নির্বাচনী হুইশেল-আওয়ামী পরীক্ষা

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ
24

অক্টোবরেই নির্বাচনের হুইশেলে ফুঁ দেবে নির্বাচন কমিশন। এই ফাঁকে নির্বাচনী ময়দান ভাপ ছাড়তে শুরু করেছে। দৌড় চলছে নিউইয়র্কওয়াশিংটনলন্ডনব্রসেলসহিল্লি, দিল্লিসহ আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেশের রাজধানীতে। কিছু প্রকাশ্যে তো কিছু গোপনে। বিদেশী প্রভাবশালী শক্তি এবং নখদন্তহীন সাক্ষীগোপাল জাতিসংঘ কর্তাদের দরবারে তথাকথিত জাতীয় নেতাদের দৌড়ঝাপ নির্বাচনের আগে আমাদের রাজনীতির এখন প্রায় রুটিন চিত্র। একদিকে দস্তুরমত লবিস্ট নিয়োগ দিয়ে নিজেদের পক্ষে বিদেশী সহানুভূতি কেনার চেষ্টা, আবার দেশে নির্বাচনী জোট, মহাজোট, মেগাজোট গড়ার জোর প্রতিযোগিতা। ড. কামাল, ডা. বদরুদ্দোজা, মাহমুদুর রহমান মান্না, আ স ম রব এর মাঝে ঐক্যজোট গড়ার কাজ প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, কর্নেল অলিরা আছেন দোটানায়। অলি সাহেব বি এন পির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সাথে থাকলেও সামপ্রতিক সময়ে একটু তফাত রক্ষা করে চলেছেন।

এটা সত্য, সব দলের লক্ষ্য ক্ষমতার অংশিদারিত্ব। একবার ক্ষমতাকেন্দ্রে জুত করে বসা গেলে আর পেছন ফিরতে হয় না। জনগণ হচ্ছে, উপলক্ষ মাত্র। জনগণের কল্যাণে গণতন্ত্র ভেজালমুক্ত করা, সুশাসন, ন্যায়বিচার, সম্পদের উপর গণ অংশিদারিত্বের বুলি হচ্ছে, ক্ষমতা শিকারের চারকাঠি। নদী বা পুকুরে বড়শি ফেলার আগে মাছ আকর্ষণ করতে যেমন সুগন্ধি চারকাঠি প্রয়োগ করতে হয়, তেমনি গণ মানুষকে নিজেদের পক্ষে টানতে এসব মশলাদার বুলি বারবার উগলাতে হয়। এটা ফুটপাতের সর্বরোগহরণ ধন্বন্তরী কবিরাজের বাগ্মীতার মতোই। যে কবিরাজ যত বেশি লোক জমিয়ে শিকড়বাকর, চান্ডালশিয়ালের তেলজাতীয় বেশি ওষুধ(!) বিক্রি করতে পারে, তার ভাগ্যের চাকা তত জোরে ঘোরে। কয়েক বছরে কোটিপতির তালিকায় নাম তুলে আমাদের ভাষায় তথাকথিত বড়লোকের অভিজাত ক্লাবে ঢুকে যায় সে! পরপরই ভেষজ ওষুধিসহ নানা কারখানা গড়ে কর্পোরেট গ্রুপ হয়ে যায় তার কোম্পানি। তারপর সি আই পি বা বিদেশ থেকে সুপারব্রান্ডের সার্টিফিকেট কিনে নিজস্ব প্রটোকল, ব্যাক্তিগত নিরাপত্তা বহর নিয়ে পাইলট গাড়ির ভেঁপু বাজিয়ে শুরু হয় নয়া পথচলা। সি আই পি হওয়ার পর তার টার্গেট ভি আই পি হওয়া। ভি আই পি মানে এম পি হওয়া। আরো সর্টকাটে আসতে চাইলে দল, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত অথবা আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলে নেয়া। এরজন্য রাজনীতিতে বিশাল অবদানের বদলে ট্যাঁক এবং যোগাযোগ সেতুটাই আসল। যথাস্থানে উপযুক্ত সময় ও সুযোগে তার ভান্ডারের কিছু রতন খসালেই কাঙ্খিত পদ পদচুম্বণ করবেই। এটাই যুগের চলতি হাওয়া। বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগে এই সংক্রমণ এখন ভয়ঙ্কর। নিজে এই ঘরানার রাজনীতির জাতক হয়ে বঙ্গবন্ধুর নীতিআদর্শের দুষণ চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। ভাগ্য ভাল, যথাসময়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজকে সরিয়ে না নিলে বা কোনভাবেই সরকারের সুবিধাভোগী হলে এই নিষ্ঠুর সত্য উচ্চারণের দুঃসাহস কখনো হতো না। সাংবাদিকতার মতো বঙ্গবন্ধুর নীতিআদর্শ ও কর্ম নিজের পথযাত্রায় মিশন হিসাবে ধারণ করে রেখেছি। বিশ্বাস, বাকি জীবনেও ব্রত থেকে একচুলও পিছু হটবো না।

রাজনীতির যাত্রা এখন কারো কাছে খুবই কঠিন আবার কারো কাছে একদম নাক বরাবর সোজা ও মসৃন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর পতাকাবাহী দলটিতে। দলের পোড় খাওয়া নিবেদিত কর্মী বাহিনী যারা দলের চরম দুঃসময়ে, ‘ঝড়জলোচ্ছ্বাসের মত দুর্দিনে বুক পেতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নীতি সুরক্ষা দিয়েছেন, তারা মোটেই সুখে নেই। তাদের অনেকের পদপদবী ও অর্থবিত্তের প্রতি আকর্ষণ না থাকায় ঘুরপথ বা কৌশল খাটিয়ে বিত্ত অর্জনের সুযোগ নেননি বা হয়নি। এটাই এখন সবচেয়ে বড় ঘাটতি! তারা দেখছেন, দলে তাদের ছোট জায়গাটাও নেতার বিশ্বস্ত নয়া আগন্তক টাকাওয়ালার দখলে চলে যাচ্ছে। এভাবে তৃণমূল থেকে শীর্ষস্তর পর্যন্ত চলছে পদ বানিজ্যের অশুভ প্রতিযোগিতা। দলের তৃণমূল পর্যায় থেকে আগে কাউন্সিল অধিবেশনে ভোটাভুটির মাধ্যমে নেতা নির্বাচন হতো। ধাপে ধাপে ভোটে জিতেই উপরের পর্যায় অর্থাৎ ইউনিয়ন, থানা, জেলা ও কেন্দ্র পর্যন্ত নেতা নির্বাচন হত। নিজেও জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে ভোটে জিতেই এসেছি। দলের সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনেও একই সংস্কৃতি চর্চা হতো। উড়ে এসে জুড়ে বসার কোনই সুযোগ ছিলনা। এখন কীভাবে নেতারা পদ দখলে নিচ্ছেন, তা রাজনীতি সচেতন সবার জানা। দলে যদি গণতন্ত্রের চর্চা মুছে যায়, তাহলে রাষ্ট্র বা সরকার কীভাবে গণতান্ত্রিক হবে! এটা আমড়া গাছ থেকে নাশপাতি লাভের মতো দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কী?

বিএনপিজামাতের জন্মবৃত্তান্ত ও কর্মকাণ্ড সবার জানা। একটার আঁতুড়ঘর সেনা ছাউনি, আরেকটার মওদুদির বিতর্কিত ইসলামী দর্শন । আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামাত ও সহযোগিদের ভ্রাতৃঘাতি ভূমিকা জাতীয় ইতিহাসের স্থায়ী কলঙ্কচিহ্ন হয়ে ঠিকে থাকবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দলটি এজন্য মোটেই লজ্জিত নয়! এর মূল্যও তারা শোধ করছে। বিএনপি গণতন্ত্রের কথা বললেও দলটি গণতন্ত্র চর্চা করবে, এটা কেউ বিশ্বাস করেনা। তাই, বিএনপি থেকে সচেতন এবং মুক্তবুদ্ধির মানুষ ভাল কিছু আশাই করে না। গণতন্ত্রতো অনেক দূরের পথ! কিন্তু তবুও বিএনপির জনপ্রিয়তা ফু দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই। দুদুবার বেগম জিয়ার নেতৃত্বে দলটি ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ করেছে। তাও জনগনের ভোটে নির্বাচিত হয়ে! বিএনপি উত্থানের দায় পরোক্ষভাবে হলেও আওয়ামী লীগের উপর বর্তায়। সরকারি দল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে অনেক দূরে যেমন ছিটকে পড়েছে, তেমনি আওয়ামী বৃক্ষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে পরজীবী অবাঞ্চিত লতার ঝাড়। দিন যত যাচ্ছে, অবাঞ্চিত লতার ঝাড় ততবেশি পুষ্ঠ ও বংশবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে দেশ শেখ হাসিনার সামপ্রতিক দুমেয়াদে সকল উন্নয়ন সূচকে ইর্ষনীয় সাফল্য অর্জন করলেও জনগনের বড় একটি অংশ সরকারি দল থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এর মূল কারণ বেশকিছু দলীয় নেতার ক্ষমতা মেদের অস্বাভাবিক দাপট, অহঙ্কার ও অসংখ্য ভুঁইফোড় নেতার আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার দৃষ্টান্ত। একইসাথে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, জ্ঞান ও মেধানির্ভর রাজনীতির ভয়ংকর খরা। প্রগৈতিহাসিক যুগের মতো গায়ের জোর তথা পেশিনিভর্র রাজনীতি দিয়ে গণতন্ত্রের ভিত যেমন পোক্ত হয়না, তেমনি এই ঘরানার নোংরা চর্চার কারনে সাধারন মানুষ এমন কী দলের বঞ্চিত ত্যাগী কর্মীসমর্থকরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এখন আওয়ামী লীগ নিজেই নিজের বড় শত্রু । আগামী নির্বাচনে দলটিকে বিরোধী জোট বা দলের চেয়েও বড় লড়াই দিতে হবে নিজের ছায়ার সাথে! পুলিশী রাষ্ট্র আওয়ামী লীগের জন্য কেন দরকার হলো! কেন ব্যাঙ্কিং সেক্টরের নৈরাজ্য, দলবাজির উৎপাত দলের সুপ্রিম কমান্ড সামাল দিলেন না। ব্যাঙ্কিং খাতের অবলোপনসহ এক লাখ ত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের বড় সুবিধাভোগী হাঙরকুমিরদের নাম ঠিকানা প্রকাশ হয়নি। এদের জনগন চিনতে চায়। বঙ্গবন্ধু সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে গণ মানুষের কল্যাণ চেয়েছেন। এখন ঘটছে সব উল্টো। দ্রুত জনসমক্ষে অতিকায় খেলাপিদের নাম প্রকাশের পাশাপাশি যে সব মন্ত্রী, এম পি ও নেতা দেশেবিদেশে অস্বাভাবিক সম্পদের মজুদ গড়েছেন, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত ছাটাইসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে আগামী নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হলেও আওয়ামী লীগকে বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হবেই। তাছাড়া এরশাদ কাকুও তক্কে তক্কে আছেন, মধুচক্র টার্গেট করেই তিনি রাজনীতির পাল উড়ান ।

x