নিজের জন্মদিনেই মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনলেন বাবর

বললেন, ফাঁসিয়ে দিল

বৃহস্পতিবার , ১১ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ
374

আদালত চলার সময় ভাবলেশহীন থাকলেও রায় ঘোষণা শেষে ক্ষোভ ঝেড়েছেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বিএনপি-জামায়ত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। গতকাল বুধবার দুপুরে রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় এই বিএনপি নেতা বলতে থাকেন- ‘গজব পড়বে।’ ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন ১৪ বছর আগে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলার রায় ঘোষণা করেন এদিন। দুই মামলাতেই সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। খবর বিডিনিউজের।
খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এছাড়া সামরিক বাহিনী ও পুলিশের তখনকার ১১ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
নেত্রকোণার সাবেক এমপি বাবর তার দ্বিতীয় মৃত্যুদণ্ডের রায়টি শুনলেন নিজের ৬০তম জন্মদিনে। জাতীয় সংসদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৮ সালের ১০ অক্টোবর বাবরের জন্ম। এ মামলার ৪৯ আসামির মধ্যে কারাগারে থাকা ৩১ জনকে সকালে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ এজলাসে নিয়ে আসা হয়। অন্য আসামিদের প্রিজন ভ্যানে করে আনা হলেও বাবরসহ কয়েকজনকে আনা হয় পুলিশের একটি সাদা মাইক্রোবাসে কড়া পাহারায়। বেলা সোয়া ১১টায় বাবরকেই সবার আগে আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলায় এজলাস কক্ষে নেওয়া হয়। সাদা শার্ট পরা কিছুটা মলিন চেহারার সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী প্রথমে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যে চেয়ারে বসে পড়েন। উশকোখুশকো চুল-দাড়িতে বাবরকে এসময় বরাবরের মতোই কিছুটা বিরক্ত দেখাচ্ছিল। কপালের ভাঁজ আর চুলে একবার হাত বোলাতে দেখা যায় তাকে। রায় পড়া শুরু হলে খুব উৎসাহের সঙ্গে কান উঁচিয়ে তা শুনতে থাকেন বাবর। কিন্তু রায় পড়া শেষে নিজের দ্বিতীয় মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনে তার চেহারায় বিষণ্নতার ছাপ পড়ে। এর আগে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলাতেও তার সর্বোচ্চ সাজা হয়।
২১ অগাস্ট মামলার রায়ের পর বেশ খানিকটা মুষড়ে পড়া বাবর তার আইনজীবী এস এম শাহজাহান, নজরুল ইসলাম, সানাউল্লাহ মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এ সময় তাকে আপিলের কথা বলা হয়। একটু পরে এজলাসে উপস্থিত সাংবাদিকরা প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বাবর বলেন, ‘আল্লাহই এসবের বিচার করবে।’ ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কাছ থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নাম বের করতে না পারায় আমাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
রায়ের পর কাশিমপুর কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আদালতের সামনের রাস্তায় আগের মাইক্রোবাসেই তোলা হয় বাবরকে। আগের মতেই মাইক্রোবাসের ডানপাশে চালকের পেছনে বসেন তিনি। নিরাপত্তা প্রস্তুতি ঠিক করার জন্য আসামিদের গাড়িবহর সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকলে বাবর ডান হাত দিয়ে কয়েক বার গাড়ির জানালা খোলেন। এ সময় গোয়েন্দা পুলিশের এক সহকারী কমিশনার জানালা খোলার কারণ জানতে চাইলে বাবর গলায় হাত দিয়ে বলেন, ‘আমার কাশি।’ সে সময় সাংবাদিকরা গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের থামিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ জানালা খোলা রাখার পর বাবর নিজেই তা বন্ধ করে দেন। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের দাপুটে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর, র‌্যাব প্রতিষ্ঠায় যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে বলা বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে প্রায়ই তিনি সংবাদপত্রের শিরোনামে আসতেন। তার বলা ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’সহ বেশ কিছু উক্তি এখনও বাংলাদেশের মানুষ মনে রেখেছে।
জন্ম নেত্রকোণায় হলেও বাবরের বেড়ে ওঠা রাজধানীর মগবাজারে। ১৯৯৬ সালে বিএনপির রাজনীতি যোগ দেওয়ার পর থেকেই দ্রুত তার উত্থান হতে থাকে। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত বাবর নেত্রকোণা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, স্থান করে নেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে। ২০০১ সালে আশ্চর্যজনকভাবে লুৎফজ্জামান বাবর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তার সময়ই ২০০৪ সালে চট্টগ্রামের ধরা পড়ে অবৈধ ১০ ট্রাক অস্ত্রের চোরাচালান। পরে ওই অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে বাবরের সম্পৃক্ততার বিষয়টি মামলার শুনানিতে উঠে এলে তাকেও আসামি করা হয়। ওই ঘটনায় অস্ত্র চোরাচালানের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অস্ত্র আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০০৬ সালে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের ছেলে সাফিয়াত সোবহান সানবীকে একটি হত্যা মামলা থেকে রক্ষার শর্তে তারেক রহমান ও তার বিশ্বস্ত সহযোগী বাবর মোটা অংকের ঘুষ নেন বলে অভিযোগ ওঠে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে বাবর বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকের কাছ থেকে ২১ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে সে সময় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে। ২০০৭ সালে যৌথবাহিনী বাবরকে তিনটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ২৯৭টি বুলেটসহ গ্রেপ্তার করে। এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তার ১৭ বছরের জেল হয়।

x