নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের এক বছর পার হলো ॥ কোনো প্রতিশ্রুতি পালিত হয়নি

শুক্রবার , ২ আগস্ট, ২০১৯ at ৩:৫২ পূর্বাহ্ণ
42

দুই বাসের রেষারেষিতে ঢাকার বিমান বন্দর সড়কে এক কলেজ ছাত্রী নিহত হবার পর গত বছর জুলাইয়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১৮টি নির্দেশনা দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট। পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে নিয়েছিল নানা উদ্যোগ। কিন্তু সেই ছাত্র আন্দোলনের এক বছর পার হয়ে গেলেও সড়কে বিশৃঙ্খলা আগের মতই রয়ে গেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমেনি। গত এক বছরে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৬৪ জন। এর মধ্যে ঢাকার সড়কে মারা গেছেন ২৯৭ জন। অথচ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাস্তায় নামা শিক্ষার্থীরা সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের হেলমেট পরা নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছিল। এতে আহত হন সাংবাদিকেরাও। সেই ঘটনায় জড়িত হেলমেট বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মামলা এখনও চলছে। বিষয়টি সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের একটা বড় দাবি ছিল, সড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন উচ্ছেদ করা। কিন্তু দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর চলাচলরত যানবাহনের ফিটনেসের করুণ অবস্থার যে কোন পরিবর্তন ঘটেনি, বিআরটিএর এক প্রতিবেদনেই তা স্পষ্ট। হাইকোর্টে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে এখনও আনফিট মোটরযান আছে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার। ছাত্র আন্দোলনের পর দুই মহানগরীতে বাস স্টপেজের জন্য শতাধিক স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রথম প্রথম কিছু এসব স্টপেজে বাস দাঁড়ালেও পরে পরে বেশিরভাগ স্টপেজে বাস থামা বন্ধ হয়ে যায় এবং রাস্তার পাশেই ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে।
এটা স্পষ্ট যে, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন পেলেও কর্তৃপক্ষের শুভবুদ্ধি জাগাতে পারেনি। সড়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানুষের উদ্বেগকে, স্পর্শকাতরতাকে গুরুত্ব দেয়নি। জীবনের নিরাপত্তা, বেঁচে থাকার আকুতিকে অগ্রাহ্য করেছে, তারা প্রতিটি দায়িত্ববোধে নির্লিপ্ত থেকেছে, মৃত্যুর মিছিল দেখেও না দেখার ভান করেছে এবং হঠকারী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সড়কে নৈরাজ্যসৃষ্টিকারীদের সাহস যুগিয়েছে। এমন দায়িত্বহীনতার উদাহরণ কোন সভ্য দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এটা মনে রাখা দরকার যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দায় মুক্তির সুযোগ নেই। আইনের শাসনে কেউ দায়-দায়িত্বের উর্ধ্বে নয়। যেখানে দায় নেই, সেখানে আইনের শাসনও নেই। সেখানে সভ্যতা হারিয়ে যায়। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়যুক্ত স্বাভাবিক ও আইনানুগ ব্যক্তির কৃতকর্ম কিংবা কুকর্মের দায় বিবেক ও সরল বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাহলে মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্র অমানুষের হাতে চলে যাবে।
সভ্য দেশ হিসেবে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তোলার স্বার্থে সড়ক দুর্ঘটনার ‘মোচ্ছব’ থামাতে হবে। তবে এজন্য প্রয়োজন সরকারের কমিটমেন্ট। এছাড়া শর্তহীনভাবে দায়িত্বও পালন করতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে গাড়ি চালকদের বেপরোয়া মনোভাব এবং অদক্ষতা-আনাড়িপনা দায়ী। দায়ী মালিকদের অতি মুনাফার লোভ এবং মাফিয়া শ্রমিক নেতাদের দাপট। এ-দেশে যানবাহন চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ নয়, উৎকোচই নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। যেনতেন প্রকারে গাড়ি চালানের লাইসেন্স পাওয়া গেলেই হলো, এরপর সাত খুন মাফ হয়ে যায়। দুর্ঘটনার রাশ টেনে ধরতে হলে সড়কে যানবাহন চলাচল শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। আর এজন্য প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। মালিক ও শ্রমিক নেতাদের অবৈধ তৎপরতাও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যারা আইন ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াটা খুবই প্রয়োজন। সারাদেশে গাড়ির চালকদের ব্যবহারিক, তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। একই সাথে অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো যেন সড়কে চলতে না পারে এবং চালকেরা যাতে ৮ ঘন্টার বেশি গাড়ি না চালান, সে দিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোরভাবে ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাটাও জরুরি। পাশাপাশি মহাসড়কে অযান্ত্রিক ও স্বল্পগতির যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।

x