নির্বাচনী কড়চা

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বৃহস্পতিবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ
27

৭৮৬টি মনোনয়নপত্র বাতিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিএনপির প্রার্থী। সারা দেশে বিএনপির অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল হয়েছে। আপীল করে কজন টিকতে পারবে তা এখন বলা সম্ভব নয়। অপরদিকে আওয়ামী লীগের ভাগ্য কি ভালো। তাদের হেভিওয়েট কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়নি। মনোনয়নপত্র বাতিলের এই ঘটনা বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টকে বড্ড বেকায়দায় ফেলেছে বলে মনে হয়। এমনটি যে হতে পারে তা তারা নিজেরাও কল্পনা করেনি। তবে একেবারে যে করেনি তা নয়। করেছে বলেই এক সিটে তিনচার জনের মনোনয়ন জমা দিয়েছে। তা এখন কাজে লাগছে।
বেশির ভাগ বাতিল হয়েছে ঋণখেলাপীর কারণে। দুর্নীতির দায়ে দুই বছরের বেশি দণ্ড পাওয়ার কারণেও অনেকের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
নির্বাচনের এটা একটা ভালো দিক। ব্যাংকের টাকা লুট করে বড়লোক হওয়া আর বড়লোক হয়ে রাজনীতিবিদ সাজা, এম পি হতে চাওয়া এগুলো বন্ধ করার সময় এসেছে। কোনো প্রার্থীর অপরাধমূলক একটি কাজও ধরা পড়লে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া উচিত। জাতীয় সংসদ হবে সৎ ও আইনমানা ব্যক্তিদের জায়গা। এখানে ব্যাংক লুটেরা ও দুর্নীতিবাজদের কোনো স্থান হতে পারেনা। তবে এসব আইনের কড়াকড়ির জন্যে কোনো নির্দোষ লোক যেন হয়রানীর শিকার না হয় তাও দেখতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের হাতে কতো টাকা তা তাদের হলফনামায় উঠে এসেছে। কয়েকদিন ধরে সংবাদপত্রে বিভিন্ন নেতার আয় ও সম্পদের বিবরণ ছাপা হচ্ছে। এসব বিবরণ পড়ে চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা। বয়স চল্লিশও হয়নি, তরুণই বলা চলে, ব্যাংকে তারও জমা আছে ৫০ কোটি টাকা। জেনারেল এরশাদ ও রওশন এরশাদের সঞ্চয়, ক্যাশ টাকা, সম্পদ ও আরো নানাবিধ উপার্জনের যে টাকার বিবরণ পত্রিকায় পড়েছি তা রীতিমতো রূপকথার মতো মনে হয়। অথচ পেশা কী! অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও সংসদ সদস্য।
এই ধরনের অস্বাভাবিক সম্পদ, নগদ টাকা, ব্যাংকব্যালান্স ইত্যাদি ব্যাপারে জানার জন্যে সরকারের কোনো এজেন্সি কাজ করে কি? নাকি রাজনীতিবিদদের জন্যে এগুলো মাফ। আমার ধারণা রাজনীতিবিদরা, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল, এক ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকে। তাই এখন বড় বড় ব্যবসায়ীদের এক বড় অংশ ক্ষমতাসীন দলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। তাদের নিজের কোনো দল নেই। যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা ৫ বছর সেই দলের সেবা করে। পার্টি ফান্ডে বড় অংকের চাঁদা দেয়। শুনেছি দেশে বিদেশে অনেক নেতাকেও তারা খুশি রাখেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঋণখেলাপীর টাকা উদ্ধার না করে তাকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর উপদেষ্টা করেছেন। বড় বড় ব্যবসায়ীরা এই নিয়োগ থেকেই তো বার্তা পেয়ে যাচ্ছে। তাদের কর্তব্য কি।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বিএনপি তথা ‘ঐক্যফ্রন্ট’ এখনো বলে যাচ্ছে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হচ্ছেনা। সরকার এখনো প্রায় প্রতিদিন বিএনপি নেতা ও কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে। অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’ সত্যি তো, এরকম অবস্থাকে তো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলা যায়না। নির্বাচন কমিশন বলেছে এগুলো আগের মামলা। হয়তো কথাটি ঠিক। নির্বাচনের মৌসুমে গ্রেপ্তার পর্ব স্থগিত রাখলে কি দেশে দাঙ্গা লেগে যেতো? ভাবটা এমন সরকার এতোই কঠিন যে আদালত সাজা দিলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার। সবার ক্ষেত্রে কি তা হচ্ছে? একজন মন্ত্রী দন্ডিত হয়ে ৫ বছর মন্ত্রীত্ব চালিয়ে যায়নি?
বিএনপিকেও বুঝতে হবে দলীয় সরকারের অধীনে যখন নির্বাচন করতে এসেছি এখন তাদের এসব আচরণ সহ্য করতে হবে ভোটের স্বার্থে ও গণতন্ত্রের স্বার্থে। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যে বাতিল করেছে তা কি শুধু তাদের সখ হয়েছে বলে? না। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার অনেক সুবিধা। গত নির্বাচনে সেই সুবিধা নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কারণ ভোট ছাড়াই নির্বাচন হয়েছিল। এবার তো পরিস্থিতি তা নয়। এবারের নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্যেও একটা পরীক্ষা। আওয়ামী লীগ সরকারকে এবার প্রমাণ করতে হবে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন হতে পারে।
যে যাই বলুক, আমার কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এখনো দৃঢ়চেতা মানুষ বলে মনে হচ্ছেনা। হয়তো এটা আমারই ভুল। আমি তাঁকে আরো কঠিন ও শক্ত মানুষ হিসেবে আশা করেছিলাম। বিএনপি যখন অভিযোগ করছে পুলিশ তাদের হয়রানী করছে। তখন সি ই সি বলছেন : ‘আমরা তো পুলিশকে বলেছিলাম।’ এটা আরো কড়া ভাষায় স্বরাষ্ট্র সচিবকে তিনি বলতে পারতেন। তিনি মানসিকভাবে এখনো সরকারী আমলাই রয়ে গেছেন। সিইসি’র শক্তি তিনি শরীরে ও মনে এখনো ধারণ করতে পারেননি। হয়তো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বদলে যাবেন। নির্বাচনের সময় আমরা এক নতুন দৃঢ়চেতা সিইসিকে হয়তো দেখতে পাব।
অনেকে আশা করেছিলেন ‘ঐক্যফ্রন্ট’ গঠন করে বিএনপি নিজেদের কিছুটা বদলাবে। ড. কামাল হোসেন যে ফ্রন্টের প্রধান সেখানে তো বিএনপির কিছুটা বদলানো দরকার ছিল ঐক্যফ্রন্টের স্বার্থে। কিন্তু তাদের মনোনয়ন তালিকা থেকে দেখা যায় এখনো মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, পাক-প্রেমিক, তাদের সন্তানেরা মনোনয়ন পেয়েছেন। এটা প্রত্যাশিত ছিলোনা। ঐ লোকগুলো ছাড়া ঐ এলাকায় বিএনপির আর কোনো প্রার্থী ছিলোনা? এই মনোনয়ন থেকে কিছুটা অনুমান করা যায় যাদের জন্য বিএনপি আজ এতোটা নিন্দিত তাদের সঙ্গ বিএনপি ছাড়তে চাইছেনা। ভোটের পর কী হবে জানিনা। ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ঐক্যফ্রন্ট এই ফর্মে টিকে থাকবে কিনা সন্দেহ। তবে আমরা জানি এটা এই নির্বাচনের জন্যে গঠিত ঐক্যফ্রন্ট।
আমার ধারণা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাদের দশ বছরের শাসনকাল, ব্যাপক উন্নয়ন, ব্যাপক বেনিফিশিয়ারী গ্রুপ তৈরি, দুস্থদের ব্যাপক অর্থ অনুদান বিতরণ, বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্টের কাজ শুরু করা ব্যাপক নেটওয়ার্ক ইত্যাদি নানা কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি বহু ভোটার আকৃষ্ট। আওয়ামী লীগের দশ বছরের শাসনকালে যেসব কুকীর্তি রয়েছে তা অনেকটা এলিট সোসাইটির সমালোচনার খোরাক। তবে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত, নির্যাতিত হয়েছে বিএনপি। আদালতের রায় বলে একে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আমরা এরশাদ সাহেবের বহু মামলার রায়, সাজা, মুক্ত হওয়া, নেতা হওয়া, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হওয়া সবই দেখেছি। সব সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক।
আমার আশংকা নির্বাচনে জয়ী হলে বিএনপি প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে উঠতে পারে। দশ বছর তারা যে অত্যাচার, জেল জুলুম, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছে তা কি তারা ভুলে যেতে পারবে?
আমি আশা করবো তারা ভুলে যাবে। বড় বড় কিছু দুর্নীতির মামলা ছাড়া তারা আওয়ামী লীগের উপর প্রতিশোধ নেবেনা। তারা গণতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য নিজেদের সংযত রাখবে। প্রার্থনা করি, সেরকম পরিবেশে সৃষ্টিকর্তা যেন তাদেরকে সংযত রাখেন। কোনোরকম বিশৃঙ্খলা যেন তাদের দ্বারা না হয়।
লেখক : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

x