নির্বাচনী উত্তাপ: ‘ডুমুর গাছে ল্যাঙড়া আম’

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
53

নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ ছড়াচ্ছে নির্বাচনী মাঠ। প্রতিদিনই নানাস্থানে ঘটছে হামলা, মামলা, ভাঙচুর, সংঘাতের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। যদিও নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘উত্তাপ না থাকলে ভাল লাগেনা’। কিন্তু নির্বাচনী উত্তাপে যাদের জান-মাল ক্ষতি হচ্ছে একমাত্র তারাই জানেন, পৌষের তীব্র শীতে এই উত্তাপের কামড় কতো নির্মম! আশা, দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী সংঘাতের উত্তাপে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিবেন। ৩০ ডিসেম্বর ভোটাররা নিরাপদে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারবেন।
এদিকে ঐক্যফ্রন্ট প্রধান ড. কামাল নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সাথে নির্বাচনপূর্ব গণভবনের বৈঠকে তিনি ফ্রন্টের কোন দাবিই আমলে নেননি। বৈরি অবস্থা জেনেবুঝেই তাঁরা নির্বাচনে এসেছেন। ড. কামাল আরো বলেছেন, জনগণের ক্ষমতা ছিনতাই হয়েছে! ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় আসলে তা জনগণের হাতে আবার ফিরিয়ে দেয়া হবে! যুক্তির খাতিরে মানছি, “ভোগসর্বস্ব নীতিবিবর্জিত রাজনীতি-ভন্ড কর্পোরেট-অসৎ আমলা-লোভী মিডিয়া-ড্রাগ লর্ড মাফিয়া”র সম্মিলিত চক্র দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে! কিন্তু শুরু কখন?
শুরু বা বিসমিল্লাহতো সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর। এর কুশীলবতো খোন্দকার মোশতাকের সাথে জিয়াও! তারাইতো একের পর এক নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা লুঠ করে নেয়। এই সত্য কী ড. কামাল-মান্না-কা সিদ্দিকী গং অস্বীকার করতে পারবেন? রবের কথা তুলে রাখছি। কারণ ওরা লুঠেরা ঘাতকদের মামাতো ভাই!
তাহলে কত বছর ধরে জনগন ক্ষমতার বাইরে? ড. কামাল হিসাবটা দেবেন কী? নাই দিলেন, আমি দিচ্ছি। ‘৭৫’র ১৫ আগস্ট থেকে ‘৯০’র ডিসেম্বর এরশাদ স্বৈরাচারের পতন পর্যন্ত এর প্রথম অধ্যায় শেষ। দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা খালেদার নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতারোহণের পর থেকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তিনমাস ইন্টাবেলের পর। খালেদা ক্ষমতায় বসে আগের লিগেসি টেনে নিয়েছেন! অর্থাৎ জনগণের নির্বাচিত সরকার হয়েও বিএনপি-জামাত চক্র জনগণের লুন্ঠিত ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়নি। উল্টো প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জনগণের রক্ত চুষতে থাকে নির্বাচিত স্বৈরাচার।
শুধু কী তাই? দেশের লুন্ঠিত ইতিহাস-ঐতিহ্য- কৃষ্টি-সংস্কৃতি আরো বেশি মাত্রায় লুঠ হতে থাকে তার প্রথম মেয়াদে। ৭৫’র পর থেকে পুরো একটি প্রজন্মকে বার বার ভুল ইতিহাস শিখিয়ে জবরদস্তি ধর্মান্ধ ও মাদকাসক্ত “আলঝেইমার্স” রোগি বানিয়ে ফেলা হয়। বিপরীতে পুরো দেশ মদ, জুয়া, নগ্ন যাত্রার ষ্টেজে রূপান্তর ঘটানো হয়-সুকৌশলে। যার দায় জাতিকে এখনো কড়ায়-গন্ডায় গুণতে হচ্ছে।
জোড়াতালির সংবিধান ও ভুলের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ‘৯৬’র ২৩ জুন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একুশ বছর পর ক্ষমতায় আসে। কিন্তু একুশ বছরের জঞ্জাল পরিষ্কার করে দেশকে সঠিক ট্র্যাকে তুলে আনার আগেই মেয়াদ শেষ। আবার ক্ষমতায় আসার পর দলের মধ্যে কিছু বিষফোঁড়ার সংক্রমণ ঘটে। ফেনী, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষীপুরসহ আরো কিছু অঞ্চলে গড়ে উঠে অবাঞ্চিত গডফাদার রাজত্ব!এই সময়ে যুগান্তকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তির মতো বিশাল সাফল্যের পালকও যুক্ত হয়, শেখ হাসিনা সরকারের কৃতিত্বের মুকুটে। যা বছরের পর বছর ঝুলে ছিল। কিন্তু ঝুলে যায়,তামাদি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড, জেল হত্যাকান্ডের বিচার প্রক্রিয়া। ২০০১ সালে ঘর-বাইরের যৌথ প্রজেক্টের আওতায় ক্ষমতায় আসে জামাত-বিএনপি জোট সরকার।
এরপরের ঘটনালিপি রক্ত, খুন, বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা, সামপ্রদায়িক জঙ্গিবাদের বিপুল উত্থানের! দেশকে করিডর বানিয়ে বিপুল অত্যাধুনিক অস্ত্র চোরাচালান ও পাচারের মত ভয়ংকর ঘটনা পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকে। নির্বাচিত সরকারের পাশাপাশি হাওয়া ভবনে তারেকের নেতৃত্বে গড়ে উঠে বিকল্প সরকার। ২০০১ সালের নির্বাচন পূর্ব ও পরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উপর চালানো হয় বর্বরতম হামলা। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভোলাসহ বিশেষ কিছু এলাকায় বেপরোয়া খুন, অগ্নিসংযোগ, অসংখ্য নারী এমনকী কিশোরীর উপরও চালানো হয় বর্বরতম যৌণ নিপীড়ন। যা একাত্তরের ঘাতক পাকি নরঘাতকদের বীভৎসতাকেও হার মানিয়েছে। পাশাপাশি আহসান উল্লাহ মাষ্টার এম পি, সাবেক সফল ও জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী এস এ এ এম কিবরিয়া এমপিসহ আওয়ামী লীগের এমপিসহ প্রথম সারির বহু নেতা- কর্মীকে প্রকাশ্যে গুলি, গ্রেনেড হামলায় হত্যা করা হয়। যার কোন বিচার বেগম জিয়া সরকার করেনি। এর বাইরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে একাধিক প্রচেষ্টা চালানো হয়।
এসময়ে সরকারি পোষকতায় উগ্রবাদী জঙ্গি নেতা বাংলাভাই ও শায়খ আবদুর রহমানের উত্থান ঘটে উত্তর বঙ্গে। রাজশাহীর বাঘমারা,আত্রাইসহ কয়েকটি উপজেলায় ঘাঁটি বানিয়ে জঙ্গিনেতা সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে তার নিজস্ব বাহিনী কায়েম করে ভয়াল বর্গীরাজ। স্থানীয় সরকারি দলের এমপি এমনকী মন্ত্রীও তাকে সব ধরনের মদদ যোগায়। পুলিশসহ প্রশাসন কাজ করে বাংলা ভাইয়ের সহযোগীর ভূমিকায়। বাংলা ভাইয়ের জঙ্গি বাহিনী সর্বহারা নির্মূলের নামে আশ-পাশের জেলাগুলোর বহু নীরিহ মানুষের সম্পদ লুন্ঠন ও ধরে এনে নৃশংসভাবে খুণ করে। যা পাকি বাহিনীর একাত্তুরের নিষ্ঠুরতাকেও ম্লান করে দেয়। এরপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ আয়োজিত ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভেনিউর সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে ঘটে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে পরিচালিত ভয়াল এই হামলায় দলীয় নেতারা মানবঢাল তৈরি করে নেত্রীকে রক্ষা করলেও নিহত হন দলের শীর্ষ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতা-কর্মী! আহত হন কয়েক শ’। যাদের অনেকে এখনো গ্রেনেড স্প্লিন্টার শরীরে নিয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় দুর্বিষহ কষ্ট বহন করছেন। এর বাইরে সিলেটে হজরত শাহজালাল (রঃ) এর মাজারে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করা হয় বৃটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে। দশ ট্রাক স্বয়ংক্রীয় মারণাস্ত্রসহ বহু অস্ত্র গোলাবারুদ আটকের ঘটনা ঘটে এই মেয়াদে। ২০০৫ সালে দেশব্যাপী ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা হামলার মত অভাবনীয় ঘটনাতো সবার জানা। এক কথায় ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি জামাত জোট সরকার পুরো দেশকে জঙ্গিবাদের নিরাপদ আখড়া হিসাবে গড়ে তোলে। এ’ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা অপ্রাসঙ্গিক। তাহলে জনগণের লুন্ঠিত ক্ষমতা নির্বাচিত সরকারের মেয়াদে জনগণের হাতে কখন, কীভাবে ফিরে এলো বা লুঠ হলো? ড. কামাল বলবেন কী? জনগণের ক্ষমতা লুন্ঠনকারী বিএনপি-জামাত জোট এখন তাঁর ঘাড়ে চেপে বসেছে! বিস্ময়কর বটে, খুনী, লুঠেরা,জঙ্গিবাদী দৈত্য ঘাড়ে নিয়ে তিনি জনগণের হাতে হারানো ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন! ‘স্বপ্নের পোলাও’ ১৪ দফা বাস্তবায়ন করবেন!
এটা জংলি ডুমুর গাছ থেকে ল্যাঙড়া আম উপহার দেয়ার মতো আকাশ-কুসুম স্বপ্ন নয় কী?

x