নির্বাচনে নারীপ্রার্থী বা নারীভোটার বিষয়ক প্রতিবেদন

মাধব দীপ

শনিবার , ২২ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
38

আমাদের দেশের অর্ধেক জনগণকে পিছনে রেখে গণতান্ত্রিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। এমনকি অন্যকোনো সমাজও এভাবে সত্যিকারের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় শরীক হতে পারে না। একটা শক্তপোক্ত গণতন্ত্রের জন্য দরকার পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অংশগ্রহণ। এই সমান অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন সত্যিকার অর্থেই একদিন সম্ভব হয়ে ওঠতে পারে। কেননা, আমরা আমাদের চোখের সামনে হরহামেশাই দেখছি যে- নীতি-নির্ধারণী টেবিলে যেসব নীতি নারী-পুরুষের জীবন পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়- সেইসবের সিংহভাগ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ থাকে না বিধায় সামগ্রিকভাবে দেশ বা রাষ্ট্রের নানাবিধ উন্নয়ন কিংবা অগ্রযাত্রা কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। পরিণতিতে, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নানাধরনের স্টিগমা থেকেই যায়।
বলতে গেলে- রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণহীনতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে ব্যাহত করে, স্থবির করে দেয়। খোদ জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় তাই রাজনৈতিক-অংশগ্রহণ-প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এবং এই লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে- যদি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় জেন্ডার-সমতা নিশ্চিত করা যায় তবে তা টেকসই অর্থনীতি ও সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে তা মানবাধিকার রক্ষায়ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বলাই বাহুল্য যে- নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। তাই একটি নির্বাচনে কতোজন নারী প্রার্থী আছেন, কতোজন নারী জয়লাভ করেছেন বা কতোজন নারী ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন (করতে পেরেছেন), ভোট দেওয়ার জন্য যে নারীবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন ছিলো তা নিশ্চিত করা হয়েছিলো কিনা, ভোট দেওয়ার সময় নারীরা কী কী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বা ইতোপূর্বে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, আদৌ তেমন পরিবেশের মুখোমুখি হয়েছে কিনা- ইত্যাদির ব্যাপারে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যাই হোক, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা না হওয়া কিংবা ভোটপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে জেন্ডার বিষয়ক রিপোর্টিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা (সাংবাদিকরা) কী কী বিষয়ের ব্যাপারে আলোকপাত (রিপোর্ট) করতে পারে- এ নিয়েই মূলত আজকের লেখা। পুরো পৃথিবীব্যাপীই এ ব্যাপারে একটি ফ্রেমওয়ার্ক বেশ জনপ্রিয়। একে বলা হয়- ‘শী-ভোটস ফ্রেমওয়ার্ক’। এই ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক-নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মুখোমুখি হওয়া সকল ধরনের বাধাকে কেন্দ্র করে।
তিন ধরনের বাধার ওপর এই কাঠামো আলোকপাত করে। বলা হয়ে থােেক- এই বাধাগুলো না থাকলে বা দূর করা সম্ভব হলে নির্বাচনের সকল প্রক্রিয়ায় নারীর পক্ষে সর্বোচ্চ অবদান রাখা সম্ভব, যা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের সকল কর্মকাণ্ডে নারীর মতামতের প্রতিফলনকে নিশ্চিত করবে। যাই হোক, বলছিলাম ‘শী-ভোটস ফ্রেমওয়ার্ক’ নিয়ে। এই কাঠামোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথমটি হচ্ছে- ব্যক্তিগত বাধা (নিজস্ব কার্যদক্ষতার অভাব কিংবা নারীর নিজস্ব ক্ষমতায়নে নিজের অনীহা), দ্বিতীয়টি হচ্ছে- সরকারি বা রাষ্ট্রীয় বাধা (নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু সকল ধরনের পরিবেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে না পারা বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাধা) এবং তৃতীয়টি হচ্ছে- সামাজিক বাধা (পরিবেশগত নানা অনুঘটক বা ঘটনাক্রম)।
তাহলে, প্রথমেই আমরা দেখি- প্রথম ধাপে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রিপোর্টিং করতে পারে যেমন- ‘নারীরা কী মনে করছে যে- তারা নিজেরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা হতে পারে?’; ‘তারা কি রাজনীতিতে তাদের ক্যারিয়ার তৈরি করতে পারে?’; ‘নারীরা কি মনে করে যে- তারা ভোট-প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পারে?’; ‘নারী ভোটাররা কি মনে করছে- ভোটদান গুরুত্বপূর্ণ? কেনো কিংবা কেনো নয়?’; ‘নারীদের জন্য ভোট কি কোনো অগ্রাধিকারভাবে করণীয় কিছু?’; ‘নারীরা কি রাজনীতিতে অংশগহণের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছে কিংবা তারা নিজেরা কি নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক চোখে দেখছে?’; ‘নারীকে প্রার্থী হিসেবে কীভাবে নিচ্ছে সুশীল সমাজ কিংবা মিডিয়া কিংবা সাধারণ মানুষ?’; ‘কোনো এলাকার মাইনরিটি সম্প্রদায় অথবা নারীরা নির্বাচন বা ভোটিং-প্রক্রিয়া নিয়ে কী ভাবছে?’; ‘নারীরা কি- প্রার্থী কীভাবে হতে হয় তা জানেন কিংবা ভোটাধিকার সম্বন্ধে জানেন?’; ‘কোনো নারী প্রার্থী কি তার নির্বাচনি খরচ চালাতে পারছেন?’; ‘নারী কি ঘরের কাজ সামলে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে?’; ‘কোনো নারী প্রার্থী বিজয়ী হলে তিনি ক্ষমতা ঠিকভাবে চালাতে পারবেন কী?’; নারীপ্রার্থীরা কেনো দলের নেতৃস্থানীয় মর্যাদায় যেতে চাচ্ছেন না?’; ‘মনোনয়নের দৌড়ে কেনো নারীদেরকে তালিকার নিচে রাখা হচ্ছে?’; ‘নারীনেত্রী তার আপন যোগ্যতায় সামনের কাতারে যেতে চাইলে পুরুষের সম্মতি লাগবে কেনো?’; ‘বিভিন্ন নেতৃত্ববিষয়ক প্রশিক্ষণে নারীরা অংশগ্রহণ করতে পারছে কিনা?’; ‘কোনো নারীপ্রার্থী তার দল থেকে পুরুষপ্রার্থীর সমান পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছে কিনা?’; ‘কোনো দলের জন্য নারীদের আত্মত্যাগ অনন্দিত নায়কের মতো দলের প্রশংসিত নেতৃবৃন্দের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে কিনা’; ‘নারীর গুণ, কর্ম ও মেধাকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তার সামনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে দলীয় প্লাটফর্মে আলোচনা হয় কিনা’; ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশের জন্য দল আর্থিকভাবে সহায়তা করছে কিনা কিংবা দলের মূল কাঠামোয় নারীকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে কিনা’; সর্বোপরি, যে প্রশ্নটা অবশ্যই সাংবাদিকদের মাথায় থাকা উচিত যে- শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী বা কোনো গর্ভবতী নারী বা মা কিংবা কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যাক্রান্ত নারী তার ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারছেন কিনা’।
দ্বিতীয় ধাপে নিচের বিষয়গুলো নিয়ে রিপোর্টিং হতে পারে যেমন- ‘রাষ্ট্রে কী কী আইন আছে যা নারী-নেতৃত্বকে উৎসাহিত করে কিংবা পেছনে টেনে ধরে?’; ‘রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রান্তিক কাঠামো পর্যন্ত নারীদের ভোটাধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে কিনা?’; ‘নারীদের জন্য কয়টা সংরক্ষিত কোটা আছে- থাকলে কয়টা- সেইগুলোতে প্রার্থী হতে হলে কী কী করণীয় আছে ইত্যাদি’; ‘নারী প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ অন্যান্য যোগ্যতা পুরুষপ্রার্থীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা’; ‘ভোটকেন্দ্রে ভোটদান সংক্রান্ত এমন কোনো নিয়ম আছে কিনা যা নারী ভোটারদের নিরুৎসাহিত করে?’; ‘নারীরা কীভাবে ভোট দেবেন সে সম্পর্কে স্পষ্টজ্ঞান আছে কিনা?’; ‘ভোটার তালিকা কোথা থেকে দেখা যাবে বা ভোটার নাম্বার কোথা থেকে জানা যাবে- এ ব্যাপারে নারী ভোটারদের ধারণা দেওয়া হয়েছে কিনা, দেওয়া হলে এটা কি সরকারিভাবে করা হয়েছে নাকি দলীয়ভাবে করা হয়েছে?’; ‘ভোটকেন্দ্রে নারী অবজারভার আছে কিনা নাকি সবাই-ই পুরুষ অবজারভার?’।
তৃতীয় ধাপে যেসব বিষয় নিয়ে রিপোর্টিং হতে পারে সেসব বিষয় হচ্ছে- ‘গণমাধ্যম, জনপ্রিয় সংস্কৃতি, যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা সুষ্ঠু পরিবেশ- নারীদের নির্বাচনে প্রার্থী হতে উৎসাহিত করছে কিনা- করলে এই ফ্যাক্টরগুলো কীভাবে কাজ করছে?’; “রাজনীতি পুরুষদের জন্য, নারীদের জন্য নয় কিংবা রাজনীতি ‘নোংরা’ ও নারীবান্ধব নয়- নারী প্রার্থীদের এমন মানসিকতা’; ‘এমন কোনো ধারণা যেমন- সমাজের নেতৃত্ব সবসময়ই পুরুষদের হাতে থাকা উচিত বা পুরুষরাই সমাজের নেতা হওয়া উচিত’; ‘নারী ক্ষমতায় আসলে তো পুরুষদেরই সেবা করতে হবে- এমন মানসিকতা’; ‘নারীরা দুর্বল নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন- এমন ধারণা সমাজে থাকলে বা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হলে’; স্বামীর বা বাড়ির কর্তাপুরুষের কথায়ই ভোটদানের প্রার্থী বাছাই বা ভোটদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে জোর করা হয় কিনা?’; ‘নারীর সিদ্ধান্তকে কম গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হচ্ছে কিনা?’; ‘পুরুষের সঙ্গ ছাড়া নারীরা বেরোতে পারবে না এমনকি তাকে সনাক্ত করার জন্য তার পর্দা সরাতে হবে- এই ধারণা নারীকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করছে কিনা?’; ‘গণমাধ্যম- নারী প্রার্থীদের অবজ্ঞা করছে কিনা কিংবা তাদের কম প্রচার করছে কিনা?’; ‘মিডিয়া প্রার্থী হিসেবে নারীদের নেতিবাচক ভাবমূর্তি নির্মাণ করছে কিনা?’; ‘কোনো গণমাধ্যম কর্মী কাভারেজের জন্য নারী প্রার্থীর কাছে অর্থ দাবি করছে কিনা?’; ‘মিডিয়া নারীদের স্টেরিওটাইপ প্রচার করছে কিনা?’; ‘প্রার্থিতার জন্য কোনো নারী বা ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য কোনো নারী শারীরিক কিংবা যৌন হেনস্থার হুমকি পেয়েছে কিনা?’; ‘কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা এর সাথে জড়িত কেউ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণজনিত কোনো বিষয় নিয়ে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে কিনা?’; ‘ভোটকেন্দ্রে অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা নারীভোটারকে ভোটদানে বা প্রার্থী হতে নিরুৎসাহিত করছে কিনা?’; সর্বোপরি, যেকোনো সামাজিক বা পারিবারিক নেতিবাচক মন্তব্য নারীতে প্রার্থী হতে বা ভোটদানে বাধা সৃষ্টি করছে কিনা ইত্যাদি।

x