নিজে বাজাতে না পারলেও তাঁর বানানো হারমোনিয়ামে শিখে শিল্পী হয়েছেন অনেকেই

কাজী মোশাররফ হোসেন : কাপ্তাই

সোমবার , ১৫ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ
36

সঞ্জয় বড়ুয়ার বয়স ৩৫ বছর। বাবার নাম ইন্দ্র মোহন বড়ুয়া। সঞ্জয় ১৯৯৭ সাল থেকে হারমোনিয়াম বানানোর কাজ শুরু করেন। তার বাবা ইন্দ্র মোহনও হারমোনিয়াম তৈরি করতে পারতেন। বাবা পুত্র দুইজনই ভালো হারমোনিয়াম বানাতে পারেন। কিন্তু তাঁদের কেউ হারমোনিয়াম বাজাতে পারেন না। হারমোনিয়ামে সুর তুলতে পারেন না। হারমোনিয়ামে সুর তুলতে না পারলেও তাদের বানানো হারমোনিয়াম দিয়ে শতশত শিল্পী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সঞ্জয় বড়ুয়া লিচুবাগানে ‘ত্রিরত্ন মিউজিক্যাল’ নামক হারমোনিয়াম তৈরির একটি প্রতিষ্ঠান দিয়েছেন। ঐ প্রতিষ্ঠানে বসে সঞ্জয় নতুন নতুন হারমোনিয়াম তৈরি করেন। পুরাতন আর ভাঙাচোরা হারমোনিয়াম সংস্কার করেন নিখুঁতভাবে। গত ৭ অক্টোবর ত্রিরত্ন মিউজিক্যালে সঞ্জয় বড়ুয়ার সাথে এই প্রতিনিধির কথা হয়।
হারমোনিয়াম বানানোর ইতিহাস এবং এটি তৈরির কলাকৌশল সম্পর্কে সঞ্জয়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে রাঙ্গামাটির কাঁঠালতলিতে প্রদিব কুমার ধরের কাছে প্রথমে হারমোনিয়াম তৈরির কাজ শুরু করি। পরবর্তীতে সজিব বড়ুয়া এবং ছোটন কান্তি নাথের কাছ থেকে হারমোনিয়াম বানানোর কাজে যোগ দেন। টানা দুই দশক ধরে তাদের কাছে হারমোনিয়াম বানানোর কাজ শেখেন সঞ্জয়। বর্তমানে নিজে হারমোনিয়াম বানানোর কাজ শুরু করেন। সঞ্জয় বলেন ৩৭ ঘাট (সলিট ঘাট) ও ৪২ ঘাটের (স্টিক ঘাট) হারমোনিয়াম রয়েছে। এই দুই ধরনের হারমোনিয়াম তৈরি করতে পারেন তিনি।
সঞ্জয় বলেন একটি হারমোনিয়াম তৈরি করতে প্রায় ৭ দিন সময় লাগে। আর একটি হারমোনিয়াম বানাতে ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। সঞ্জয় হারমোনিয়াম বানাতে পারলেও হারমোনিয়াম বাজাতে পারেননা। হারমোনিয়াম বাজাতে না পারলে কিভাবে হারমোনিয়াম তৈরি করেন? হারমোনিয়াম থেকে সঠিক সুর বের হচ্ছে কিনা সেটি কিভাবে নিশ্চিত হন?
এ ব্যাপারে সঞ্জয় বলেন, অত্যন্ত গরীব পরিবারে আমার জন্ম। বাবার বিশেষ আয় ছিলনা। হারমোনিয়াম বানালেও এই কাজে উল্লেখ করার মত তেমন আয় থাকেনা। গরীব হবার কারণে লেখাপড়া করতে পারিনি। ছোট বেলা থেকেই কাজে লেগে যাই। কাজ বলতে হারমোনিয়াম তৈরি করা। প্রথম প্রথম মানুষের দোকানে হেলপার হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে নিজে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন সঞ্জয়। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানেও আহামরি ইনকাম নেই। ১২ হাজার টাকায় একটি হারমোনিয়াম বিক্রি করলে প্রায় দুই হাজার টাকা মুনাফা থাকে। ২৫ হাজার টাকায় হারমোনিয়াম বিক্রি করলে মুনাফা হয় ৪ হাজার টাকা। সবসময়তো হারমোনিয়াম বিকিকিনি হয়না। এখন (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ডাল সিজন। এই সময় ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ায় ব্যস্ত থাকে। তাই এখন সাধারণত কেউ হারমোনিয়াম তৈরির অর্ডার দেয়না বলে সঞ্জয় জানান।
জিতু ও জিকু নামে সঞ্জয়ের দুই পুত্র সন্তান রয়েছে। তারা গ্রামে থাকে। ১১ বছরের জিতু ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। ৫ বছরের জিকুকে আগামি বছর স্কুলে ভর্তি করানোর ইচ্ছা আছে তাঁর। কিন্তু তার এই দুই সন্তানও হারমোনিয়াম বাজাতে জানেনা। হারমোনিয়াম বাজানো শেখানোর সঙ্গতি সঞ্জয়ের নেই।
সঞ্জয় একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়েছেন। এই ঋণ নেওয়াকে তিনি ‘কিস্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা করে কিস্তি জমা দিতে হয়। আরো ৩৫ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হবে বলে তিনি জানান। আহামরি আয় না থাকলেও সঞ্জয় এই কাজে দারুণ খুশি। তার বানানো হারমোনিয়াম বাজিয়ে শতশত ছাত্রছাত্রী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। অনেকে স্টেজ মাতিয়ে অনুষ্ঠান করছেন। এই আনন্দ নিয়েই প্রতিনিয়ত হারমোনিয়াম তৈরি করে যাচ্ছেন সঞ্জয় বড়ুয়া।

x