নিম্নমানের ওষুধ কঠোরভাবে প্রতিরোধে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশ্বাস দ্রুত দৃশ্যমান হোক

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৫ পূর্বাহ্ণ
42

স্বাস্থ্যমন্ত্রী অতিসম্প্রতি অনুষ্ঠিত ১১তম এশিয়া ফার্ম ‘এক্সপো’র উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, ওষুধের গুণগত মান রক্ষায় সরকার কয়েক বছর ধরে ওষুধ কারখানা ও ফার্মেসিতে অভিযান চালাচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো বলেন, জনগণের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে কোন অনিয়মের অভিযোগ পেলেই শাস্তি দেওয়া হবে। গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে ওষুধ শিল্পের সার্বিক সুনাম যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সেদিকে ওষুধ শিল্প মালিকদের সতর্ক থাকতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কঠোর নজরদারি বাড়াচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, জনগণের দুর্ভোগ যেন না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। হাসপাতালে এসে যদি রোগী চিকিৎসক বা নার্স না পায়, তাহলে মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তাই চিকিৎসক নার্স উপস্থিতিসহ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার নিয়মিত নজরদারিতে তিনস্তরের মনিটরিং সেল গঠন করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য যে যথার্থ তাতে কোন সন্দেহ নেই।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর গত তিনবার শাসনামলে শিশু ও মা-এর মৃত্যু হ্রাস, সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধসহ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে নকল ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ। দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে নিয়মিত বিরতিতেই বাজারে নকল ও মানহীন ওষুধের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কখনো কখনো ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে এমন অনেক ওষুধ ধরাও পড়ে। কিন্তু দায়ীদের কঠোর শাস্তি হওয়ার নজির মেলে না। রোগ থেকে আরোগ্য লাভের জন্য মানুষকে ওষুধ কিনতেই হয়। কিন্তু ভেজাল-নিম্নমানের ওষুধ খেয়ে রোগ থেকে আরোগ্য লাভ তো হয়ই না, বরং মৃত্যু হয়। তাই ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের বিরুদ্ধে কঠোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক। অতীতে আদালত, সংসদীয় কমিটি ও ওষুধ প্রশাসন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল। তাছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়। কিন্তু এরপরও দেখা যাচ্ছে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাচক্রের মারাত্মক অপতৎপরতা এতটুকুও কমেনি। এটা ঠিক যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে নকল- ভেজাল- মানহীন ওষুধ উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাদের আর্থিক জরিমানামূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা সম্পূর্ণ বন্ধ করার মতো দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি ও তা কার্যকর করার উদ্যোগ বড় একটা দেখা যায় নি। ফলে থামছে না বাজারে নকল-ভেজাল-মানহীন ওষুধের দৌরাত্ম্য। এই বাস্তবতায় আমরা আশা করি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাজারে ভেজাল-নকল বা নিম্নমানের ওষুধ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তা শুধু মৌখিক আশ্বাস না হয়ে প্রকৃতই দৃশ্যমান হবে।
ওষুধ এমন একটি দ্রব্য যার সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের ব্যাপারটি সরাসরি জড়িত। এর গুণ ও মানে যে কোন ব্যতিক্রম জীবন রক্ষার বদলে জীবন সংহারের কারণ হয়ে পড়ে। তাই এমন অপরাধ যারা করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল-নকল-মানহীন ওষুধের উৎপাদনকারী ও বিক্রেতারা এক অর্থে খুনী। তারা অর্থের লোভে মানুষ খুন করছে। ওষুধ উৎপাদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গুড ম্যানুফ্যাকচার প্র্যাকটিস (জিএমপি) নীতিমালা রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, জীবন রক্ষাকারী যে কোন ওষুধ উৎপাদনে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ‘হু’ এর নীতিমালা মেনে চলবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন নীতিমালা যথাযথভাবে না মেনেই নিম্ন মানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন করে যাচ্ছে। কাজেই ওষুধের গুণগত মান রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা সঠিকভাবে মেনে চলা হচ্ছে কিনা তা তদারক করা একান্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে। তারা নিয়মিত নজরদারি করলে ভেজাল ও মানহীন ওষুধ উৎপাদন অনেকটাই কমে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি হয়। এর মধ্যে একটি হলো শীর্ষ স্থানীয় বিভিন্ন কোম্পানির নকল ওষুধ উৎপাদন। অপরটি হলো উপাদানের পরিমাণে হেরফেরের পাশাপাশি গুণগত মান বজায় না রাখার মাধ্যমে নিম্নমানের ওষুধ তৈরি। ফলে এসব ওষুধ সেবনে কোন ফল পাওয়া যায় না। তাছাড়া অনেক সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। নকল-মানহীন ও ভেজাল প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে। দেখা যায়, স্বল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত অনেক মানুষই নকল ও নিম্নমানের ওষুধ চিনতে পারে না। এ সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির প্রতারক তাদের কাছেই নকল ও ভেজাল মানহীন ওষুধ বিক্রি করে থাকে। দূর গ্রামাঞ্চলেই সাধারণত এই প্রতারণা বেশি হয়। তাই এসব স্থানে নিয়োজিত দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্য কর্মী ও সংশ্লিষ্টরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে প্রতারকদের তৎপরতা কমবে। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। দেশে নকল ও নিম্নমানের ওষুধের উৎপাদন ও বিপণন সম্পূর্ণ বন্ধ না হলে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক বাজার হারাতে হবে, তেমনি দেশেরও বদনাম হবে। এটা কারো কাম্য নয়।

- Advertistment -