কর্মী
চট্টগ্রামসহ সারা দেশে গ্রেপ্তার হয়েছে। পাশাপাশি উস্কানিমূলক বই, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য এবং এসব দ্রব্য তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরাই চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর চন্দনপুরায় ছাত্রশিবিরের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ছয়টি ককটেল, দুই বোতল পেট্রোল ও অকটেন, বোমা তৈরির উপকরণসহ বিভিন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রহমান বলেন, নির্বাচনের সময় জামায়াত-শিবির নাশকতা করতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। এজন্য আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
গত মঙ্গলবার নগরীর বাকলিয়া এবং পাহাড়তলী এলাকা থেকে মধ্যম সারির তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোহসিন আজাদীকে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে এটা আমাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। আমরা চাই অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন। এখন নির্বাচনের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলতে কেউ চেষ্টা করলে তা কোনো ভাবেই বরদাশত করা হবে না। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যারাই শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে লিপ্ত হবে, তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়তলী থানার ওসি সদীপ কুমার দাশ আজাদীকে বলেন, আমরা কাউকে বিশেষ টার্গেট করে অভিযান পরিচালনা করছি না। আমারা প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করেছি। সে অনুযায়ী যারা নির্বাচন বাধাগ্রস্ত এবং নাশকতার পরিকল্পনা করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনছি।
পুলিশ সদর দফতর ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত-শিবির ছিল সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা অগ্রভাগে থেকে দেশজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে। এছাড়া এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়েও নাশকতা করেছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা।
সূত্র আরো জানায়, রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না জামায়াত। এজন্য তারা আগের চেয়ে আরও বেশি নাশকতার মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চালাতে পারে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা এখন জঙ্গি স্টাইলে বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। এজন্য সহজেই তাদের গোপন পরিকল্পনা জানা যায় না। নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হলে কোনো একটি ইস্যুকে সামনে দাঁড় করিয়ে তারা মাঠে নেমে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
সম্প্রতি সদরঘাট থানায় গ্রেপ্তার জামায়াত শিবিরের ১৩ নেতাকর্মী জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনকালীন সরকারকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নেওয়ার জন্য তারা গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে সদরঘাট থানার ওসি নেজামউদ্দিন আজাদীকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা সে সময় জানায়, তারা নাশকতার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন নেতাকর্মীর বাসায় বিস্ফোরক দ্রব্য মজুদ করেছে।
ওই ঘটনা তদন্তে যুক্ত থাকা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা নাশকতার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই এলাকা টার্গেট, বিভিন্ন সরকারি দফতরে নাশকতার পরিকল্পনা এবং পুলিশ কর্মকর্তাসহ নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে হত্যার (টার্গেট কিলিং) পর তার দায় জঙ্গিদের ওপর চালানোর পরিকল্পনা করেছিল। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা জঙ্গিদের মতো টেলিগ্রাম অ্যাপস, প্রোটেক্টেড টেঙটসহ বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপস ব্যবহার করে আসছিল।
সিএমপি সূত্র জানিয়েছে, সমপ্রতি সিএমপির ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের একাধিক বৈঠকে জামায়াত-শিবির সদস্যদের নাশকতার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর জেরে গত কয়েক বছরে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব মামলায় যারা পলাতক রয়েছে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বিশেষ অভিযান চলছে।

x